নারায়ণগঞ্জের ফতুল্লায় বাউল শিল্পী আনিকা আক্তার অনিকা (১৯)-এর রহস্যজনক মৃত্যু ঘিরে চাঞ্চল্য ছড়িয়ে পড়েছে। শুক্রবার (৩ অক্টোবর) গভীর রাতে ভুইগড় এলাকার একটি ভাড়া বাসা থেকে তার মৃতদেহ উদ্ধার করে পুলিশ। এ ঘটনায় নিহতের স্বামী হাবিবুর রহমান (২৫)-কে আটক করে জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে।
পুলিশ ও স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, দিবাগত রাত ৩টার দিকে হাবিবুর রহমান অনিকার নিথর দেহ স্থানীয় একটি বেসরকারি হাসপাতালে নিয়ে গেলে কর্তব্যরত চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন। খবর পেয়ে ফতুল্লা মডেল থানা পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়ে হাবিবুরকে আটক করে এবং অনিকার লাশ উদ্ধার করে ময়নাতদন্তের জন্য নারায়ণগঞ্জ হাসপাতাল মর্গে পাঠায়।
নিহত অনিকা মাদারীপুর জেলার মোস্তফাকুর গ্রামের জাহাঙ্গীর আলমের মেয়ে। বিষয়টি নিশ্চিত করে ফতুল্লা মডেল থানার ওসি শরিফুল ইসলাম বলেন, ময়নাতদন্তের প্রতিবেদন হাতে পেলে মৃত্যুর প্রকৃত কারণ জানা যাবে। ঘটনাটি গুরুত্বের সঙ্গে তদন্ত করা হচ্ছে।
অনিকার বাবা জাহাঙ্গীর আলম জানান, পাঁচ বছর আগে ভালোবেসে হাবিবুরকে বিয়ে করেন অনিকা। কিন্তু বিয়ের পর থেকেই তাদের মধ্যে কলহ চলছিল। “স্ত্রীর সাথে সামান্য বিষয় নিয়েই ঝগড়া হত, এরপর সে নতুন করে বিয়ে করত। এভাবে অনিকার আগে চারটি বিয়ে করেছে হাবিব,” বলেন তিনি।
চার মাস আগে অনিকার একটি কন্যাসন্তান জন্ম নেয়। সংসারের খরচ চালাতে নবজাতককে কোলে নিয়ে রাতভর ঢাকা-নারায়ণগঞ্জ লিংক রোড সংলগ্ন বাউল ক্লাবগুলোতে গান গেয়ে জীবিকা নির্বাহ করতেন অনিকা। কিন্তু বাড়িতে ফিরে উপার্জিত অর্থ জোর করে নিয়ে যেত হাবিবুর—এমন অভিযোগ করেছে নিহতের পরিবার।
পরিবারের অভিযোগ, সম্প্রতি হাবিবুর মালা নামে এক বাউল নারী শিল্পীকে বিয়ে করেন। বিষয়টি অনিকা জানতে চাইলে হাবিবুর ক্ষিপ্ত হয়ে ঘরের আসবাবপত্র ভাঙচুর করে গ্রামের বাড়ি চাঁদপুরে চলে যায়। কিছুদিন পর অনিকার কাছে তালাকের নোটিশ পাঠায় সে।
এই নোটিশ পেয়ে অনিকা স্থানীয় গন্যমান্য ব্যক্তিদের কাছে অভিযোগ করেন। এতে হাবিবুর আরও ক্ষিপ্ত হয়ে ওঠে। অনিকার পরিবারের দাবি, এরপর হাবিবুর ‘স্বর্ণা’ নামে আরেক নারী বাউল শিল্পীকে দিয়ে অনিকার বাসায় হামলা চালায়। গত বৃহস্পতিবার রাতে স্বর্ণা বাসায় ঢুকে অনিকাকে বেধড়ক মারধর করে এবং নাক, গলা ও হাতের স্বর্ণালংকার খুলে নেয়। অনিকার চিৎকারে স্থানীয়রা এসে তাকে উদ্ধার করে হাসপাতালে ভর্তি করায়, তবে স্বর্ণা পালিয়ে যায়।
অনিকার পরিবারের অভিযোগ, পূর্ব পরিকল্পনা অনুযায়ী হাবিবুরই এই হত্যাকাণ্ড ঘটিয়েছে। পরে ঘটনাটিকে আত্মহত্যা হিসেবে চালানোর জন্য মৃতদেহ হাসপাতালে নিয়ে যায়। “আমরা এই হত্যার সুষ্ঠু তদন্ত ও দোষীদের সর্বোচ্চ শাস্তি চাই,” বলেন নিহতের বাবা জাহাঙ্গীর আলম।
তবে হাবিবুর রহমান দাবি করেছেন, তিনি অনিকাকে হত্যা করেননি। গ্রামের বাড়ি থেকে এসে ফ্ল্যাটের দরজায় অনেকক্ষণ ধাক্কা দেই। দরজা না খোলায় ভেঙে ঢুকে দেখি অনিকা জানালার গ্রিলে ওড়না পেঁচিয়ে ঝুলছে। পরে তাকে হাসপাতালে নিয়ে গেলে চিকিৎসক মৃত ঘোষণা করেন, বলেন তিনি।
তালাকের নোটিশ সম্পর্কে হাবিবুর বলেন, ওটা ভুয়া ছিল, ভয় দেখানোর জন্য পাঠিয়েছিলাম।
ফতুল্লা মডেল থানা পুলিশ বলছে, মৃত্যুর ঘটনাটি রহস্যজনক। পারিবারিক কলহ, পূর্বের বিয়ে, হামলার ঘটনা ও মৃত্যুর সময়ের পরিস্থিতি—সবকিছু মাথায় রেখে তদন্ত এগিয়ে নেওয়া হচ্ছে। ময়নাতদন্তের রিপোর্ট পাওয়ার পর পরবর্তী আইনি পদক্ষেপ নেওয়া হবে।