নির্বাচনের পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বাংলায় দেওয়া বার্তায় ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি বিএনপির বিজয়ে অভিনন্দন জানান।
পটভূমি: অবিশ্বাসের দেয়াল
২০২৪ সালের জুলাইয়ে গণ-অভ্যুত্থানের পর সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ভারতে আশ্রয় নেওয়ার পর থেকেই দুই দেশের সম্পর্কে টানাপোড়েন বাড়তে থাকে। আওয়ামী লীগকে নির্বাচন থেকে বিরত রাখা, সীমান্ত হত্যা, পানি বণ্টন বিরোধ, বাণিজ্য প্রতিবন্ধকতা ও কূটনৈতিক বাগাড়ম্বর—সব মিলিয়ে অবিশ্বাসের আবহ জোরালো হয়। বর্তমানে ভিসা পরিষেবা আংশিক স্থগিত, আন্তসীমান্ত ট্রেন-বাস চলাচল বন্ধ এবং ঢাকা–দিল্লি ফ্লাইটও উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে।
অনেকের ধারণা, ক্ষমতায় থাকাকালে হাসিনার প্রতি দিল্লির দৃঢ় সমর্থনই সম্পর্ককে একপেশে করে তুলেছিল। ১৫ বছরের শাসনামলে তিনি ভারতের চাহিদামতো নিরাপত্তা সহযোগিতা জোরদার, সংযোগ উন্নয়ন এবং আঞ্চলিক কৌশলে দিল্লির পক্ষে অবস্থান নিশ্চিত করেছিলেন। তবে অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে এর মূল্যও ছিল চড়া।
অতীতের ছায়া
বিএনপির সঙ্গে দিল্লির সম্পর্ক নতুন নয়, তবে অতীত অভিজ্ঞতা মিশ্র। ২০০১ সালে খালেদা জিয়া-র নেতৃত্বে বিএনপি-জামায়াত জোট সরকার গঠনের পর দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কে দ্রুত অবনতি ঘটে। ২০০৪ সালে চট্টগ্রামে ১০ ট্রাক অস্ত্র আটক এবং উত্তর-পূর্ব ভারতের বিচ্ছিন্নতাবাদী ইস্যু দিল্লির উদ্বেগ বাড়ায়। একই সময়ে সংখ্যালঘু নির্যাতনের অভিযোগ ও অর্থনৈতিক অচলাবস্থা সম্পর্ককে আরও জটিল করে তোলে।
পরবর্তী সময়ে আওয়ামী লীগ সরকারের সঙ্গে দিল্লির ঘনিষ্ঠতা বাড়লেও রাজনৈতিক ভারসাম্য প্রশ্নে সমালোচনা থামেনি। এখন বিএনপি ক্ষমতায় ফেরায় দিল্লি নতুন বাস্তবতায় হিসাব কষছে।
লন্ডনের 'সোয়াস ইউনিভার্সিটি অব লন্ডন' এর আন্তর্জাতিক রাজনীতি বিশ্লেষক অবিনাশ পালিওয়াল মনে করেন, নির্বাচনে অংশ নেওয়া দলগুলোর মধ্যে বিএনপিই সবচেয়ে অভিজ্ঞ ও মধ্যপন্থী শক্তি। তাঁর ভাষায়, “ভারতের জন্য সামনের দিকে এগোনোর ক্ষেত্রে এটি নিরাপদ বিকল্প।” তবে তিনি সতর্ক করে বলেন, সম্পর্ক স্থিতিশীল করা বলা যত সহজ, বাস্তবে ততটা নয়।
পাকিস্তান ফ্যাক্টর ও ভারসাম্যের কূটনীতি
নতুন সরকার গঠনের প্রাক্কালে বিএনপির এক সমাবেশে তারেক রহমানের ঘোষণা—“দিল্লি নয়, পিণ্ডি নয়—বাংলাদেশ সবার আগে”—আঞ্চলিক কূটনীতিতে ভারসাম্যের বার্তা হিসেবে দেখা হচ্ছে। ইতোমধ্যে ঢাকা–ইসলামাবাদ সম্পর্কেও উষ্ণতা লক্ষ করা যাচ্ছে; সরাসরি ফ্লাইট চালু ও কূটনৈতিক যোগাযোগ বাড়ছে।
দিল্লিভিত্তিক 'ইন্সটিটিউট ফর ডিফেন্স স্টাডিস অ্যান্ড অ্যানালাইসিস' Institute for Defence Studies and Analyses-এর বিশ্লেষক স্মৃতি পট্টনায়েকের মতে, বাংলাদেশের পাকিস্তানের সঙ্গে সম্পর্ক রাখা অস্বাভাবিক নয়; তবে ভারসাম্য রক্ষা গুরুত্বপূর্ণ। তাঁর আশঙ্কা, একদিকে অতিরিক্ত ঝুঁকে পড়া যেমন সমস্যা, তেমনি অন্যদিকে অতিরিক্ত সরে যাওয়া নিয়েও উদ্বেগ থাকতে পারে।
হাসিনা ইস্যু: বড় অন্তরায়
ভারতে অবস্থানরত শেখ হাসিনাকে প্রত্যর্পণ প্রশ্নে দিল্লির অনীহা নতুন সরকারের জন্য বড় কূটনৈতিক চ্যালেঞ্জ হতে পারে। জুলাইয়ের সহিংসতা নিয়ে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে আলোচনা চলছে, আর দেশে বিরোধী রাজনৈতিক শক্তিগুলো এই ইস্যুতে সরকারকে চাপ দিতে পারে। বিশ্লেষকদের মতে, বিষয়টি সংবেদনশীল ও দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব ফেলতে সক্ষম।
নিরাপত্তা ও অর্থনীতি: সম্পর্কের ভিত্তি
টানাপোড়েন সত্ত্বেও দুই দেশের মধ্যে নিরাপত্তা সহযোগিতা অব্যাহত রয়েছে—বার্ষিক সামরিক মহড়া, সমন্বিত নৌ টহল ও প্রতিরক্ষা সংলাপ তার উদাহরণ। পাশাপাশি রয়েছে ভারতের ৫০০ মিলিয়ন ডলারের লাইন অব ক্রেডিট।
অর্থনৈতিক বাস্তবতাও বিচ্ছিন্নতার সুযোগ রাখে না। প্রায় ৪,০৯৬ কিলোমিটার সীমান্ত, গভীর সাংস্কৃতিক সংযোগ এবং বিস্তৃত বাণিজ্যিক সম্পর্ক দুই দেশকে পরস্পরনির্ভরশীল করে রেখেছে। দক্ষিণ এশিয়ায় ভারতের সবচেয়ে বড় বাণিজ্য অংশীদার বাংলাদেশ; আবার এশিয়ায় বাংলাদেশের অন্যতম বড় রপ্তানি বাজার ভারত।
সামনে পথ কোন দিকে?
আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশেষজ্ঞদের মতে, সম্পর্কের ভবিষ্যৎ নির্ভর করবে দুই পক্ষের রাজনৈতিক সংযম ও বাস্তববাদিতার ওপর। ঢাকার নতুন নেতৃত্ব ভারতবিরোধী মনোভাব কতটা নিয়ন্ত্রণে রাখতে পারে এবং দিল্লি উসকানিমূলক বক্তব্য কমিয়ে আস্থা পুনর্গঠনে কতটা আন্তরিক হয়—সেটিই হবে নির্ধারক।
শ্রীরাধা দত্তের মতে, বড় প্রতিবেশী হিসেবে উদ্যোগ নেওয়ার দায়িত্ব ভারতেরই বেশি। “বাংলাদেশ একটি শক্তিশালী নির্বাচন করেছে। এখন তাদের সঙ্গে গঠনমূলকভাবে যুক্ত হওয়াই উচিত,” বলেন তিনি।
সব মিলিয়ে, তারেক রহমানের নেতৃত্বে ঢাকা–দিল্লি সম্পর্ক এক নতুন অধ্যায়ের দ্বারপ্রান্তে। অতীতের অবিশ্বাস পেরিয়ে পারস্পরিক সম্মান ও বাস্তবসম্মত সহযোগিতার পথে হাঁটতে পারলে দুই দেশই লাভবান হবে। আর তা না হলে, সম্পর্ক আটকে যেতে পারে ‘নিয়ন্ত্রিত প্রতিদ্বন্দ্বিতা’র অস্বস্তিকর কাঠামোয়।