বাংলাদেশ ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স অধিদপ্তরের ওয়্যারহাউজ ইন্সপেক্টর মুহিউদ্দীন খন্দকার মিজান ওরফে মহিউদ্দীনকে ঘিরে একের পর এক গুরুতর অভিযোগ উঠেছে। অবৈধ নিয়োগ ও বদলি বাণিজ্যে প্রভাব বিস্তার, চাঁদাবাজি, ভয়ভীতি প্রদর্শন, কর্মকর্তা-কর্মচারীদের ব্ল্যাকমেইল ও অপপ্রচারের অভিযোগ রয়েছে তার বিরুদ্ধে। পাশাপাশি অল্প সময়ে বিপুল সম্পদ অর্জনের অভিযোগও উঠেছে এই কর্মকর্তার বিরুদ্ধে।
সবশেষে গত জুলাইয়ে ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স অধিদপ্তরের একটি সরকারি আদেশে অসদাচরণের অভিযোগে মহিউদ্দীনকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়। এর আগে ২০২২ সালে বগুড়ার শিবগঞ্জে তার মা দুলালী বেগমের মৃত্যুর ঘটনায় দায়ের করা হত্যা মামলায়ও তাকে আসামি করা হয়েছে।
তবে এসব অভিযোগের কোনোটিই এখনো তদন্ত বা আদালতের চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে প্রমাণিত হয়নি। ফলে অভিযোগগুলোর সত্যতা নির্ধারণে নিরপেক্ষ তদন্তের প্রয়োজন রয়েছে।
সরকারি নথি অনুযায়ী, মহিউদ্দীন খন্দকার মিজান ফায়ার সার্ভিসের ওয়্যারহাউজ ইন্সপেক্টর। তার পিআইএন নম্বর ৯৯২২/১০০৪০৭।
গত ২ জুলাই ২০২৬ তারিখে ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স অধিদপ্তর তাকে সাময়িক বরখাস্তের আদেশ দেয়। আদেশে বলা হয়, এর আগের দিন ১ জুলাই সন্ধ্যা ৬টা ২০ মিনিটে ট্রেনিং কমপ্লেক্সের ব্যারাক ভবনের চতুর্থ তলার ২ নম্বর অতিথি কক্ষে সিলেট বিভাগের ১৫টি ফায়ার স্টেশনের পরিদর্শন প্রতিবেদন প্রস্তুতের কাজ চলছিল।
সেখানে সিলেট বিভাগের পরিদর্শন কমিটির সভাপতি ও ময়মনসিংহের সহকারী পরিচালক পূর্ণচন্দ্র মুৎসদ্দিসসহ পরিদর্শন দলের সদস্যরা উপস্থিত ছিলেন।
এ সময় ওয়্যারহাউজ ইন্সপেক্টর রেজায়ে রাব্বি এবং জিরাবো মর্ডান ফায়ার স্টেশন থেকে সুনামগঞ্জের শাল্লা ফায়ার স্টেশনে প্রশাসনিক কারণে বদলি হওয়া ও সাময়িক বরখাস্তকৃত ড্রাইভার সাখাওয়াত হোসেনের স্ত্রী পরিচয়দানকারী সানজিদা সুলতানা সেখানে প্রবেশ করেন।
সরকারি আদেশে বলা হয়েছে, সানজিদা সুলতানা ড্রাইভার সাখাওয়াত হোসেনকে গালিগালাজ ও লাঞ্ছিত করেন। রেজায়ে রাব্বি ওই ঘটনার ভিডিও ধারণ করার সময় মহিউদ্দীন ও ডেমরা ফায়ার স্টেশনের ফায়ারফাইটার কামাল হোসেন তার সঙ্গে তর্কে জড়িয়ে পড়েন। একপর্যায়ে সেখানে মারামারির ঘটনা ঘটে।
অধিদপ্তরের আদেশে ঘটনাটিকে ফায়ার সার্ভিসের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্নকারী অসদাচরণ হিসেবে উল্লেখ করা হয়। সরকারি কর্মচারী (শৃঙ্খলা ও আপিল) বিধিমালা, ২০১৮-এর ১২(১) বিধি অনুযায়ী মহিউদ্দীনকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়।
আদেশ অনুযায়ী, বরখাস্তকালীন তাকে সার্বক্ষণিক কর্মস্থলে উপস্থিত থাকতে হবে এবং বিধি অনুযায়ী খোরাকিভাতা পাওয়ার কথা রয়েছে। ফায়ার সার্ভিসের আরেকটি সরকারি চিঠিতে দেখা যায়, শারীরিক অসুস্থতার কারণ দেখিয়ে মহিউদ্দীন চিকিৎসা ছুটির আবেদন করেছিলেন।
জরুরি সেবাধর্মী প্রতিষ্ঠান হিসেবে ফায়ার সার্ভিসের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের অগ্নিনির্বাপন ও উদ্ধার অভিযানসহ বিভিন্ন জরুরি কাজে অংশ নিতে হয় উল্লেখ করে তার স্বাস্থ্য পরীক্ষা করার জন্য মেডিকেল বোর্ডের মাধ্যমে পরীক্ষা ও মতামত দেওয়ার অনুরোধ করা হয়।
ওই নথিতে তাকে ওয়্যারহাউজ ইন্সপেক্টর, কর্মাঞ্চল ঢাকা-৯৯ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। পাশাপাশি বর্তমানে সহকারী পরিচালক, কুমিল্লা দপ্তরের কর্মাঞ্চল-৫-এ বদলি হয়ে বরুড়া ফায়ার স্টেশনে সংযুক্ত থাকার তথ্যও রয়েছে।
মহিউদ্দীনের বিরুদ্ধে সবচেয়ে বেশি আলোচিত অভিযোগগুলোর একটি হলো ফায়ার সার্ভিসে নিয়োগ ও বদলি প্রক্রিয়ায় প্রভাব বিস্তারের অভিযোগ।
বিভিন্ন লিখিত অভিযোগে দাবি করা হয়েছে, আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে মহিউদ্দীন তৎকালীন পরিচালক (প্রশাসন ও অর্থ)-এর স্টাফ অফিসার হিসেবে দায়িত্ব পালনকালে নিয়োগ ও বদলি প্রক্রিয়ায় ব্যাপক প্রভাব বিস্তার করেছিলেন।
অভিযোগকারীদের দাবি, ২০১৯ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত কয়েক হাজার ফায়ার ফাইটার ও ড্রাইভার নিয়োগকে কেন্দ্র করে কোটি কোটি টাকার অবৈধ লেনদেন হয়েছে। কোথাও প্রায় ৩ হাজার, আবার কোথাও প্রায় ৩ হাজার ৫০০ ফায়ার ফাইটার ও ড্রাইভার নিয়োগের কথা উল্লেখ করা হয়েছে।
বগুড়া, পাবনা ও সিরাজগঞ্জসহ বিভিন্ন এলাকায় নিয়োগের মাধ্যমে অর্থ আদায়ের অভিযোগও করা হয়েছে। তবে এসব আর্থিক লেনদেনের অভিযোগের স্বাধীন প্রমাণ বা চূড়ান্ত তদন্তের ফলাফল এখনো পাওয়া যায়নি।
নিয়োগ ও বদলি বাণিজ্যের পাশাপাশি অল্প সময়ে বিপুল সম্পদ অর্জনের অভিযোগও রয়েছে মহিউদ্দীনের বিরুদ্ধে। লিখিত অভিযোগে তার নামে বা নিয়ন্ত্রণে কয়েকটি ট্রাক, ঢাকার উত্তরায় প্রায় তিন কাঠা জমি এবং বিভিন্ন এলাকায় জমি কেনার তথ্যের কথা উল্লেখ করা হয়েছে।
অভিযোগকারীদের দাবি, তার সম্পদ বিবরণী, ব্যাংক লেনদেন, জমি ও যানবাহনের মালিকানা এবং নিয়োগ-বদলি সংক্রান্ত নথি যাচাই করা হলে অভিযোগগুলোর প্রকৃত চিত্র বেরিয়ে আসতে পারে।
এ কারণে দুর্নীতি দমন কমিশনসহ সংশ্লিষ্ট সংস্থার মাধ্যমে বিষয়টি অনুসন্ধানের দাবি জানানো হয়েছে। মহিউদ্দীনের বিরুদ্ধে সবচেয়ে গুরুতর অভিযোগগুলোর একটি হলো তার মা দুলালী বেগমের মৃত্যুর ঘটনায় করা হত্যা মামলা।
২০২২ সালের ২৯ মার্চ বগুড়ার শিবগঞ্জ আমলী আদালতে দায়ের করা মামলার নথিতে মহিউদ্দীন খন্দকার মিজানকে তিন নম্বর আসামি করা হয়েছে। মামলায় দণ্ডবিধির ৩০২/৩৪ ধারা উল্লেখ করা হয়েছে।
মামলার বাদী মো. আব্দুল মোমিন খন্দকার নিজেকে বাংলাদেশ ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সের একজন সদস্য হিসেবে উল্লেখ করেছেন।
মামলার অভিযোগ অনুযায়ী, পারিবারিক সম্পত্তি নিয়ে বিরোধের সূত্রপাত হয় ২০১৯ সালে। অভিযোগে বলা হয়েছে, ৩ এপ্রিল ২০১৯ তারিখে হেবা ঘোষণার একটি দলিলের মাধ্যমে বসতবাড়িসহ ৫১ শতক জমি মহিউদ্দীন তার বাবার কাছ থেকে নিজের নামে নেন।
পরে পারিবারিক বিরোধের জেরে সম্পত্তির একটি অংশ বাদীর নামে লিখে দেওয়ার বিষয়েও সালিশ হয় বলে মামলার নথিতে উল্লেখ রয়েছে। মামলার বর্ণনা অনুযায়ী, ২০২২ সালের ২৪ মার্চ সকালে পারিবারিক বিষয় নিয়ে দুলালী বেগমের সঙ্গে আসামিদের ঝগড়া-বিবাদ হয়।
বাদীর অভিযোগ, ওই বিরোধের জের ধরে মহিউদ্দীনের পরামর্শে তার দুই স্ত্রী ও অন্যরা দুলালী বেগমকে হত্যার পরিকল্পনা করেন। অভিযোগে বলা হয়েছে, ওই দিন রাত আনুমানিক ১১টা থেকে সাড়ে ১১টার মধ্যে দুলালী বেগমের শয়নকক্ষে প্রবেশ করে তাকে শ্বাসরোধ করে হত্যা করা হয়।
পরে রাত আনুমানিক ১টার দিকে তার মৃত্যুর খবর পান বাদী। ঘটনাস্থলে গিয়ে মায়ের মরদেহ দেখে মৃত্যুকে অস্বাভাবিক মনে হওয়ায় ৯৯৯ নম্বরে ফোন করা হয় বলে মামলার নথিতে উল্লেখ রয়েছে।
বাদীর অভিযোগ, পরে পুলিশ ঘটনাস্থলে গেলেও ময়নাতদন্ত ছাড়াই মরদেহ দাফন করা হয়। এ ঘটনায় লাশ উত্তোলন, সুরতহাল ও ময়নাতদন্তের আবেদনও করা হয়।
তবে হত্যা মামলায় করা এসব অভিযোগ আদালতে চূড়ান্তভাবে প্রমাণিত হয়েছে এমন কোনো তথ্য নেই। মহিউদ্দীনের বিরুদ্ধে দেওয়া সাম্প্রতিক কয়েকটি অভিযোগে কর্মকর্তা-কর্মচারীদের ভয়ভীতি প্রদর্শন, ব্ল্যাকমেইল ও চাঁদাবাজির অভিযোগও করা হয়েছে।
এমনকি নিজেকে রাজনৈতিকভাবে প্রভাবশালী ব্যক্তিদের ঘনিষ্ঠ পরিচয় দিয়ে ফায়ার সার্ভিসের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের ওপর প্রভাব বিস্তারের চেষ্টা করার অভিযোগও রয়েছে।
একটি অভিযোগে বগুড়ার একজন প্রতিমন্ত্রীর নাম ব্যবহার করে ভয়ভীতি প্রদর্শন ও চাঁদাবাজির অভিযোগ তোলা হয়েছে। তবে এসব অভিযোগের পক্ষেও স্বাধীনভাবে যাচাই করা প্রমাণ এখনো প্রকাশ্যে আসেনি।
অভিযোগকারীদের একাংশের দাবি, আওয়ামী লীগ সরকারের সময় ফায়ার সার্ভিসের প্রশাসন ও অর্থ শাখায় প্রভাবশালী কর্মকর্তাদের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে কাজ করতেন মহিউদ্দীন। পরবর্তীতে তিনি আবার প্রশাসন শাখায় স্টাফ অফিসার হিসেবে দায়িত্ব পালনের চেষ্টা করেন বলেও অভিযোগ রয়েছে।
তবে ২০২৫ সালের ২ জুলাই মহিউদ্দীন অধিদপ্তরে মহাপরিচালকের মৌখিক নির্দেশে যোগ দিয়েছিলেন এমন দাবির পক্ষে সরবরাহ করা নথিতে কোনো পৃথক সরকারি আদেশ পাওয়া যায়নি।
একটি গুরুত্বপূর্ণ জরুরি সেবাধর্মী প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তাকে ঘিরে নিয়োগ-বদলি বাণিজ্য, অবৈধ সম্পদ, চাঁদাবাজি, ভয়ভীতি প্রদর্শন থেকে শুরু করে হত্যা মামলায় আসামি হওয়ার মতো গুরুতর অভিযোগ সামনে আসায় বিষয়টি নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
তবে অভিযোগ ওঠা আর অভিযোগ প্রমাণিত হওয়া এক বিষয় নয়। তাই মহিউদ্দীনের বিরুদ্ধে ওঠা প্রতিটি অভিযোগের নিরপেক্ষ তদন্ত প্রয়োজন বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
নিয়োগ ও বদলি সংক্রান্ত নথি, আর্থিক লেনদেন, সম্পদের বিবরণী, সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের বক্তব্য এবং ২০২২ সালের হত্যা মামলার বর্তমান অবস্থা যাচাই করা হলে প্রকৃত চিত্র বেরিয়ে আসতে পারে।
অভিযোগ সত্য হলে আইন ও সরকারি বিধি অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া এবং অভিযোগ প্রমাণিত না হলে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাকে দায়মুক্ত করার পথও তদন্তের মাধ্যমেই নিশ্চিত করা সম্ভব।
সদ্য সংবাদ/ এসএস