রংপুর সদর উপজেলার পাগলাপীর মহাদেবপুর এলাকায় হত্যাচেষ্টা মামলার ১ নম্বর আসামি কয়েকদিন হাজত খেটে জামিনে বেরিয়ে মামলার বাদী ও সাক্ষীদের বিরুদ্ধে আদালতে মিথ্যা মামলা দিয়েছেন বলে অভিযোগ উঠেছে। এরপর এলাকায় ফিরে মামলা তুলে নিতে কাউন্টার মামলার ভয় দেখিয়ে ভুক্তভোগীদের কাছে জনপ্রতি ২ লাখ টাকা চাঁদা দাবি ও পুনরায় হত্যার হুমকি দেওয়ার অভিযোগও উঠেছে কুপিয়ে হত্যাচেষ্টা মামলায় হাজত খাটা ১ নম্বর আসামি শাহিনুর বেগম ওরফে ‘শাহিনুর সুন্দরী’র বিরুদ্ধে। এ ঘটনায় এলাকায় উত্তেজনা ও থমথমে অবস্থা বিরাজ করছে। বিচারপ্রার্থীরা চরম আতঙ্ক ও নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছেন বলে জানা গেছে।
ভুক্তভোগী পক্ষের অভিযোগ, প্রবাসী নওশের আলম সুমনের বিরুদ্ধে ২০২৪ সালে শাহিনুর বেগমের দায়ের করা একটি মামলায় মিথ্যা সাক্ষ্য দিতে রাজি না হওয়াকে কেন্দ্র করে দীর্ঘদিন ধরে অত্যাচার ও নির্যাতনের পর পূর্বশত্রুতার জেরে গত ৩০ আগস্ট বিকেলে শাহিনুর বেগম ও তার লোকজন তার নিজের সৎ ভাই-বোন এবং বোনজামাইয়ের ওপর অতর্কিত হামলা চালান। এ ঘটনায় শাহিনুর বেগমের বোন, বোনজামাইসহ কয়েকজন আহত হন। পরে তাদের রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়।
চিকিৎসা শেষে শাহিনুর বেগমের বোন সাবনাজ বেগম বাদী হয়ে শাহিনুর বেগম, তার স্বামী সাহেব আলী খেকড়ুসহ কয়েকজনের বিরুদ্ধে রংপুর কোতোয়ালি সদর থানায় মামলা করেন। মামলাটি ০২/২৬ নম্বরে নথিভুক্ত হয়।
এরপর গত ৪ সেপ্টেম্বর সকালে রংপুর কোতোয়ালি সদর থানা পুলিশের একটি দল অভিযান চালিয়ে শাহিনুর বেগমকে গ্রেপ্তার করে। পুলিশ জানায়, গ্রেপ্তারের পর প্রয়োজনীয় আইনগত প্রক্রিয়া শেষে ওই দিন দুপুরে তাকে রংপুর জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালত-৩-এ হাজির করা হয়। পরে বিচারক মো. আশিক-উজ-জামান ৬ সেপ্টেম্বর রোববার জামিন আবেদনের শুনানির দিন ধার্য করে তাকে কারাগারে পাঠানোর নির্দেশ দেন।
পরবর্তীতে ৬ সেপ্টেম্বর আদালতে শাহিনুর বেগমের জামিন আবেদন করা হলে আদালত তা মঞ্জুর করেন। জামিনে মুক্তির পর এলাকায় ফিরে পুনরায় মামলার বাদী ও সাক্ষীসহ সংশ্লিষ্ট কয়েকজনকে হুমকি দিতে থাকেন বলে অভিযোগ করেছেন ভুক্তভোগীরা।
এদিকে একই মামলার ২ নম্বর আসামি শাহিনুর বেগমের স্বামী সাহেব আলী খেকড়ু ঘটনার পরের কয়েকদিন পলাতক থাকার পর গত ১৪ সেপ্টেম্বর আদালতে হাজির হয়ে জামিন আবেদন করেন। সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, আদালত তার জামিন আবেদন নামঞ্জুর করে কারাগারে পাঠানোর নির্দেশ দেন।
ভুক্তভোগী পক্ষের অভিযোগ, জেল থেকে জামিনে বেরিয়ে আসা এবং স্বামীর জামিন নামঞ্জুর হওয়ার পর শাহিনুর বেগম আরও ক্ষিপ্ত হয়ে ওঠেন। এরই ধারাবাহিকতায় মামলার বাদীসহ সাক্ষীদের বিরুদ্ধে আদালতে মামলা দায়ের করেন শাহিনুর বেগম।
জানা যায়, ঘটনাটির শুরু থেকেই বিষয়টি দেশের বিভিন্ন গণমাধ্যমে আলোড়ন সৃষ্টি করে। সে সময় শাহিনুর বেগম এবং মামলার অপর আসামি, মেয়ে দাবি করা আন্নিকা আক্তার গণমাধ্যমকর্মীদের কাছে দেওয়া তাৎক্ষণিক বক্তব্যে ঘটনার সময় অপর পক্ষের চারজন উপস্থিত ছিলেন বলে দাবি করেন। অন্যদিকে শাহিনুর বেগম তার বক্তব্যে এলাকার সাতজনসহ আরও কয়েকজনকে অজ্ঞাতনামা আসামি করার কথা উল্লেখ করায় এলাকাবাসীর মধ্যে আতঙ্ক বিরাজ করছে বলে স্থানীয়রা জানিয়েছেন।
স্থানীয়দের অভিযোগ, দীর্ঘদিন ধরে রংপুর সদর উপজেলার পাগলাপীর মহাদেবপুর এলাকায় স্থানীয় একটি প্রভাবশালী মহলের প্রত্যক্ষ মদদে শাহিনুর বেগম ও তার সহযোগীদের বিরুদ্ধে হামলা, ভয়ভীতি প্রদর্শন, জমি দখল, মাদক সিন্ডিকেটের সঙ্গে সংশ্লিষ্টতা, মামলা দিয়ে হয়রানি এবং এলাকায় উত্তেজনা সৃষ্টির অভিযোগ রয়েছে। মূলত এলাকাবাসীর মধ্যে যারা ঘটনাটি স্বচক্ষে দেখে সাক্ষী দিয়েছেন, তাদের মুখ বন্ধ এবং মামলা-বাণিজ্য করার জন্যই তাদের আসামি করে আদালতে মামলা দেওয়া হয়েছে বলে অভিযোগ স্থানীয়দের।
এর আগে, গত ২৪ জুন শাহিনুর বেগমের পালিত ছেলে (বোনের ছেলে) মো. আনোয়ার ওরফে আজিজুলকে সিলেটের মাধবপুর এলাকায় ৫৯ কেজি মাদকসহ আটক করা হয় বলে জানা গেছে। এরপর আরও বেপরোয়া হয়ে ওঠেন শাহিনুর বেগমসহ মাদক সিন্ডিকেটের সদস্যরা বলে অভিযোগ স্থানীয়দের।
স্থানীয়দের ভাষ্য, এর আগেও এলাকাবাসীসহ স্থানীয় প্রবাসী বাসিন্দার বিরুদ্ধে একটি ওয়াক্তিয়া মসজিদ নির্মাণে বাধাগ্রস্ত করতে জমি জবরদখল করে হত্যার উদ্দেশ্যে কয়েকদফা হামলা, মিথ্যা মামলায় ফাঁসিয়ে চাঁদা দাবি ও বিভিন্নভাবে হয়রানি করে আসছে এই সিন্ডিকেট।
অন্যদিকে দুবাই প্রবাসী নওশের আলম সুমনকে দেশে ফিরলে কচু কাটা করে লাশ গুম করার হুমকি দেয়ার অভিযোগ একই সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে। ফলে ওই প্রবাসী ভয়ে দেশে ফিরতে পারছেন না। একই সাথে দেশে থাকা প্রবাসীর পরিবারের লোকজনের গুরুতর ক্ষতি করার হুমকিতে আতঙ্ক আর উদ্বেগ উৎকণ্ঠায় দিননিপাত করছেন প্রবাসীর পরিবার বলে জানিয়েছেন ভুক্তভোগীরা।
এসব ঘটনায় এলাকায় উত্তেজনাকর পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। প্রশাসনের কাছে ঘটনার সুষ্ঠু তদন্তের স্বার্থে শাহিনুর বেগমকে দ্রুত গ্রেপ্তার করে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছে এলাকার সর্বসাধারণ। একইসঙ্গে মামলার বাদী ও সাক্ষী সহ এলাকার সাধারণ নিরপরাধ মানুষের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার দাবি জানিয়েছেন ভুক্তভোগী ও স্থানীয়রা।
সদ্য সংবাদ/এসকে