ন্যূনতম মাসিক মজুরি ৩০ হাজার টাকা নির্ধারণ, শ্রমিকদের ব্ল্যাকলিস্টিং বন্ধ এবং অন্যায্য ছাঁটাইয়ের প্রতিবাদে পোশাকশ্রমিকদের আন্দোলনে অস্থির হয়ে উঠেছে সাভার ও আশুলিয়ার শিল্পাঞ্চল।
রবিবার (১ নভেম্বর) সকাল থেকে বিভিন্ন কারখানায় কর্মবিরতি ও বিক্ষোভের পাশাপাশি কয়েকটি স্থানে সড়ক অবরোধের ঘটনা ঘটে। উদ্ভূত পরিস্থিতিতে উৎপাদন কার্যক্রম বন্ধ রেখে এক দিনের সাধারণ ছুটি ঘোষণা করা হয় ১৭৭টি পোশাক কারখানায়।
দিনভর আন্দোলনকে কেন্দ্র করে আশুলিয়ার কয়েকটি এলাকায় শ্রমিকদের সঙ্গে পুলিশের ধাওয়া-পাল্টাধাওয়ার ঘটনা ঘটে। বিকেলে সাভারের হেমায়েতপুরে ঢাকা-আরিচা মহাসড়ক অবরোধ করেন বিভিন্ন কারখানার শ্রমিকেরা। এতে গুরুত্বপূর্ণ সড়কগুলোতে যান চলাচল ব্যাহত হয়।
শিল্প পুলিশ ও স্থানীয় সূত্র জানায়, সকাল থেকেই নিশ্চিন্তপুর, পল্লীবিদ্যুৎ, ইউনিক, জামগড়া, নরসিংহপুর, জিরাবো ও কাঠগড়াসহ আশুলিয়ার বিভিন্ন এলাকায় শ্রমিকদের মধ্যে অসন্তোষ ছড়িয়ে পড়ে। নিশ্চিন্তপুরের আল-মুসলিম অ্যাপারেলস, নিউএইজ গ্রুপের একটি কারখানা এবং ট্রাউজার লাইন লিমিটেডে শ্রমিকেরা কাজে যোগ দিয়েই কর্মবিরতি শুরু করেন। পরে তাঁদের একাংশ কারখানা থেকে বেরিয়ে আব্দুল্লাহপুর-বাইপাইল সড়কে অবস্থান নেন।
সকাল ১০টার পর শুরু হওয়া ওই অবরোধ প্রায় দুই ঘণ্টা স্থায়ী হয়। পুলিশের হস্তক্ষেপে শ্রমিকেরা সড়ক ছেড়ে গেলে যান চলাচল স্বাভাবিক হয়। এরপর আল-মুসলিম ও নিউএইজের শ্রমিকেরা কাজে ফিরলেও ট্রাউজার লাইন লিমিটেডে কর্মবিরতি চলতে থাকে।
এদিকে বেলা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে নরসিংহপুর ও ইউনিক এলাকায় বিভিন্ন কারখানার শ্রমিকেরা একত্র হয়ে বিক্ষোভ করেন। নরসিংহপুরে অনন্ত গার্মেন্টসের সামনে সড়কে অবস্থান নিয়ে তাঁরা ৩০ হাজার টাকা ন্যূনতম মজুরিসহ বিভিন্ন দাবিতে স্লোগান দেন। একপর্যায়ে শ্রমিকদের সরিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করলে পুলিশের সঙ্গে তাঁদের ধাওয়া-পাল্টাধাওয়ার ঘটনা ঘটে। এতে ওই সড়কে যান চলাচল বন্ধ হয়ে যায়।
পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে আশপাশের কারখানাগুলোতে ছুটি ঘোষণা শুরু হয়। হা-মীম গ্রুপ ও শারমিন গ্রুপের কারখানাও এ তালিকায় ছিল। দুপুর ২টার দিকে আশুলিয়া শিল্পাঞ্চল পুলিশ-১-এর পুলিশ সুপার মোহাম্মদ মোমিনুল ইসলাম ভূঁইয়া অন্তত ৫০টি কারখানায় সাধারণ ছুটির বিষয়টি নিশ্চিত করেন। পরে সাভার ও আশুলিয়া মিলিয়ে ছুটির আওতায় আসা কারখানার সংখ্যা দাঁড়ায় ১৭৭টিতে।
আন্দোলনের প্রভাব আশুলিয়ার বাইরেও ছড়িয়ে পড়ে। বিকেলে হেমায়েতপুর এলাকায় বিভিন্ন কারখানার শ্রমিকেরা ঢাকা-আরিচা মহাসড়কে অবস্থান নিয়ে অবরোধ সৃষ্টি করেন। এতে ওই পথে যান চলাচল ব্যাহত হয়। ভোগান্তিতে পড়েন যাত্রী ও পরিবহনশ্রমিকেরা। পরিস্থিতি সামাল দিতে ঘটনাস্থলে শিল্প পুলিশসহ আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা দায়িত্ব পালন করেন।
শ্রমিকদের মধ্যে উত্তেজনা কমাতে সকাল থেকেই আশুলিয়ার বিভিন্ন এলাকায় মাইকিং করে শিল্প পুলিশ। পুলিশের গাড়ি ও অটোরিকশায় মাইক লাগিয়ে শান্তিপূর্ণভাবে দাবি জানানোর আহ্বান জানানো হয়। পাশাপাশি কারখানায় হামলা, ভাঙচুর কিংবা অন্য কোনো অপ্রীতিকর ঘটনায় জড়িত না হওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়। শ্রমিকদের ন্যায্য দাবি ও অধিকার আদায়ে পুলিশ আন্তরিক এবং সরকার নতুন মজুরি বোর্ড গঠনের উদ্যোগ নিয়েছে বলেও মাইকিংয়ে জানানো হয়। একই সঙ্গে গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্ট ও কারখানার সামনে অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন করা হয়।
আশুলিয়া শিল্পাঞ্চল পুলিশ-১-এর পুলিশ সুপার মোহাম্মদ মোমিনুল ইসলাম ভূঁইয়া জানান, দিনের শুরুতে অধিকাংশ কারখানায় উৎপাদন স্বাভাবিক ছিল। নিশ্চিন্তপুরের কয়েকটি কারখানায় শ্রমিকেরা কাজ বন্ধ রাখেন। পরে অসন্তোষ ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কায় বিভিন্ন কারখানা কর্তৃপক্ষ ছুটি ঘোষণা করে। শুরুতে ৫০টি কারখানার তথ্য পাওয়া গেলেও বিকেলে সাভার ও আশুলিয়া মিলিয়ে ১৭৭টি কারখানায় সাধারণ ছুটির বিষয়টি নিশ্চিত হওয়া যায়। অপ্রীতিকর পরিস্থিতি এড়াতে পুলিশ সতর্ক অবস্থানে রয়েছে বলেও জানান তিনি।
বাংলাদেশ গার্মেন্টস ও সোয়েটার্স শ্রমিক ট্রেড ইউনিয়ন কেন্দ্রের আইনবিষয়ক সম্পাদক খায়রুল মামুন মিন্টু বলেন, সকালে বেশির ভাগ কারখানায় কাজ চলছিল। তবে কয়েকটি প্রতিষ্ঠানে শ্রমিকেরা কর্মবিরতি শুরু করেন। পরে পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে উঠলে নরসিংহপুর, জিরাবো ও কাঠগড়াসহ বিভিন্ন এলাকার কারখানায় ছুটি ঘোষণা করা হয়। শ্রমিকদের অসন্তোষ নিরসনে দ্রুত তাঁদের সঙ্গে আলোচনা করে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার আহ্বান জানান তিনি।
এদিকে শ্রমিকদের ন্যূনতম মজুরি ৩০ হাজার টাকা নির্ধারণের দাবির মধ্যেই রবিবার নতুন মজুরি বোর্ড গঠনের উদ্যোগ নেওয়ার খবর আসে। তবে শ্রমিকদের অভিযোগ, ব্ল্যাকলিস্টিংয়ের কারণে অনেকের কর্মসংস্থানের সুযোগ বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। পাশাপাশি বিভিন্ন অজুহাতে বিনা কারণে ছাঁটাইয়ের ঘটনাও ঘটছে। এসব সমস্যার সমাধান না হওয়ায় তাঁদের ক্ষোভ বাড়ছে।
শ্রমিকদের দাবি, মজুরি নির্ধারণের পাশাপাশি ব্ল্যাকলিস্টিং ও অন্যায্য ছাঁটাই বন্ধে কার্যকর ব্যবস্থা নিতে হবে। অন্যদিকে এক দিনে ১৭৭টি কারখানায় ছুটি ঘোষণা এবং বিভিন্ন স্থানে সড়ক অবরোধের ঘটনায় সাভার-আশুলিয়ার পোশাকশিল্পের উৎপাদন ও স্বাভাবিক কার্যক্রম ব্যাহত হয়েছে। শ্রমিকদের দাবি নিয়ে দ্রুত আলোচনার মাধ্যমে সমাধান না এলে শিল্পাঞ্চলের পরিস্থিতি আরও জটিল হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
সদ্য সংবাদ/এসএস