২০১২ সালের ১১ ফেব্রুয়ারি ঢাকার পূর্ব রাজাবাজারের বাসায় নৃশংসভাবে খুন হন মাছরাঙা টেলিভিশনের বার্তা সম্পাদক সাগর সরওয়ার ও এটিএন বাংলার জ্যেষ্ঠ প্রতিবেদক মেহেরুন রুনি। ঘটনার পর এক যুগের বেশি সময় পেরিয়ে গেলেও হত্যার মোটিভ কিংবা প্রকৃত অপরাধীদের শনাক্ত করতে পারেনি তদন্ত সংস্থাগুলো।
অন্তর্বর্তী সরকারের সময়েও নেই অগ্রগতি
৫ আগস্ট শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর প্রফেসর মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বে গঠিত অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব নেয়। এই সরকারের আমলেও মামলার তদন্তে আশার কোনো খবর আসেনি। সর্বশেষ গত ৫ জানুয়ারি ঢাকার চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে তদন্ত প্রতিবেদন জমা দেওয়ার কথা থাকলেও পিবিআই তা দিতে ব্যর্থ হয়। নতুন তারিখ ধার্য করা হয়েছে আগামী ৯ ফেব্রুয়ারি।
পরিসংখ্যান অনুযায়ী, শেখ হাসিনা সরকারের আমলে তদন্ত প্রতিবেদন পেছানো হয়েছে ১১২ বার এবং অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে ১১ বার।
টাস্কফোর্সও ব্যর্থ
অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে উচ্চ আদালতের নির্দেশে গত বছরের ৩০ সেপ্টেম্বর স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় চার সদস্যের একটি উচ্চপর্যায়ের টাস্কফোর্স গঠন করে। পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশনের (পিবিআই) প্রধান অতিরিক্ত পুলিশ মহাপরিদর্শক মো. মুস্তফা কামালকে এর প্রধান করা হয়।
ছয় মাসের মধ্যে তদন্ত শেষ করে প্রতিবেদন জমা দেওয়ার নির্দেশ থাকলেও টাস্কফোর্স নির্ধারিত সময়ে তা পারেনি। পরবর্তীতে আরও সময় নেওয়া হলেও এখনো আদালতে প্রতিবেদন জমা দেওয়া হয়নি। আগামী এপ্রিল মাসে বাড়তি সময় শেষ হওয়ার কথা, তার আগেই অন্তর্বর্তী সরকারের বিদায় নেওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
কোথায় আটকে তদন্ত?
মামলার বিভিন্ন পর্যায়ে মোট আটজনকে গ্রেফতার দেখানো হলেও পিবিআই দায়িত্ব পাওয়ার পর নতুন কাউকে আটক করা হয়নি। গ্রেফতাকৃতদের মধ্যে ছয়জন এখনও কারাগারে, দুজন জামিনে আছেন। এদের অধিকাংশই গ্রিল কাটা চোর ও ডাকাত দলের সদস্য বলে তদন্ত নথিতে উল্লেখ রয়েছে।
র্যাব ঘটনার সময় সংগৃহীত আলামতের ভিত্তিতে ২৫ জনের ডিএনএ পরীক্ষা করায়। ঘটনাস্থল থেকে সাগর–রুনি ছাড়াও আরও দুই অজ্ঞাত পুরুষের ডিএনএ পাওয়া গেলেও কারও সঙ্গে মিল পাওয়া যায়নি। যুক্তরাষ্ট্রে পাঠানো আলামত ও ডিএনএ বিশ্লেষণ থেকেও তদন্তে উল্লেখযোগ্য কোনো সূত্র মেলেনি।
এ পর্যন্ত প্রায় ১৬০ জনকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হলেও হত্যার মোটিভ বা জড়িতদের বিষয়ে নিশ্চিত হওয়া যায়নি। কার্যত ডিএনএ পরীক্ষার পর মামলাটি অচল অবস্থায় রয়েছে।
তদন্তকারীরাও হতাশ
পিবিআই প্রধান অতিরিক্ত আইজিপি মো. মুস্তফা কামাল বলেন, 'আমরা এখনো হত্যার মোটিভ ও আসামিদের শনাক্ত করতে পারিনি। আগে যা ছিল, এখনো সেই অবস্থাতেই আছে। আমরাও হতাশ।'
তিনি আরও বলেন, 'আগে গ্রেপ্তার হওয়া আটজনের সঙ্গেও হত্যাকাণ্ডের সংশ্লিষ্টতার প্রমাণ পাওয়া যায়নি। ডিএনএ পরীক্ষাও কোনো সহায়তা করতে পারেনি।'
স্বজনদের হতাশা ও ক্ষোভ
রুনির ভাই নওশের রোমান বলেন, 'অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টার সঙ্গে দেখা হলেও তদন্তে কোনো অগ্রগতি হয়নি। এই সরকারের আমলেও বিচার হলো না। ভবিষ্যতে হবে বলেও মনে হয় না।'
সাগরের মা সালেহা মনির বলেন, 'আমি আশা করেছিলাম এই সরকার অন্তত বিচার করবে। কিন্তু কিছুই হলো না। মনে হয় এর শেকড় অনেক গভীরে। তবুও আল্লাহর কাছে বিচার দিয়ে রেখেছি।'
প্রসিকিউশনের প্রশ্ন
ঢাকা মহানগর আদালতের পাবলিক প্রসিকিউটর ওমর ফারুক ফারুকী বলেন, 'তদন্ত পর্যায়ে প্রসিকিউশনের কিছু করার নেই। কিন্তু প্রশ্ন থেকেই যায়, এই সরকারের সময়েও কেন তদন্ত শেষ করা গেল না?'