কুমিল্লার স্কুলছাত্রী জান্নাতুল তাজমিনকে (১৫) ধর্ষণের পর হত্যার ঘটনায় তদন্ত যত এগোচ্ছে, ততই সামনে আসছে তার নিখোঁজ হওয়ার আগের ও পরের নানা তথ্য। পরিবারের সঙ্গে মনোমালিন্যের পর বাড়ি ছেড়ে কক্সবাজারে যাওয়া, সেখানে এক ব্যক্তির সঙ্গে হোটেলে অবস্থান এবং ফেরার পথে অটোরিকশাচালকের হাতে প্রাণ হারানোর ঘটনা ঘিরে চলছে তদন্ত।
তদন্তসংশ্লিষ্ট তথ্য অনুযায়ী, গত ৬ অক্টোবর সন্ধ্যায় কক্সবাজারের কলাতলীর একটি আবাসিক হোটেলে ওঠেন তাজমিন। হোটেলের রেজিস্টারে তার নাম লেখা হয় ‘তানজু আক্তার’ এবং বয়স উল্লেখ করা হয় ১৮ বছর। সেখানে রিয়াজ উদ্দিন ওরফে রাজু নামে এক ব্যক্তির সঙ্গে স্ত্রী পরিচয়ে ৩০২ নম্বর কক্ষে অবস্থান করেন তিনি। পরদিন সকাল ১১টার দিকে তারা হোটেল ছাড়েন।
হোটেলের নথি ও সিসিটিভি ফুটেজ পর্যালোচনায় এসব তথ্য পাওয়া গেছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে। রেজিস্টারে রাজুর পরিচয় হিসেবে বান্দরবানের লামা এলাকার মনির আহমদের ছেলের তথ্য উল্লেখ ছিল। তবে তাজমিনের সঙ্গে তার পরিচয়ের সময়কাল নিয়ে ভিন্ন ভিন্ন তথ্য পাওয়া গেছে। একটি সূত্র বলছে, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তাদের পরিচয় হয়েছিল প্রায় ১৭ দিন আগে; অন্য একটি সূত্রের দাবি, পরিচয় ছিল প্রায় পাঁচ মাসের।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, ফেসবুক ও ইনস্টাগ্রামে বার্তা আদান-প্রদানের মাধ্যমে তাদের যোগাযোগ গড়ে ওঠে। তাজমিন কক্সবাজারে যাওয়ার আগে রাজু বিকাশের মাধ্যমে তাকে ৫০০ টাকা পাঠিয়েছিলেন বলে জানা গেছে। পরে ফেরার জন্য ৯০০ টাকা দিয়ে বাসের টিকিটের ব্যবস্থা করেন তিনি। রাজু কক্সবাজারের একটি আবাসিক হোটেলে প্রায় তিন বছর ধরে কাজ করছেন বলে তার এক সহকর্মী জানিয়েছেন। হত্যাকাণ্ডের খবর ছড়িয়ে পড়ার পর তিনি নিজেকে নির্দোষ দাবি করেন। বর্তমানে তার ব্যবহৃত মোবাইল নম্বর বন্ধ পাওয়া যাচ্ছে বলে জানা গেছে।
পরিবারের সঙ্গে মনোমালিন্যের পর গত ৪ অক্টোবর বাড়ি ছাড়ে তাজমিন। এক বান্ধবীকে হাতঘড়ি দেওয়াকে কেন্দ্র করে মায়ের সঙ্গে তার কথা-কাটাকাটি হয়েছিল বলে জানা গেছে। পরে সে ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় এক বান্ধবীর কাছে যায়। সেখান থেকে রাজুর সঙ্গে যোগাযোগের পর কক্সবাজারে পৌঁছায়।
তাজমিনের মা কেয়া খাতুন জানান, মেয়ের সঙ্গে শেষবার কথা বলার সময় সে এক বান্ধবীর বাসায় থাকার কথা জানিয়েছিল। তবে কোথায় আছে, সে বিষয়ে স্পষ্ট কিছু বলেনি। মেয়েকে ফিরিয়ে আনতে চাইলেও তার অবস্থান সম্পর্কে নিশ্চিত হতে পারেননি তিনি।
কক্সবাজার থেকে ফেরার জন্য তাজমিন ও রাজু ‘আইকনিক এক্সপ্রেস’ বাসের টিকিট সংগ্রহ করেন বলে জানিয়েছেন স্থানীয় একটি ট্রাভেল কাউন্টারের প্রতিনিধি আবদুল্লাহ। তার ভাষ্য অনুযায়ী, ৭ অক্টোবর দুপুর সাড়ে ১২টার দিকে তাজমিনকে বাসে তুলে দেওয়া হয়।
সিসিটিভি ফুটেজের তথ্য অনুযায়ী, ওই দিন রাত পৌনে ১২টার দিকে কুমিল্লার পদুয়ারবাজার বিশ্বরোডে হোটেল নূরজাহানের সামনে বাস থেকে নামেন তাজমিন। সেখান থেকে রেসকোর্স এলাকার বাসায় যাওয়ার জন্য সিএনজিচালিত অটোরিকশা ভাড়া করেন তিনি। অটোরিকশাটির চালক ছিলেন মো. সুমন মিয়া (৩৫)।
পুলিশের ভাষ্য অনুযায়ী, গন্তব্যে না নিয়ে সুমন তাজমিনকে লালমাই উপজেলার ভোরালজগতপুর উত্তরপাড়ার একটি নির্জন স্থানে নিয়ে যান। সেখানে ধর্ষণের পর গলায় গামছা পেঁচিয়ে শ্বাসরোধে তাকে হত্যা করা হয় বলে অভিযোগ রয়েছে। ৮ অক্টোবর সকালে ওই এলাকার একটি ধানখেতের আইল থেকে তার মরদেহ উদ্ধার করা হয়।
এ ঘটনায় অভিযুক্ত সুমনকে চট্টগ্রাম থেকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। তার দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে তাজমিনের ব্যবহৃত আইফোনও উদ্ধার করা হয়েছে বলে জানা গেছে। পুলিশের দাবি, সুমন আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছেন।
তদন্তকারীরা তাজমিনের মোবাইল ফোনের কলতালিকা, যোগাযোগের তথ্যসহ বিভিন্ন ডিজিটাল আলামত যাচাই করছেন। ঘটনার আগে ও পরে কার সঙ্গে তার যোগাযোগ হয়েছিল, তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
লালমাই থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মিজানুর রহমান জানিয়েছেন, মামলার তদন্ত চলমান রয়েছে। তদন্ত শেষ হলে ঘটনার বিষয়ে বিস্তারিত তথ্য জানানো সম্ভব হবে।
সদ্য সংবাদ/এসএস