স্মার্টফোন ও ইন্টারনেটের সহজলভ্যতায় বদলে গেছে তরুণদের বিনোদনের ধরন। অবসর সময়ের একটি বড় অংশ এখন কাটছে অনলাইন গেম, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও বিভিন্ন ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে। প্রযুক্তির এই ব্যবহার অনেকের জন্য বিনোদন ও যোগাযোগের মাধ্যম হলেও, অতিরিক্ত গেমিংয়ের কারণে বাংলাদেশের শিশু-কিশোর ও যুবসমাজের একটি অংশের মধ্যে তৈরি হচ্ছে আসক্তির ঝুঁকি।
প্রযুক্তিনির্ভর বর্তমান সময়ে স্মার্টফোন ও ইন্টারনেট মানুষের দৈনন্দিন জীবনের গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে উঠেছে। পড়াশোনা, যোগাযোগ ও তথ্য সংগ্রহে মোবাইল ফোনের ব্যবহার যেমন প্রয়োজনীয়, তেমনি এর অতিরিক্ত ব্যবহার বিশেষ করে শিশু-কিশোর ও তরুণদের মধ্যে তৈরি করছে নতুন ধরনের আসক্তি। অনলাইন গেম, ফেসবুক, টিকটক ও অন্যান্য সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দীর্ঘ সময় কাটানোর কারণে শিক্ষার্থীদের পড়াশোনা, ঘুম, খেলাধুলা ও সামাজিক কর্মকাণ্ডে নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে বলে মনে করছেন শিক্ষক ও সচেতন নাগরিকরা।
বিশেষ করে পাবজি ও ফ্রি ফায়ারের মতো অনলাইন গেমে আগ্রহ তৈরি হওয়ার পর অনেক শিক্ষার্থী ধীরে ধীরে দীর্ঘ সময় গেম খেলায় অভ্যস্ত হয়ে পড়ছে। বন্ধুদের দেখাদেখি শুরু করলেও একপর্যায়ে অনেকেই গেম না খেলে অস্বস্তি অনুভব করেন তারা।
ষাটোর্ধ্ব মো. শহিদুল ইসলাম বলেন, মোবাইল গেমের অতিরিক্ত ব্যবহার শিশু-কিশোরদের স্বাভাবিক জীবনযাত্রায় প্রভাব ফেলছে। অনেক শিক্ষার্থী পড়াশোনার পরিবর্তে ঘণ্টার পর ঘণ্টা মোবাইল নিয়ে ব্যস্ত থাকছে। এতে তাদের মানসিক বিকাশ ও ভবিষ্যৎ নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হচ্ছে।
তিনি বলেন, অভিভাবকদের আরও সচেতন হতে হবে। সন্তানকে ব্যস্ত রাখার জন্য সবসময় হাতে মোবাইল তুলে না দিয়ে তাদের খেলাধুলা, বই পড়া ও পারিবারিক কর্মকাণ্ডে যুক্ত করার উদ্যোগ নিতে হবে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, শিশু-কিশোরদের ক্ষেত্রে অভিভাবকদের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সন্তান কতক্ষণ মোবাইল ব্যবহার করছে, কী ধরনের গেম খেলছে এবং গেমিংয়ের কারণে তার পড়াশোনা বা ঘুমের রুটিনে পরিবর্তন হচ্ছে কি না এসব বিষয়ে পরিবারের নজর থাকা প্রয়োজন।
তবে শুধু মোবাইল কেড়ে নেওয়া সমস্যার স্থায়ী সমাধান নয়। এর পাশাপাশি সন্তানকে খেলাধুলা, বই পড়া, সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড ও পরিবারের সঙ্গে সময় কাটানোর সুযোগ তৈরি করে দিতে হবে।
অনলাইন গেমে অতিরিক্ত সময় ব্যয় করলে রাত জাগার প্রবণতা তৈরি হতে পারে। এতে ঘুমের স্বাভাবিক রুটিন নষ্ট হওয়ার পাশাপাশি পড়াশোনায় মনোযোগ কমে যেতে পারে। দীর্ঘ সময় স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে থাকার কারণে শারীরিকভাবেও বিভিন্ন সমস্যা দেখা দিতে পারে।
অভিভাবকদের একটি অংশ মনে করেন, সন্তানকে শান্ত রাখা কিংবা খাওয়ানোর সময় ব্যস্ত রাখার জন্য অনেক সময় নিজেরাই তাদের হাতে মোবাইল তুলে দেন। আবার সন্তানকে চোখের সামনে রাখার সহজ উপায় হিসেবেও অনেকে মোবাইল বা ল্যাপটপ ব্যবহারের সুযোগ দেন। কিন্তু দীর্ঘমেয়াদে এই অভ্যাস শিশুদের স্ক্রিননির্ভর করে তুলতে পারে।
শিক্ষার্থীদের অনেকে জানান, শুরুতে তারা নিয়মিত গেম খেলতেন না। বন্ধুদের সঙ্গে খেলতে গিয়ে ধীরে ধীরে গেমের প্রতি আগ্রহ তৈরি হয়। পরে প্রতিদিন গেম খেলার অভ্যাস তৈরি হয়েছে। কেউ কেউ জানান, গেম খেলার সময় শেষ করার পরও আবার খেলতে ইচ্ছা করে।
সচেতন মহলের মতে, শিশু-কিশোরদের মোবাইল আসক্তি কমাতে পরিবারকে সবার আগে এগিয়ে আসতে হবে। একই সঙ্গে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে সচেতনতামূলক কার্যক্রম বাড়ানোর পাশাপাশি শিক্ষার্থীদের মাঠমুখী করতে খেলাধুলা ও সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডের সুযোগ বাড়ানো প্রয়োজন।সন্তানকে শুধু মোবাইল ব্যবহার থেকে বিরত রাখলেই হবে না; বিকল্প বিনোদন ও সৃজনশীল কর্মকাণ্ডের সুযোগও তৈরি করতে হবে। অভিভাবকদের নিজেদের মোবাইল ব্যবহারের অভ্যাসেও সংযম আনতে হবে। কারণ শিশুদের আচরণে পরিবারের বড়দের অভ্যাসেরও প্রভাব পড়ে।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, প্রযুক্তিকে পুরোপুরি দূরে সরিয়ে রাখা সম্ভব নয়। বরং প্রযুক্তির ইতিবাচক ব্যবহার নিশ্চিত করাই এখন বড় চ্যালেঞ্জ। পরিবার, শিক্ষক, সমাজ ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ সম্মিলিতভাবে উদ্যোগ নিলে শিশু-কিশোরদের অতিরিক্ত মোবাইল ও গেম আসক্তি নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব।
গেমিং বিনোদন হতে পারে, কিন্তু যখন সেই বিনোদন পড়াশোনা, ঘুম, পরিবার, সামাজিক সম্পর্ক কিংবা ভবিষ্যৎকে ছাপিয়ে যায় তখনই সেটি সতর্ক হওয়ার সংকেত। বাংলাদেশের তরুণ প্রজন্মকে ডিজিটাল দুনিয়ার সুযোগের পাশাপাশি এর ঝুঁকি সম্পর্কেও সচেতন করা এখন সময়ের দাবি।
সদ্য সংবাদ/এসএস