গাজীপুর সাফারি পার্ক থেকে চুরি হয়ে ভারতে পাচার হওয়া তিনটি রিংটেইল লেমুরের মধ্যে দুটির সন্ধান মিলেছে গুজরাটে। ভারতের শিল্পগোষ্ঠী রিলায়েন্সের বন্য প্রাণী সংরক্ষণ প্রকল্প ‘বনতারা’য় বর্তমানে রয়েছে প্রাণী দুটি। পুলিশি তদন্তে উঠে এসেছে, বাংলাদেশ থেকে পাচারের পর কয়েক দফা হাতবদলের মাধ্যমে লেমুর দুটি প্রায় ৪৮ লাখ রুপিতে বিক্রি করা হয়।
চুরি যাওয়া প্রাণীগুলো দেশে ফিরিয়ে আনতে আন্তর্জাতিক পুলিশ সংস্থা ইন্টারপোলের সহায়তা চেয়েছে বাংলাদেশ। তবে লেমুর দুটির পরিচয় নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে সাফারি পার্কের সংরক্ষণ ব্যবস্থার ঘাটতি। প্রাণীগুলোর শরীরে মাইক্রোচিপ, আলাদা শনাক্তকরণ নম্বর কিংবা সংরক্ষিত ডিএনএ নমুনা না থাকায় মালিকানা প্রমাণের প্রক্রিয়া জটিল হয়ে পড়েছে।
সিআইডির তদন্ত এবং মামলার আসামিদের দেওয়া ১৬৪ ধারার জবানবন্দিতে লেমুর চুরি ও ভারতে পাচারের বিস্তারিত তথ্য পাওয়া গেছে। তদন্ত অনুযায়ী, ২০২৫ সালের ২৩ মার্চ রাতে গাজীপুর সাফারি পার্ক থেকে তিনটি রিংটেইল লেমুর সরিয়ে নেওয়া হয়। এর মধ্যে দুটি পরে চুয়াডাঙ্গার দর্শনা সীমান্ত হয়ে ভারতে পাঠানো হয়।
ঘটনার পরদিন পার্ক কর্তৃপক্ষ মামলা করলে তদন্তের দায়িত্ব নেয় সিআইডি। তদন্তে নিরাপত্তাকর্মী নিপেন মাহমুদের সহায়তায় জুয়েল নামের এক বন্য প্রাণী পাচারকারী লেমুরগুলো সরিয়ে নেয় বলে তথ্য পাওয়া যায়। প্রথমে বস্তায় করে প্রাণীগুলো একটি বাড়িতে রাখা হয়। পরে সেগুলোর ছবি ও ভিডিও তৈরি করে সম্ভাব্য ভারতীয় ক্রেতাদের কাছে পাঠানো হয়।
তদন্তকারীরা জানান, ২০২৫ সালের মে মাসে কলকাতার বাবলু ও মুম্বাইয়ের শিপলু নামের দুই ব্যক্তি বাংলাদেশে আসেন। তাদের সঙ্গে স্থানীয়ভাবে যোগাযোগ ও লেনদেনের সমন্বয় করেন দেলোয়ার ও তপন। এক পর্যায়ে একটি পূর্ণবয়স্ক লেমুর ও একটি শাবক ১৭ লাখ টাকায় বিক্রির চুক্তি হয়। অপর শাবকটির মূল্য নির্ধারণ করা হয় ৩ লাখ টাকা।
পরে স্থানীয় এক সীমান্ত লাইনম্যানের সহায়তায় দুটি লেমুর দর্শনা সীমান্ত দিয়ে ভারতে পাচার করা হয়। কয়েক দফা হাতবদলের পর প্রাণী দুটি গুজরাটের জামনগরে পৌঁছে যায়। সেখান থেকে ভারতীয় ক্রেতারা লেমুর দুটিকে ‘বনতারা’ প্রকল্পের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের কাছে প্রায় ৪৮ লাখ রুপিতে বিক্রি করেন বলে তদন্তে উঠে এসেছে।
পরবর্তীতে বনতারায় থাকা লেমুর দুটির ছবি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশিত হলে বিষয়টি বাংলাদেশের তদন্তকারীদের নজরে আসে। ছবির সঙ্গে গাজীপুর সাফারি পার্ক থেকে নিখোঁজ হওয়া প্রাণীগুলোর মিল পাওয়ার পর সেগুলো দেশে ফিরিয়ে আনার উদ্যোগ নেওয়া হয়।
সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলছেন, পাচার হওয়া বন্য প্রাণীর পরিচয় ও মালিকানা নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে মাইক্রোচিপ, নিবন্ধন নম্বর এবং ডিএনএ প্রোফাইল গুরুত্বপূর্ণ প্রমাণ হিসেবে কাজ করে। কিন্তু সাফারি পার্কে দীর্ঘদিন থাকার পরও ওই লেমুরগুলোর এমন কোনো স্বতন্ত্র শনাক্তকরণ ব্যবস্থা করা হয়নি।
এখন দেশে থাকা একটি শাবকের ডিএনএ পরীক্ষা করে ভারতে থাকা দুটি লেমুরের সঙ্গে জৈবিক সম্পর্ক নির্ণয়ের চেষ্টা চলছে। এর মাধ্যমে গুজরাটে থাকা প্রাণীগুলো গাজীপুর সাফারি পার্কেরই কি না, তা বৈজ্ঞানিকভাবে প্রমাণ করার চেষ্টা করছেন তদন্তকারীরা।
মামলার তদন্ত কর্মকর্তা পরিদর্শক সুনীল দাশ জানান, ২০১৮ সালের আগস্টে মিথ্যা ঘোষণা দিয়ে বিরল প্রাণীর চালানের সঙ্গে লেমুর দুটি হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর দিয়ে বাংলাদেশে আনা হয়েছিল। শুল্ক গোয়েন্দাদের হাতে চালানটি ধরা পড়ার পর প্রাণীগুলোকে গাজীপুর সাফারি পার্কে রাখা হয়। সেখান থেকেই পরে পাচারকারীদের নজরে পড়ে লেমুরগুলো।
তার ভাষ্য, এ ঘটনায় জড়িত বেশ কয়েকজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে এবং অধিকাংশ আসামি আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছেন।
তদন্তসংশ্লিষ্ট তথ্য অনুযায়ী, বিরল পাখি ও প্রাণীর একটি চালান শুল্ক গোয়েন্দাদের অভিযানে শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে আটক হয়েছিল। চালানটিতে লাভবার্ড, কাকাতুয়া, ম্যাকাও, ময়ূরের পাশাপাশি এক জোড়া লেমুরও ছিল। পরে উদ্ধার করা প্রাণীগুলোর একটি অংশ গাজীপুর সাফারি পার্কে পাঠানো হয়।
অভিযোগ রয়েছে, লেমুরগুলোকে পাখি হিসেবে ঘোষণা দিয়ে বাংলাদেশে আনা হয়েছিল। পার্কে থাকার সময় ওই জোড়া লেমুরের দুটি শাবক জন্ম নেয়। পরে পুরুষ লেমুরটি মারা গেলে মা ও দুই শাবক পার্কে অবস্থান করছিল। সেখান থেকেই তিনটি লেমুরের মধ্যে দুটি চুরি হয়ে যায়।
এ ঘটনায় মোট আটজনকে আসামি করেছে সিআইডি। তাদের মধ্যে ছয়জন আদালতে ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছেন। অপর দুই আসামি দেলোয়ার ও জহির মিয়ার জবানবন্দি নেওয়া যায়নি। গ্রেপ্তারের পর জামিনে বেরিয়ে তারা আত্মগোপনে চলে গেছেন বলে জানিয়েছে পুলিশ। জহির মিয়ার বিরুদ্ধে এর আগে ম্যাকাও পাখি চুরির সঙ্গেও সম্পৃক্ততার তথ্য পাওয়া গেছে।
২০১৮ সালে লেমুর আমদানির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠান ছিল এএসএইচএ ইন্টারপ্রাইজ। তেজগাঁওয়ের মণিপুরীপাড়ায় প্রতিষ্ঠানটির কার্যালয়ে গিয়ে তদন্তকারীরা সেটি বন্ধ অবস্থায় পেয়েছেন।
প্রতিষ্ঠানটির স্বত্বাধিকারী মো. আতিউল হাফিজ সাদ জানিয়েছেন, সিঅ্যান্ডএফ এজেন্টের ব্যবসা তাদের পারিবারিক হলেও মিথ্যা ঘোষণা দিয়ে কারা লেমুরগুলো আমদানি করেছিল, সে বিষয়ে বর্তমানে তাদের কাছে তথ্য নেই।
রিংটেইল লেমুর মাদাগাস্কারের স্থানীয় প্রাণী। কালো-সাদা বলয়যুক্ত লম্বা লেজ এ প্রাণীর অন্যতম বৈশিষ্ট্য। আন্তর্জাতিক প্রকৃতি সংরক্ষণ সংঘের (আইইউসিএন) লাল তালিকায় প্রজাতিটি ‘গুরুতরভাবে বিপন্ন’ হিসেবে চিহ্নিত। একই সঙ্গে সাইটিসের পরিশিষ্ট-১-এর অন্তর্ভুক্ত হওয়ায় বিশেষ অনুমোদন ছাড়া এ প্রাণীর আন্তর্জাতিক বাণিজ্য নিষিদ্ধ।
বন্য প্রাণী বিশেষজ্ঞ মো. রেজা খান মনে করেন, সংরক্ষিত প্রাণীর ক্ষেত্রে শুরু থেকেই ডিএনএ প্রোফাইল, মাইক্রোচিপ ও পৃথক শনাক্তকরণ নম্বর রাখা জরুরি। এতে চুরি বা পাচারের পর প্রাণীর পরিচয় এবং প্রকৃত মালিকানা প্রমাণ করা সহজ হয়।
তিনি আরও বলেন, সীমান্ত দিয়ে বন্য প্রাণী পাচার ঠেকাতে প্রযুক্তিনির্ভর নজরদারি বাড়ানোর পাশাপাশি সিসিটিভি ও আধুনিক নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদার করা প্রয়োজন। একই সঙ্গে বন অধিদপ্তর, আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ও গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর মধ্যে সমন্বয় বাড়িয়ে পাচারচক্রের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়ার ওপরও গুরুত্ব দেন তিনি।
সদ্য সংবাদ/এসএস