বিএনপির চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণের পর প্রথম কর্মসূচি হিসেবে সাংবাদিকদের সঙ্গে শুভেচ্ছা বিনিময় করেন তারেক রহমান। শনিবার রাজধানীর বনানীর হোটেল শেরাটনের বলরুমে অনুষ্ঠিত এ অনুষ্ঠানে দেশের জাতীয় দৈনিক, ইলেকট্রনিক ও অনলাইন মিডিয়ার সম্পাদক, শীর্ষ নির্বাহী ও জ্যেষ্ঠ সাংবাদিকদের সরব উপস্থিতি ছিল।
অনুষ্ঠানে বিএনপির নতুন চেয়ারম্যানকে অভিনন্দন জানান যায়যায়দিন সম্পাদক শফিক রেহমান। তিনি বলেন, আগামী দিনগুলো অত্যন্ত চ্যালেঞ্জের। এসব মোকাবিলায় কিছু ক্ষেত্রে কঠোর সিদ্ধান্ত নিতে হবে। বিশেষ করে বাংলাদেশ ব্যাংকের দিকে নজর দেওয়ার আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, অতীতে বাংলাদেশ ব্যাংকে অনিয়ম ও রিজার্ভ লুটের ঘটনা ঘটেছে। এসব বিষয়ে স্পেশাল কমিটি গঠন, কমার্শিয়াল ব্যাংক থেকে অর্থ পাচার বন্ধ এবং সাধারণ মানুষের জন্য দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণে রাখার পরামর্শ দেন তিনি। পাশাপাশি পুলিশ বাহিনীকে নতুন নৈতিকতা ও মূল্যবোধে শিক্ষিত করা এবং সাংবাদিকদের পরিবারের জন্য পেনশনের ব্যবস্থা করার দাবি জানান। তিনি আরও বলেন, সাম্প্রতিক এক সমীক্ষায় ৭০ শতাংশ মানুষ বিএনপিকে ভোট দিতে আগ্রহী বলে দেখা গেছে, এই আগ্রহকে ভোটে রূপান্তর করাই বড় চ্যালেঞ্জ।
আমার দেশ-এর সম্পাদক মাহমুদুর রহমান বলেন, গত ১৬–১৭ বছরে ভয়, চাপ ও সুবিধাবাদের কারণে গণমাধ্যমের একটি বড় অংশ নিপীড়নের শিকার সাংবাদিকদের পাশে দাঁড়ায়নি। তিনি সাংবাদিক রুহুল আমিন গাজীর উদাহরণ টেনে বলেন, ক্যান্সারে আক্রান্ত অবস্থায় ভুয়া মামলায় তাকে কারাগারে রেখে চিকিৎসা ছাড়াই মৃত্যুর দিকে ঠেলে দেওয়া হয়েছিল, অথচ সে সময় মূলধারার গণমাধ্যম নীরব ছিল। প্রবীণ সম্পাদক আসাদুজ্জামান আসাদের ওপর নির্যাতনের ক্ষেত্রেও জোরালো প্রতিবাদ দেখা যায়নি বলে তিনি মন্তব্য করেন।
মানবজমিনের প্রধান সম্পাদক মতিউর রহমান চৌধুরী বলেন, গণমাধ্যম এখন অনেকটাই স্বাধীন, আবার অনেকটাই নিয়ন্ত্রিত। মব ভায়োলেন্সের কারণে সাংবাদিকরা সাহসী হতে পারছেন না বলে তিনি মন্তব্য করেন। মিডিয়া অফিস ও সংবাদপত্র কার্যালয়ে আগুন দেওয়ার ঘটনায় উদ্বেগ প্রকাশ করে তিনি বলেন, এমন পরিস্থিতিতে সাংবাদিকদের হাত-পা বাঁধা হয়ে যাচ্ছে। তারেক রহমানের কাছে প্রত্যাশার কথা জানিয়ে তিনি বলেন, ইতিহাসের এক যুগসন্ধিক্ষণে তিনি রাজনীতিতে ফিরেছেন। সামনে কঠিন চ্যালেঞ্জ, যা মোকাবিলায় সম্মিলিতভাবে কাজ করতে হবে। এককভাবে বা দলের ভেতর সীমাবদ্ধ থেকে চেষ্টা করলে অতীতের ভুলের পুনরাবৃত্তি হতে পারে বলেও তিনি সতর্ক করেন।
দ্য ডেইলি স্টারের সম্পাদক মাহফুজ আনাম বলেন, গণতন্ত্র, স্বাধীন সাংবাদিকতা ও সুশাসনের পাশাপাশি ভবিষ্যৎ চ্যালেঞ্জ নিয়ে আলোচনা জরুরি। তার মতে, বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ জলবায়ু পরিবর্তন। তিনি বলেন, রাজনৈতিক দলগুলো জলবায়ু পরিবর্তন নিয়ে পর্যাপ্ত আলোচনা করছে না, অথচ এর প্রভাব ইতোমধ্যে উপকূলীয় এলাকায় দৃশ্যমান। নদী দূষণ ও ভূগর্ভস্থ পানির সংকট নিয়েও তিনি গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেন।
কালের কণ্ঠের সম্পাদক কবি হাসান হাফিজ বলেন, সাংবাদিকবান্ধব প্রশাসনের অভাব দীর্ঘদিন ধরে প্রকট। তিনি বলেন, দেড় দশকের বেশি সময় ধরে মিডিয়া ট্রায়াল, তেলবাজি সাংবাদিকতা এবং রাষ্ট্রযন্ত্রকে প্রভাবিত করার অপচেষ্টা গণমাধ্যমের মান-মর্যাদা ক্ষুণ্ন করেছে। এসবের পুনরাবৃত্তি না করে নতুন বাংলাদেশ বিনির্মাণের সুযোগ কাজে লাগানোর আহ্বান জানান তিনি। তা না হলে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কাছে খলনায়ক হয়ে থাকার আশঙ্কার কথাও উল্লেখ করেন।
মতবিনিময় সভায় বক্তব্য দেন দৈনিক ইনকিলাবের এএমএম বাহাউদ্দিন, নিউএজের নূরুল কবীর, যুগান্তরের সম্পাদক আবদুল হাই শিকদার, নয়া দিগন্তের সম্পাদক সালাহ উদ্দিন বাবর এবং বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমের প্রধান সম্পাদক তৌফিক ইমরোজ খালিদী।
অনুষ্ঠানে আরও উপস্থিত ছিলেন দেশের বিভিন্ন জাতীয় ও আঞ্চলিক দৈনিক, টেলিভিশন, অনলাইন গণমাধ্যম এবং আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমের সম্পাদক, নির্বাহী ও জ্যেষ্ঠ সাংবাদিকরা। পাশাপাশি বাংলাদেশ টেলিভিশন, বাংলাদেশ বেতার, বেসরকারি টেলিভিশন চ্যানেলের শীর্ষ কর্মকর্তারা এবং ফেডারেল সাংবাদিক ইউনিয়নের নেতারাও এতে অংশ নেন।
বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য, ভাইস চেয়ারম্যান, উপদেষ্টা পরিষদের সদস্য, মিডিয়া সেলের নেতৃবৃন্দসহ দলের শীর্ষ নেতারাও অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন। অনুষ্ঠানটি সঞ্চালনা করেন বিএনপির মিডিয়া সেলের আহ্বায়ক মওদুদ হোসেন আলমগীর পাভেল ও চেয়ারম্যানের প্রেস সচিব সালেহ শিবলী।