মোহন জানান, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে একটি চাকরির বিজ্ঞাপন দেখে তিনি আবেদন করেন। সেখানে ইলেকট্রনিক্স খাতে কাজের বিপরীতে বাংলাদেশে তার বর্তমান আয়ের পাঁচ গুণ বেশি বেতনের প্রস্তাব দেওয়া হয়েছিল। উন্নত জীবনের আশায় তিনি রাশিয়ায় যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেন।
রাশিয়ায় পৌঁছে প্রথমে পূর্বাঞ্চলের স্ভোবোদনি এলাকায় ইলেকট্রনিক্সের কাজ পান তিনি। তবে বাংলাদেশের উষ্ণ আবহাওয়ায় অভ্যস্ত মোহনকে সেখানে মাইনাস ২০ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রার কঠিন পরিবেশে কাজ করতে হয়।
পাঁচ মাস পর এক রুশ এজেন্ট তাকে আরও ভালো কাজ ও নিরাপদ স্থানে বদলির আশ্বাস দেন। কিন্তু বাস্তবে তাকে এবং আরও কয়েকজনকে নিয়ে যাওয়া হয় রোস্তভ-অন-ডনের একটি সামরিক ঘাঁটিতে। সেখানে তিন সপ্তাহ ধরে তাদের সামরিক প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়।
মোহনের ভাষ্য, তাকে বলা হয়েছিল যুদ্ধের সম্মুখসারিতে পাঠানো হবে না। তবুও তাকে অ্যাসল্ট রাইফেল চালানো, আরপিজি ব্যবহার এবং গ্রেনেড নিক্ষেপের প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়। বিষয়টিকে নিয়মিত প্রক্রিয়া বলে বিশ্বাস করানো হয়েছিল।
পরে দোনেৎস্ক অঞ্চলের একটি সেনাছাউনিতে পৌঁছালে তিনি জানতে পারেন, চুক্তিপত্র অনুযায়ী তিনি একটি ব্যাটালিয়নে যোগ দিয়েছেন। তখন তিনি নিয়োগ সংস্থার কাগজপত্র দেখিয়ে দাবি করেন, তাকে বেসামরিক কাজে নিয়োগ দেওয়ার কথা ছিল। তবে সেখানকার কমান্ডার স্বীকার করেন, তাকে প্রতারণার মাধ্যমে যুদ্ধে আনা হয়েছে।
এরপর মোহনকে পাঠানো হয় ইউক্রেনের আভদিভকা এলাকায়। সেখানে তার দায়িত্ব ছিল গোলাবারুদ, অস্ত্র ও জ্বালানি সরবরাহ করা এবং নিহত সেনাদের মরদেহ উদ্ধার করা।
তিনি জানান, প্রতিবার ট্রেঞ্চ থেকে বের হওয়ার সময় আতঙ্কে কাঁপতেন। যুদ্ধক্ষেত্রে যাওয়ার তৃতীয় দিনেই শ্র্যাপনেলের আঘাতে আহত হন তিনি। পরে তার সঙ্গে শুরু থেকে থাকা আরেক বাংলাদেশি খনিবিস্ফোরণে নিহত হন।
মোহনের দাবি, রুশ বাহিনীর কমান্ডাররা তার বেতন আত্মসাৎ করতেন। এ নিয়ে প্রতিবাদ করলে তাকে মারধর ও নির্যাতনের শিকার হতে হয়। কখনো সংকীর্ণ বেসমেন্টে আটকে রাখা হতো, আবার অন্যদের উল্টো ঝুলিয়ে নির্যাতন করার ঘটনাও তিনি দেখেছেন বলে জানান।
তিনি আরও বলেন, যুদ্ধক্ষেত্রে নাইজেরিয়া, নেপাল, উগান্ডা, মিসর ও ইরাকসহ বিভিন্ন দেশের নাগরিকদের সঙ্গে তার দেখা হয়েছে। উত্তর কোরিয়ার সেনাদের উপস্থিতিও তিনি লক্ষ্য করেছেন।
দীর্ঘ আট মাস পর ২০২৫ সালের শেষ দিকে ছুটির সুযোগে মস্কো যান মোহন। সেনাবাহিনী তার পাসপোর্ট আটকে রাখায় বাংলাদেশ দূতাবাসের সহায়তায় অস্থায়ী ভ্রমণ দলিল সংগ্রহ করেন। পরে নানা জিজ্ঞাসাবাদ শেষে বিমানে উঠতে সক্ষম হন।
দেশে ফিরে পরিবারের সঙ্গে পুনর্মিলনের মুহূর্তের বর্ণনা দিতে গিয়ে আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন তিনি। মোহন বলেন, তার মা ভেবেছিলেন তিনি আর কখনো ফিরে আসবেন না।
বর্তমানে পরিবারের সঙ্গে দেশে অবস্থান করছেন মোহন। নিজের অভিজ্ঞতার কথা তুলে ধরে তিনি বাংলাদেশি তরুণদের সতর্ক করে বলেছেন, হোয়াটসঅ্যাপ, টেলিগ্রাম কিংবা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বিদেশে উচ্চ বেতনের চাকরির প্রলোভনে সহজে বিশ্বাস করা উচিত নয়। বিশেষ করে ট্রাভেল এজেন্সি বা জব প্লেসমেন্ট প্রতিষ্ঠানের আড়ালে অনেক প্রতারক চক্র সক্রিয় রয়েছে বলেও তিনি সতর্ক করেন।