পটুয়াখালীর কুয়াকাটা উপকূলের অদূরে বঙ্গোপসাগরে মাছ ধরতে গিয়ে বিরল প্রজাতির একটি সামুদ্রিক মাছ পেয়েছেন জেলেরা। প্রায় ৮০০ গ্রাম ওজনের মাছটির চেহারা ও গঠন সাধারণ সামুদ্রিক মাছের তুলনায় বেশ আলাদা। পরে মাছটির পরিচয় মিলেছে ‘টাইটান ট্রিগারফিশ’ হিসেবে।
শনিবার (২৯ আগস্ট) দুপুরে মাছটি মহিপুর মৎস্য বন্দরের মুন ট্রেডার্সের আড়তে আনা হলে সেটিকে ঘিরে স্থানীয়দের মধ্যে ব্যাপক আগ্রহ তৈরি হয়। মাছটি দেখতে আড়তে ভিড় করেন অনেকে।
জেলেদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ‘এফবি মায়ের দোয়া’ ট্রলারে গভীর সমুদ্রে ইলিশ ও পোয়া মাছ ধরার সময় একই জালে উঠে আসে এই মাছ। অন্যরকম দেখতে হওয়ায় মাছটি ফেলে না দিয়ে ট্রলারে করে মহিপুরে নিয়ে আসেন জেলেরা। এটি খাওয়ার উপযোগী কি না নিশ্চিত না হওয়ায় বর্তমানে বরফে সংরক্ষণ করা হয়েছে।
ট্রলারের মাঝি জাহিদুল ইসলাম জানান, মাছটির শরীরের চামড়া অত্যন্ত শক্ত এবং এর আকৃতিও অন্য মাছের চেয়ে ভিন্ন। এর আগে এ ধরনের মাছ তার জালে ধরা পড়েনি। তাই বিষয়টি জানাতে মাছটি তীরে নিয়ে আসেন তিনি।
স্থানীয় বাসিন্দা রাকিবুল ইসলাম মিজান বলেন, মাছটির বিষয়ে জানতে পেরে তিনি আড়তে দেখতে আসেন। আগে কখনো এমন মাছ দেখেননি বলেও জানান তিনি।
মুন ট্রেডার্সের ম্যানেজার মো. মিরাজ জানান, তাদের আড়তে এর আগে টাইটান ট্রিগারফিশ আসেনি। মাছটির চামড়া ও শারীরিক গঠন বেশ ব্যতিক্রমী হওয়ায় আপাতত বরফে রাখা হয়েছে।
গবেষণা সংশ্লিষ্টদের তথ্য অনুযায়ী, মাছটির বৈজ্ঞানিক নাম Balistoides viridescens। শক্ত চামড়া এবং পিঠে থাকা বিশেষ কাঁটা এ প্রজাতির অন্যতম বৈশিষ্ট্য। বিপদের সময় এই কাঁটা শক্তভাবে আটকে রাখতে পারে মাছটি। এ কারণেই ‘ট্রিগারফিশ’ নামটির প্রচলন হয়েছে। সামুদ্রিক তলদেশে থাকা শক্ত খোলসের প্রাণী শিকার ও খাওয়ার জন্য এর চোয়াল ও দাঁতও বেশ শক্তিশালী।
‘সুস্থ সাগর’ প্রকল্পের গবেষণা সহকারী মো. বখতিয়ার রহমান জানান, প্রজনন মৌসুমে টাইটান ট্রিগারফিশ নিজের এলাকা ও ডিম রক্ষায় আক্রমণাত্মক আচরণ করতে পারে। বিশ্বের কিছু এলাকায় এটি খাওয়া হলেও সিগুয়াটেরা বিষক্রিয়ার আশঙ্কা থাকায় মাছটি খাওয়ার বিষয়ে সতর্ক থাকা প্রয়োজন।
পটুয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের ফিশারিজ বায়োলজি অ্যান্ড জেনেটিকস বিভাগের চেয়ারম্যান ড. রাজিব সরকার বলেন, সামুদ্রিক পরিবেশে টাইটান ট্রিগারফিশ গুরুত্বপূর্ণ একটি প্রজাতি। বাংলাদেশের জলসীমায় এ মাছের উপস্থিতি উপকূলীয় জীববৈচিত্র্যের বৈচিত্র্য সম্পর্কে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য দিতে পারে। মাছটির ওজন, নমুনা এবং সঠিক অবস্থান সংরক্ষণ করা গেলে ভবিষ্যতে এর বিস্তৃতি ও আবাসস্থল নিয়ে গবেষণার সুযোগ তৈরি হবে।
কলাপাড়া উপজেলা সিনিয়র মৎস্য কর্মকর্তা অপু সাহা বলেন, চলতি বছর মহিপুর বন্দরে বেশ কিছু ব্যতিক্রমী সামুদ্রিক প্রাণী ও মাছ ধরা পড়েছে। টাইটান ট্রিগারফিশও এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য। এ ধরনের মাছ জালে উঠলে ছবি, ওজন এবং ধরা পড়ার স্থানসহ প্রয়োজনীয় তথ্য নথিভুক্ত করা দরকার। এতে দেশের সামুদ্রিক মৎস্যসম্পদ ও জীববৈচিত্র্য সম্পর্কে তথ্যভান্ডার সমৃদ্ধ হবে।
সাম্প্রতিক সময়ে বঙ্গোপসাগরে জেলেদের জালে একাধিক ব্যতিক্রমী সামুদ্রিক মাছ ধরা পড়ার ঘটনায় সমুদ্র গবেষকদের আগ্রহও বাড়ছে।এসব নমুনা বাংলাদেশের জলসীমায় বিদ্যমান সামুদ্রিক জীববৈচিত্র্য সম্পর্কে আরও নতুন তথ্য পাওয়ার সম্ভাবনা তৈরি করছে।
সদ্য সংবাদ/এসএস