অর্থ উপদেষ্টা ড. সালেহউদ্দিন আহমেদ বলেছেন, অন্তর্বর্তী সরকার পরবর্তী নির্বাচিত সরকারের জন্য দেশের অর্থনীতিকে সন্তোষজনক ও স্থিতিশীল অবস্থায় রেখে যাচ্ছে। তাঁর ভাষায়, তিনি মনে করেন অর্থনীতি এখন এমন এক পর্যায়ে আছে, যেখানে নতুন সরকার দায়িত্ব নিলে বড় ধরনের সংকটে পড়তে হবে না। পরিস্থিতি আগের মতো নড়বড়ে নয়, যদিও সামনে এখনো নানা চ্যালেঞ্জ রয়ে গেছে।
মঙ্গলবার সচিবালয়ে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের সম্মেলনকক্ষে সরকারি ক্রয়সংক্রান্ত উপদেষ্টা পরিষদ কমিটির বৈঠক শেষে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে তিনি এসব কথা বলেন।
ড. সালেহউদ্দিন আহমেদ বলেন, অর্থনীতি আর আগের মতো ভঙ্গুর বা অস্থিতিশীল অবস্থায় নেই এবং ভবিষ্যৎ সরকারের জন্য একটি স্থিতিশীল অর্থনৈতিক ভিত্তি তৈরি করা হয়েছে।
সরকার রেকর্ড পরিমাণ ঋণ নিয়েছে কি না—এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ঋণ গ্রহণ বেড়েছে ঠিকই, তবে একই সঙ্গে উল্লেখযোগ্য পরিমাণ বৈদেশিক ঋণও পরিশোধ করা হয়েছে। তাঁর হিসাবে প্রায় ছয় বিলিয়ন মার্কিন ডলার বৈদেশিক ঋণ শোধ করা হয়েছে, যা সমানভাবে গুরুত্বপূর্ণ।
অর্থ উপদেষ্টা জানান, সরকার বড় ও ব্যয়বহুল অবকাঠামো প্রকল্প এড়িয়ে চলেছে। তিনি বলেন, টানেল বা হাজার হাজার কোটি টাকার ঋণনির্ভর মেগা প্রকল্পে না যাওয়ার কারণেই সরকারি ঋণের চাপ আর বাড়েনি।
তিনি স্বীকার করেন, কর্মসংস্থান সৃষ্টি সরকারের অন্যতম বড় চ্যালেঞ্জ ছিল। কারণ, কর্মসংস্থান বাড়াতে ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পে ধারাবাহিক সহায়তা প্রয়োজন হলেও পর্যাপ্ত আর্থিক সুযোগ ছিল না। তাঁর মতে, বড় কারখানাগুলো শ্রমনির্ভর নয় এবং সেখানে নানা জটিলতা থাকে।
অর্থনৈতিক ঝুঁকি নিয়ে পরস্পরবিরোধী বক্তব্য প্রসঙ্গে ড. সালেহউদ্দিন আহমেদ বলেন, অর্থনীতি স্থিতিশীল হলেও সংস্কারগুলোকে সুসংহত করে সতর্কতার সঙ্গে এগিয়ে নিতে হবে। তিনি জোর দিয়ে বলেন, সংস্কারের জন্য সময়, সহযোগিতা ও প্রক্রিয়াগত শৃঙ্খলা প্রয়োজন, যা বাংলাদেশের জটিল প্রশাসনিক ব্যবস্থায় সহজ নয়।
তিনি বলেন, সংস্কার কেবল বক্তৃতার বিষয় নয়; এর জন্য প্রক্রিয়া, সহযোগিতা ও ধৈর্য দরকার। সিস্টেমের ভেতরের জটিলতার কারণে সহযোগিতা ছাড়া এসব কাজ বাস্তবায়ন কঠিন হয়ে পড়ে।
সংস্কারের অগ্রগতি তুলে ধরে অর্থ উপদেষ্টা জানান, ভূমি রেকর্ড ও খতিয়ান মানচিত্র ডিজিটালাইজেশনে সরকার উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি অর্জন করেছে। এতে সেবা আরও সাশ্রয়ী ও নাগরিকবান্ধব হয়েছে। তিনি বলেন, পর্চা ও ভূমি রেকর্ড ডিজিটাল হওয়ায় এখন মানুষ ২০ টাকায় সেবা পাচ্ছে, যেখানে আগে খরচ হতো ৫০০ টাকা। সারা দেশে ডিজিটাল প্রবেশাধিকারও সম্প্রসারণ করা হচ্ছে।
তিনি এ উদ্যোগকে মৌলিক সেবা সংস্কারের একটি গুরুত্বপূর্ণ উদাহরণ হিসেবে উল্লেখ করেন, যা হয়রানি কমাবে এবং স্বচ্ছতা বাড়াবে।
ড. সালেহউদ্দিন আহমেদ আরও জানান, এস আলম গ্রুপ–সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়িক স্বার্থের বিরুদ্ধে আর্থিক বিরোধ ও অর্থ পাচারের অভিযোগে আন্তর্জাতিক সালিস মোকাবিলার প্রস্তুতি নিচ্ছে সরকার। তিনি বলেন, অভিযোগের পর বিশ্বব্যাংক–সংযুক্ত সালিসি সংস্থা ইন্টারন্যাশনাল সেন্টার ফর সেটেলমেন্ট অব ইনভেস্টমেন্ট ডিসপিউটসে একটি মামলা হয়েছে। সরকার নোটিশ পেয়েছে এবং এর জবাব দিতে হবে, যা বিপুল অর্থের সঙ্গে জড়িত।
এই মামলায় সরকার আন্তর্জাতিক আইনজীবী নিয়োগের সিদ্ধান্ত নিয়েছে বলে জানান তিনি। পাশাপাশি সালিসি প্রক্রিয়া মোকাবিলায় একটি সরকারি দল ওয়াশিংটন ডিসি সফর করবে বলেও উল্লেখ করেন।
বিদ্যুৎ খাতের সংস্কার প্রসঙ্গে অর্থ উপদেষ্টা বলেন, বিদ্যুতের শুল্ক ইচ্ছামতো বাড়ানো হচ্ছে না; বরং শুল্ক কাঠামোর যৌক্তিকীকরণ করা হচ্ছে। তাঁর মতে, এটি মূল্যবৃদ্ধি নয়, বরং এক অংশ থেকে অন্য অংশে সমন্বয়, যা বিদ্যুৎ সরবরাহে কোনো প্রভাব ফেলবে না। আশুগঞ্জসহ বিভিন্ন বিদ্যুৎকেন্দ্রের দক্ষতাজনিত সমস্যাও পর্যালোচনায় রয়েছে।
ড. সালেহউদ্দিন আহমেদ বলেন, সমালোচনা থাকা সত্ত্বেও অনেক মৌলিক সংস্কার বাস্তবায়ন করা হয়েছে, যদিও সেগুলো সব সময় দৃশ্যমান নয়। তাঁর কথায়, মানুষ অনেক সময় চোখে দেখা প্রকল্প খোঁজে; কিন্তু বহু প্রক্রিয়াগত সংস্কার নীরবে সম্পন্ন হয়েছে, যা সবাই দেখতে না চাইলে চোখে পড়বে না।