সাত দিনের সোশ্যাল এন্টারপ্রেনিউরশিপ এক্সপোজার প্রোগ্রাম বাংলাদেশ ও মালদ্বীপের মধ্যে শিক্ষা, সংস্কৃতি ও জনগণের পারস্পরিক যোগাযোগ আরও জোরদার করেছে।
মঙ্গলবার ( ৬ অক্টোবর) বাংলাদেশে সফল সাত দিনের একাডেমিক সফর শেষে সোশ্যাল এন্টারপ্রেনিউরশিপ এক্সপোজার প্রোগ্রাম (SEEP) ২০২৬- এর আওতায় বাংলাদেশ সফরকারী ইসলামিক ইউনিভার্সিটি অব মালদ্বীপ (IUM)-এর ১১ সদস্যের একটি প্রতিনিধিদল মালদ্বীপে নিযুক্ত বাংলাদেশের হাইকমিশনার ড. মো. নাজমুল ইসলাম-এর সঙ্গে সাক্ষাৎ করেছে। প্রতিনিধিদলে ১০ জন স্নাতক, মাস্টার্স ও পিএইচডি পর্যায়ের শিক্ষার্থী এবং একজন শিক্ষক ছিলেন।
বাংলাদেশ সফরের আগে প্রতিনিধিদলটি হাইকমিশনারের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেছিল। সাক্ষাতে শিক্ষার্থীরা ২৯ সেপ্টেম্বর থেকে ৫ অক্টোবর ২০২৬ পর্যন্ত বাংলাদেশ সফরের অভিজ্ঞতা ও অনুভূতি তুলে ধরেন।
শিক্ষার্থীরা বাংলাদেশের মানুষের উষ্ণ আতিথেয়তা, আন্তরিকতা ও বন্ধুত্বপূর্ণ আচরণের প্রশংসা করেন এবং সফরটিকে অত্যন্ত আনন্দদায়ক ও সমৃদ্ধ অভিজ্ঞতা হিসেবে বর্ণনা করেন। বিশেষ করে তারা বাংলাদেশের খাবারের ভূয়সী প্রশংসা করেন। তারা জানান, বাংলাদেশের খাবার তাদের এতটাই ভালো লেগেছে যে, মালদ্বীপে ফিরে আসার পরও তারা বাংলাদেশি খাবারের সন্ধান করছেন।
সফরকালে বাংলাদেশের তৈরি পোশাকশিল্পের পণ্যও শিক্ষার্থীদের বিশেষভাবে আকৃষ্ট করে। পাশাপাশি তারা বাংলাদেশের সামাজিক উদ্যোক্তা কার্যক্রম, সামাজিক ব্যবসা ও ক্ষুদ্রঋণ ব্যবস্থা সম্পর্কে আগ্রহ প্রকাশ করেন। ভবিষ্যতে আবারও বাংলাদেশ সফর করে দেশটির শিক্ষা, সংস্কৃতি ও সামাজিক পরিবেশ সম্পর্কে আরও জানার আগ্রহও তারা ব্যক্ত করেন।
একাডেমিক ও সাংস্কৃতিক অভিজ্ঞতা
SEEP ২০২৬- এর আওতায় আয়োজিত সফরটি ২৯ সেপ্টেম্বর থেকে ৫ অক্টোবর পর্যন্ত ড্যাফোডিল ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি (DIU)- এর আতিথেয়তায় অনুষ্ঠিত হয়। কর্মসূচিটির লক্ষ্য ছিল সামাজিক উদ্যোক্তা কার্যক্রমের ক্ষেত্রে আইইউএম শিক্ষার্থীদের একাডেমিক জ্ঞান, ব্যবহারিক শিক্ষা, প্রাতিষ্ঠানিক যোগাযোগ এবং আন্তঃসাংস্কৃতিক অভিজ্ঞতার সুযোগ সৃষ্টি করা।
সফরকালে প্রতিনিধিদলটি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, লালবাগ কেল্লা, বসুন্ধরা শপিং মল ও তুরাগ নদীসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ একাডেমিক, ঐতিহাসিক ও সাংস্কৃতিক স্থান পরিদর্শন করে। এসব পরিদর্শনের মাধ্যমে শিক্ষার্থীরা আনুষ্ঠানিক একাডেমিক কার্যক্রমের পাশাপাশি বাংলাদেশের ইতিহাস, সংস্কৃতি, নগরজীবন ও সামাজিক পরিবেশ সম্পর্কে ধারণা লাভ করেন।
২৯ সেপ্টেম্বর ঢাকায় পৌঁছানোর পর ৩০ সেপ্টেম্বর ড্যাফোডিল ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটিতে ক্যাম্পাস পরিদর্শন ও উদ্বোধনী অনুষ্ঠানের মাধ্যমে কর্মসূচি শুরু হয়। এদিন সামাজিক ব্যবসার পরিচিতি, সামাজিক ব্যবসার আর্থিক দিক এবং সামাজিক ব্যবসা মডেল ক্যানভাস বিষয়ে একাডেমিক সেশন অনুষ্ঠিত হয়। পাশাপাশি দলীয় কার্যক্রমের মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের সামাজিক ব্যবসার ধারণা সম্পর্কে ব্যবহারিক জ্ঞান প্রদান করা হয়। মালদ্বীপ ও বাংলাদেশের শিক্ষার্থীদের মধ্যে পারস্পরিক যোগাযোগ বৃদ্ধির লক্ষ্যে ক্রীড়া ও বিনোদনমূলক কার্যক্রমও আয়োজন করা হয়।
১ অক্টোবর প্রতিনিধিদলটি বাংলাদেশে অবস্থিত মালদ্বীপ হাইকমিশন পরিদর্শন করে। পরে তারা শপিংসহ বিভিন্ন কার্যক্রমে অংশ নেয়। ২ অক্টোবর তারা ঢাকার একটি ঐতিহাসিক স্থান পরিদর্শনের পাশাপাশি স্থানীয় সংস্কৃতি ও জীবনযাত্রার সঙ্গে পরিচিত হওয়ার সুযোগ পায়। ৩ অক্টোবর একাডেমিক কার্যক্রমের অংশ হিসেবে সামাজিক ব্যবসা ও টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা (SDGs), সামাজিক ব্যবসা ব্যবস্থাপনার বিভিন্ন দিক, টেকসই উন্নয়নের জন্য বিপণন এবং সামাজিক ব্যবসার পরিকল্পনা প্রণয়ন বিষয়ে বিভিন্ন সেশন অনুষ্ঠিত হয়।
দিনটির কর্মসূচিতে অংশগ্রহণকারীদের মধ্যে অনানুষ্ঠানিক মতবিনিময়ের জন্য একটি বারবিকিউ আয়োজনও ছিল। ৪ অক্টোবর শিক্ষার্থীরা তাদের চূড়ান্ত উপস্থাপনায় অংশ নেন। পরে তারা ইউনূস সেন্টার পরিদর্শন করেন এবং সনদ প্রদান অনুষ্ঠানে অংশ নেন। একইদিন তারা নোবেল মিউজিয়াম পরিদর্শন করেন। ৫ অক্টোবর প্রতিনিধিদলটি ঢাকা সফর শেষে মালদ্বীপের উদ্দেশে যাত্রা করে।
একাডেমিক বিনিময়ের গুরুত্ব তুলে ধরলেন হাইকমিশনার সাক্ষাৎকালে হাইকমিশনার ড. মো. নাজমুল ইসলাম শিক্ষার্থীদের উষ্ণ অভ্যর্থনা জানান এবং বাংলাদেশ সফরের অভিজ্ঞতা তাদের সহপাঠী, বন্ধু ও বৃহত্তর মালদ্বীপের সমাজের সঙ্গে ভাগ করে নেওয়ার আহ্বান জানান।
হাইকমিশনার শিক্ষার্থীদের বাংলাদেশ সফর এবং একাডেমিক ও সাংস্কৃতিক কার্যক্রমে সক্রিয় অংশগ্রহণের জন্য তাদের প্রশংসা করেন। তিনি বলেন, বাংলাদেশ ও মালদ্বীপের মধ্যে নিয়মিত একাডেমিক ও শিক্ষাবিনিময় দুই দেশের মধ্যে একটি গুরুত্বপূর্ণ সেতুবন্ধন হিসেবে কাজ করতে পারে। বিশেষ করে তরুণ প্রজন্মের মধ্যে পারস্পরিক যোগাযোগ, জ্ঞান ও অভিজ্ঞতা বিনিময় এবং একে অপরের সমাজ ও সংস্কৃতি সম্পর্কে গভীরতর বোঝাপড়া তৈরিতে এ ধরনের উদ্যোগ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
ড. নাজমুল ইসলাম ভবিষ্যতে এ ধরনের বিনিময় কর্মসূচি আরও নিয়মিতভাবে আয়োজনের ওপর গুরুত্বারোপ করেন এবং এতে দুই দেশের আরও বেশি শিক্ষার্থী ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠানকে সম্পৃক্ত করার প্রত্যাশা ব্যক্ত করেন।হাইকমিশনার ইসলামিক ইউনিভার্সিটি অব মালদ্বীপকে এ কর্মসূচিতে অংশগ্রহণ এবং শিক্ষার্থীদের বাংলাদেশে পাঠানোর জন্য ধন্যবাদ জানান। একইসঙ্গে প্রতিনিধিদলকে আতিথেয়তা প্রদান এবং একাডেমিক শিক্ষা, সামাজিক উদ্যোক্তা কার্যক্রম, সাংস্কৃতিক অভিজ্ঞতা ও প্রাতিষ্ঠানিক যোগাযোগের সমন্বয়ে একটি সমৃদ্ধ কর্মসূচি আয়োজনের জন্য ড্যাফোডিল ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি-এর প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন।
জনকূটনীতির কার্যকর মাধ্যম একাডেমিক বিনিময়
বাংলাদেশ হাইকমিশন মনে করে, একাডেমিক বিনিময় সাংস্কৃতিক কূটনীতি, জনকূটনীতি এবং বাংলাদেশের সফট পাওয়ার জোরদারের একটি গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম। শিক্ষার্থী, শিক্ষক, গবেষক ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে যোগাযোগের সুযোগ সৃষ্টি করে এ ধরনের উদ্যোগ দীর্ঘস্থায়ী জনগণের সঙ্গে জনগণের সম্পর্ক গড়ে তুলতে, পারস্পরিক বোঝাপড়া বাড়াতে এবং বাংলাদেশ-মালদ্বীপ সম্পর্ককে আরও অর্থবহ ও শক্তিশালী করতে ভূমিকা রাখে।
আইইউএম শিক্ষার্থীদের বাংলাদেশ সফর শেষে দেওয়া ইতিবাচক প্রতিক্রিয়া দেখিয়েছে যে, একাডেমিক বিনিময় কেবল শ্রেণিকক্ষ বা প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; বরং এটি ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা, সাংস্কৃতিক পরিচিতি ও বন্ধুত্বের সম্পর্ক তৈরির মাধ্যমে দুই দেশের জনগণের মধ্যে দীর্ঘমেয়াদি যোগাযোগকে আরও দৃঢ় করতে পারে।
হাইকমিশনার ড. মো. নাজমুল ইসলাম বলেন, “শিক্ষার্থীরা যখন একসঙ্গে শেখে, প্রতিষ্ঠানগুলো যখন পরস্পরের সঙ্গে যুক্ত হয় এবং তরুণরা যখন বন্ধুত্বের বন্ধন গড়ে তোলে, তখন শিক্ষা কূটনীতির একটি শক্তিশালী মাধ্যম হয়ে ওঠে।”
তিনি বলেন, এ ধরনের একাডেমিক বিনিময় বাংলাদেশ ও মালদ্বীপের মধ্যে তাঁর প্রস্তাবিত “Power of Bonding”- এর একটি অর্থবহ প্রকাশ, যা দুই দেশের তরুণ প্রজন্মের মধ্যে পারস্পরিক বোঝাপড়া ও বন্ধুত্বের ভিত্তি আরও শক্তিশালী করতে পারে।
সদ্য সংবাদ/এসকে