ঢাকার ডেমরা সাবরেজিস্ট্রি অফিসের সাবরেজিস্ট্রার জাহাঙ্গীর আলমের বিরুদ্ধে পাঁচ লাখ টাকা ঘুষের বিনিময়ে পূর্ববর্তী কোনো দলিল না থাকা জমি নিবন্ধন করে দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে। এ ছাড়া মৃত ব্যক্তির দেওয়া পুরোনো আমমোক্তারনামার ভিত্তিতে জমি নিবন্ধন, সরকারি রাজস্ব ফাঁকি এবং দলিল সংশোধনের ক্ষেত্রেও ঘুষ নেওয়ার অভিযোগ করেছেন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা।
অভিযোগ অনুযায়ী, ডেমরার নরাইবাগ মৌজার একটি জমি জাল দলিলের মাধ্যমে নিবন্ধন করতে গিয়ে প্রথমে দলিল লেখক সাবরেজিস্ট্রার জাহাঙ্গীর আলমের কাছে ধরা পড়েন। ওই সময় তিনি দলিল লেখক, জমির দাতা ও গ্রহীতাকে পুলিশে দেওয়ার হুমকি দেন। পরে একই জমির জন্য দলিল লেখক পরিবর্তন করা হয়। এরপর পাঁচ লাখ টাকার বিনিময়ে কমিশনের মাধ্যমে জমিটি নিবন্ধন করে দেওয়া হয় বলে অভিযোগ উঠেছে।
গত ১৩ আগস্ট ২০২৬ তারিখে জমিটি নিবন্ধন করা হয়। দলিল নম্বর ৭৫৩১/২৬।
অভিযোগে বলা হয়েছে, জমিটির অংশীদার ছিলেন দুই ভাই, ছয় বোন ও তাঁদের মা। তাঁদের মধ্যে মা, পাঁচ বোন এবং এক ভাই রেজাউল করিমের নামে জমিটি লিখে দেন। অন্য ভাই মো. নিয়াজ উদ্দীন এ ক্রয়-বিক্রয় সম্পর্কে কিছুই জানেন না বলে জানা গেছে।
এলাকাবাসীর সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, জমির দাতা ও গ্রহীতার বাবা আব্দুল জব্বার দীর্ঘদিন ওই এলাকার চেয়ারম্যান ছিলেন। অভিযোগ রয়েছে, সে সময় ক্ষমতার প্রভাব খাটিয়ে তিনি জমিটি দখল করেন। পরবর্তী সময়ে রেকর্ডের সময় নিজের নামে জমিটি রেকর্ড করিয়ে নেন। তবে জমির প্রকৃত মালিক না হওয়ায় তাঁর কাছে জমির কোনো দলিল ছিল না। এ সুযোগ কাজে লাগিয়ে সাবরেজিস্ট্রার পাঁচ লাখ টাকা ঘুষের বিনিময়ে জমিটি নিবন্ধন করে দেন বলে অভিযোগ উঠেছে।
শুধু এ জমিই নয়, ১৯৯৫ সালে আমমোক্তারনামা দেওয়া একটি জমি ২০২৬ সালে নিবন্ধন করে দেওয়ার অভিযোগও রয়েছে সাবরেজিস্ট্রার জাহাঙ্গীর আলমের বিরুদ্ধে। অভিযোগ অনুযায়ী, নিয়ম অনুসারে কোনো ব্যক্তির নামে জমির আমমোক্তারনামা দেওয়া হলে আমমোক্তারনামা প্রদানকারীর মৃত্যুর সঙ্গে সঙ্গে তা বাতিল হয়ে যায়। কিন্তু এ ক্ষেত্রে কোনো ধরনের যাচাই-বাছাই ছাড়াই তিন লাখ টাকার বিনিময়ে প্রায় ৩২ বছর আগে আমমোক্তারনামা দেওয়া ১৩ শতাংশ জমি নিবন্ধন করে দেওয়া হয়েছে।
জানা গেছে, মো. নুরুল আলম ৩২ বছর আগে আব্দুল্লাহ মোল্লাকে জমিটির আমমোক্তারনামা দেন। পরে আব্দুল্লাহ মোল্লা গত ২২ সেপ্টেম্বর ২০২৬ তারিখে তাঁর ছেলে ওমর ফারুকের নামে জমিটি লিখে দেন বলে অভিযোগ রয়েছে।
এ ছাড়া সরকারি কর ফাঁকি দিয়ে ব্যক্তিগতভাবে অর্থ নেওয়ার অভিযোগও উঠেছে সাবরেজিস্ট্রার জাহাঙ্গীর আলমের বিরুদ্ধে। অভিযোগ অনুযায়ী, কোনো আবাসন কোম্পানির কাছ থেকে জমি কেনার ক্ষেত্রে নিয়ম অনুযায়ী দেড় লাখ টাকা কর জমা দিতে হয়। তবে জাহাঙ্গীর আলম দলিল লেখকদের মাধ্যমে আবাসন কোম্পানির নাম বাদ দিয়ে সাধারণ নাগরিকের নামে দলিল করার পরামর্শ দেন। এতে সরকারকে কর হিসেবে যে অর্থ দেওয়ার কথা, তার অর্ধেক সাবরেজিস্ট্রারকে দিতে হয় বলে অভিযোগ করা হয়েছে।
এ ধরনের একটি জমি গত ৮ সেপ্টেম্বর নিবন্ধন করা হয়। জমিটির পরিমাণ সাড়ে চার শতাংশ। দলিল নম্বর ৮৩৭৫/২৬। জমির গ্রহীতা নজরুল ইসলাম এবং দাতা আলমগীর।
সাবরেজিস্ট্রার জাহাঙ্গীর আলমের বিরুদ্ধে আরও অভিযোগ রয়েছে, নতুন ফ্ল্যাটকে পুরোনো দেখিয়ে সরকারের কোটি কোটি টাকা কর ফাঁকি দেওয়া হচ্ছে। নাল জমিতে বাড়ি থাকলে এক থেকে দুই লাখ টাকা নেওয়া হয় বলেও অভিযোগ করা হয়েছে। এ ছাড়া হিন্দু সম্প্রদায়ের জমির দলিলে নামের সামান্য ভুল সংশোধনের পরও সাবরেজিস্ট্রারকে ২০ হাজার থেকে ৫০ হাজার টাকা পর্যন্ত ঘুষ দিতে হয় বলে অভিযোগ রয়েছে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক দলিল লেখক অভিযোগ করেন, টাকা ছাড়া সাবরেজিস্ট্রার কোনো কাজ করেন না। তাঁদের দাবি, তিনি পাঁচ হাজার টাকা পর্যন্ত ঘুষ নেন। আর দলিলে সামান্য ভুল থাকলেও পাঁচ থেকে দশ লাখ টাকা পর্যন্ত নেওয়া হয়।
এসব অভিযোগের বিষয়ে জানতে সরেজমিনে সাবরেজিস্ট্রার জাহাঙ্গীর আলমের সঙ্গে কথা বলা হলে তিনি অভিযোগগুলো অস্বীকার করেন। তিনি বলেন, তাঁর বিরুদ্ধে ভুল তথ্য দেওয়া হচ্ছে। তবে কাজের মধ্যে কিছু ভুল থাকতে পারে বলেও মন্তব্য করেন তিনি। তথ্য পাওয়া গেলে ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে জানান সাবরেজিস্ট্রার। সূত্র: আরটিভি
সদ্য সংবাদ/ এআর