মধ্যপ্রাচ্যে চলমান যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহ ব্যবস্থায় অস্থিরতা তৈরি হয়েছে। আমদানিনির্ভর দেশের জ্বালানি ব্যবস্থায় আন্তর্জাতিক বাজারে দামের ওঠানামা সরাসরি প্রভাব ফেলছে অর্থনীতি ও দৈনন্দিন জীবনে।
এই পরিস্থিতিতে সরবরাহ স্বাভাবিক রাখতে যুক্তরাষ্ট্র, অস্ট্রেলিয়া, অ্যাঙ্গোলা, সংযুক্ত আরব আমিরাত, কাজাখস্তান ও ওমানসহ বিভিন্ন দেশ থেকে সরাসরি ক্রয় পদ্ধতিতে এলএনজি আমদানি করছে সরকার। পরিকল্পনা অনুযায়ী অন্তত কয়েক মাসের চাহিদা মেটানোর মতো মজুত নিশ্চিত করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
বাংলাদেশ তেল, গ্যাস ও খনিজসম্পদ করপোরেশন (পেট্রোবাংলা) সূত্রে জানা গেছে, অস্ট্রেলিয়া, যুক্তরাষ্ট্র ও অ্যাঙ্গোলা থেকে মোট ২০টি এলএনজি কার্গো কেনা হয়েছে। এর মধ্যে এপ্রিলে ৯টি কার্গো আমদানি করা হয়, যার মধ্যে ৬টি ইতোমধ্যে দেশে পৌঁছেছে। বাকি কার্গোগুলোও পর্যায়ক্রমে আসছে। মে মাসে আরও ১১টি কার্গো আমদানির প্রস্তুতি রয়েছে।
পেট্রোবাংলার চেয়ারম্যান মো. এরফানুল হক বলেন, “গ্যাস সরবরাহ নিয়ে কোনো সংকট নেই। পর্যাপ্ত মজুত রয়েছে এবং আমদানি কার্যক্রম নিয়মিতভাবে চলছে। মে মাসের জন্য ১১টি কার্গো নিশ্চিত করা হয়েছে। বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোতেও চাহিদা অনুযায়ী গ্যাস সরবরাহ দেওয়া হচ্ছে।”
এদিকে দেশীয় গ্যাসক্ষেত্র থেকে উৎপাদন বৃদ্ধির উদ্যোগও নেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি নতুন উৎস থেকে আমদানি বাড়িয়ে মধ্যপ্রাচ্যনির্ভরতা কমানোর কৌশল গ্রহণ করা হয়েছে।
সরকার আমদানির পাশাপাশি চাহিদা নিয়ন্ত্রণ ও সাশ্রয়ী ব্যবস্থাপনার ওপরও গুরুত্ব দিচ্ছে। এর অংশ হিসেবে অফিস সময় কমানো, ব্যাংকিং সময়সীমা সীমিত করা এবং নির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত বাজার ও শপিংমল খোলা রাখার মতো পদক্ষেপ কার্যকর করা হয়েছে।
কৃষি খাতে সেচ মৌসুমকে কেন্দ্র করে এপ্রিল মাসে ডিজেলের চাহিদা বাড়লেও সরকার সে চাহিদা পূরণের জন্য আগাম প্রস্তুতি নিয়েছে বলে জানানো হয়েছে। কৃষকদের জ্বালানি সংকট এড়াতে জেলা প্রশাসকদেরও নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।
বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন (বিপিসি) জানিয়েছে, চট্টগ্রাম বন্দরের বহির্নোঙরে সম্প্রতি তিনটি ট্যাংকারে ১ লাখ টনের বেশি ডিজেল ও অকটেন এসেছে। পাশাপাশি ভারতের নুমালিগড় রিফাইনারি থেকে ২৫ হাজার মেট্রিক টন পরিশোধিত ডিজেল আমদানির কার্যক্রম চলমান রয়েছে।
সরকার জ্বালানি তেল আমদানিতে আন্তর্জাতিক উন্মুক্ত দরপত্রের সময়সীমা ৪২ দিন থেকে কমিয়ে ১০ দিন করেছে, ফলে সরবরাহ প্রক্রিয়া আরও দ্রুত হয়েছে।
নবায়নযোগ্য জ্বালানির দিকেও গুরুত্ব বাড়িয়েছে সরকার। বর্তমানে সৌরবিদ্যুৎ থেকে প্রায় ১ হাজার ৪৪৫ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন হচ্ছে। ২০৩০ সালের মধ্যে এটি ১০ হাজার মেগাওয়াটে উন্নীত করার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।
জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগের মুখপাত্র মনির হোসেন চৌধুরী জানান, বছরের শুরু থেকেই পরিকল্পিতভাবে জ্বালানি আমদানি নিশ্চিত করা হচ্ছে। তাঁর মতে, বর্তমানে দেশে অন্তত তিন মাসের মজুত সক্ষমতা তৈরি হয়েছে।
তিনি আরও বলেন, 'বাংলাদেশ শুধু মধ্যপ্রাচ্যের ওপর নির্ভরশীল নয়। বিভিন্ন দেশ থেকে পরিশোধিত তেল আমদানি করা হচ্ছে। ফলে আঞ্চলিক অস্থিরতা থাকলেও সরবরাহে বড় ধরনের বিঘ্নের আশঙ্কা নেই।'
সরকার অবৈধ মজুত ও পাচার রোধে দেশব্যাপী ভিজিলেন্স টিম, ট্যাগ অফিসার নিয়োগ এবং ভ্রাম্যমাণ আদালতের অভিযান জোরদার করেছে। সীমান্ত এলাকায় বিজিবি ও কোস্ট গার্ডের টহলও বাড়ানো হয়েছে। ২১ এপ্রিল পর্যন্ত অভিযানে ৫ লাখ ৭৬ হাজার লিটার অবৈধ জ্বালানি তেল উদ্ধার করা হয়েছে।
জ্বালানি বিশেষজ্ঞরা সরকারের এসব উদ্যোগকে ইতিবাচক হিসেবে দেখছেন।
সরকারি সূত্র বলছে, বর্তমানে দেশে ডিজেল, অকটেন, পেট্রোল, ফার্নেস অয়েল ও জেট ফুয়েলের পর্যাপ্ত মজুত রয়েছে। ফলে আগামী দুই থেকে তিন মাস সরবরাহ ব্যবস্থায় বড় কোনো সংকটের আশঙ্কা নেই।