সরকারি সেবা নিতে গিয়ে ঘুষ দাবির অভিযোগ জানাতে তরুণ শাহেদ শরীফ আহমেদের তৈরি ‘ঘুষ.সাইট’ এবার প্রশাসনের নজরে এসেছে। ওয়েবসাইটটিতে পাওয়া অভিযোগের ভিত্তিতে ময়মনসিংহ সদর উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কার্যালয়ের দুই কর্মচারীকে কারণ দর্শানোর নোটিশ দেওয়া হয়েছে।
শোকজ পাওয়া দুই কর্মচারী হলেন সদর উপজেলা শিক্ষা কার্যালয়ের হিসাব সহকারী এ এইচ এম নাদিরুল হাসান সবুজ এবং অফিস সহকারী কাম কম্পিউটার অপারেটর মুহাম্মদ মজিবুর রহমান। সোমবার (৩১ আগস্ট) সদর উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা মনিকা পারভীন তাদের নোটিশ দেন।
নোটিশে ঘুষ দাবি ও হয়রানির অভিযোগের বিষয়ে তিন কার্যদিবসের মধ্যে লিখিত ব্যাখ্যা দিতে বলা হয়েছে।
ঘটনার সূত্রপাত এক শিক্ষকের পরিবারের আর্থিক পাওনা ছাড়কে কেন্দ্র করে। ময়মনসিংহের আজমতপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক আমিনা খাতুন ২০২২ সালের ডিসেম্বরে মারা যান। এরপর তার প্রভিডেন্ট ফান্ডসহ অন্যান্য পাওনা তুলতে গিয়ে হয়রানি ও ঘুষ দেওয়ার অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হন তার পরিবার।
শাহেদের বাবা ও সাবেক ব্যাংক কর্মকর্তা শরীফুল ইসলাম শামীমের অভিযোগ, বিভিন্ন দপ্তর থেকে পাওনা টাকা ছাড় করাতে তাকে মোট ৩৮ হাজার টাকা ঘুষ দিতে হয়েছে। এর মধ্যে ট্রেজারি অফিসে ১০ হাজার, জেলা শিক্ষা অফিসে ২০ হাজার এবং উপজেলা শিক্ষা অফিসে ৮ হাজার টাকা দেওয়ার অভিযোগ করেন তিনি।
পরবর্তী সময়ে কল্যাণ তহবিলের প্রায় ২ লাখ টাকা এবং চাকরিরত অবস্থায় মৃত্যুর সরকারি অনুদানের প্রায় ৮ লাখ টাকা পেতে আরও ১ লাখ টাকা ঘুষ চাওয়া হয়েছিল বলেও অভিযোগ করেন তিনি। টাকা না দিলে ফাইল আটকে রাখার হুমকি দেওয়া হয়েছিল বলে দাবি তার।
এই অভিজ্ঞতা থেকেই ঘুষ ও দুর্নীতির অভিযোগ সংগ্রহের উদ্যোগ নেন শাহেদ। নিজের প্রযুক্তিগত দক্ষতা কাজে লাগিয়ে বন্ধু সাইফ কবিরকে সঙ্গে নিয়ে গত ২১ আগস্ট চালু করেন ‘ঘুষ.সাইট’।
প্ল্যাটফর্মটিতে সাধারণ মানুষ সরকারি-বেসরকারি বিভিন্ন সেবা নিতে গিয়ে ঘুষ দাবি বা হয়রানির অভিজ্ঞতা জানাতে পারছেন। উদ্যোক্তাদের দাবি, চালুর প্রথম নয় দিনেই সেখানে প্রায় ৯ হাজার ৬৬৫টি অভিযোগ জমা পড়েছে। এসব অভিযোগে দাবিকৃত ঘুষের মোট পরিমাণ আনুমানিক ৩২১ থেকে ৩৩২ কোটি টাকা।
তবে অভিযোগের সত্যতা যাচাই না করে কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের পরিচয় প্রকাশ করা হচ্ছে না। চার সদস্যের একটি দল জমা পড়া অভিযোগগুলো যাচাই-বাছাই করছে।
শাহেদ শরীফ আহমেদ বলেন, কাউকে ব্যক্তিগতভাবে হেয় বা অভিযুক্ত করা তাদের উদ্দেশ্য নয়। বিভিন্ন সরকারি দপ্তরে ঘুষ ও অনিয়মের যে অভিজ্ঞতার মুখোমুখি মানুষ হচ্ছেন, সেগুলো তথ্য হিসেবে সামনে আনাই এ উদ্যোগের লক্ষ্য।
সচেতন নাগরিক কমিটি (সনাক) ময়মনসিংহ জেলা শাখার সহসভাপতি শরীফুজ্জামান টিটু মনে করেন, ঘুষের কারণে নাগরিকরা তাদের প্রাপ্য সেবা থেকে বঞ্চিত হন। প্রযুক্তির মাধ্যমে অভিযোগের তথ্য সংগ্রহ ও বিশ্লেষণের উদ্যোগ দুর্নীতি প্রতিরোধে ভূমিকা রাখতে পারে।
ময়মনসিংহের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (প্রশাসন) আবদুল্লাহ আল মামুন জানান, তরুণদের উদ্যোগটি পুলিশের নজরে এসেছে। ঘুষ বা অনিয়মের সুনির্দিষ্ট তথ্য পাওয়া গেলে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
এদিকে দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) ময়মনসিংহের সহকারী পরিচালক রাজু মো. সারওয়ার হোসেন বলেন, ঘুষ দাবির ঘটনায় ভুক্তভোগীরা দুদকে অভিযোগ করতে পারেন। অভিযোগের ভিত্তিতে যাচাই-বাছাই করে প্রয়োজনীয় অনুসন্ধান বা অভিযান পরিচালনা করা হতে পারে।
ঘুষের বিরুদ্ধে জনসচেতনতা তৈরি এবং সরকারি সেবায় অনিয়মের তথ্য সামনে আনতে শাহেদের তৈরি এই ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম ইতোমধ্যে আলোচনায় এসেছে। এখন জমা পড়া অভিযোগগুলোর কতটা যাচাইযোগ্য এবং সেগুলোর ভিত্তিতে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ কী ব্যবস্থা নেয়, সেটিই দেখার বিষয়।
সদ্য সংবাদ/এসকে