খোঁজ নিয়ে দেখা গেছে, ২০১৯ সাল থেকে ২০২৫ সালের মধ্যে কেরানীগঞ্জ উপজেলায় অন্তত ৩০টির বেশি বড় আগুন ও বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটেছে। এসব ঘটনায় প্রাণ গেছে কমপক্ষে ১৫ জনের, আহত হয়েছেন ৫০ জনের বেশি। ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে শতাধিক পরিবার ও ব্যবসা প্রতিষ্ঠান।
হাসনাবাদ, গদারবাগ, কালিন্দি, চুলকুটিয়া, বাবুবাজার—এই এলাকাগুলোর নাম বারবার উঠে আসে দুর্ঘটনার খবরে। অথচ এসব এলাকাই ঘনবসতিপূর্ণ। স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, অনেকেই জানেন না পাশের বাড়ি বা গলির ভেতরে কী ধরনের কেমিক্যাল মজুত আছে।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, কেরানীগঞ্জে ৫০ থেকে ৯০টির বেশি কেমিক্যাল গুদাম ও ঝুঁকিপূর্ণ কারখানা আবাসিক এলাকার ভেতরেই পরিচালিত হচ্ছে। এর বড় অংশের ফায়ার সার্ভিসের লাইসেন্স নেই, পরিবেশ অধিদপ্তরের ছাড়পত্র নে্, নিয়মিত নিরাপত্তা পরিদর্শনের কোনো রেকর্ড নেই। তারপরও এসব প্রতিষ্ঠান বছরের পর বছর নির্বিঘ্নে চলছে।
প্রশিক্ষণহীন শ্রমিক দিয়ে ঝুঁকিপূর্ণ কাজ অর্থাৎ এসব আগুন বা বিস্ফোরণ হঠাৎ নয়, বরং আগে থেকেই ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় থাকা জায়গাতেই ঘটছে।
প্রায় প্রতিটি বড় দুর্ঘটনার পরই প্রশাসনের পক্ষ থেকে তদন্ত কমিটি গঠনের ঘোষণা আসে। কিন্তু বাস্তবে কী হয়, তার স্পষ্ট কোনো তথ্য নেই। অনুসন্ধানে দেখা গেছে, গত ছয় বছরে গঠিত অধিকাংশ তদন্ত কমিটির রিপোর্ট জনসম্মুখে আসেনি।
কোথাও দায় নির্ধারণ হলেও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির নজির নেই। অনেক ক্ষেত্রে ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারকে সামান্য আর্থিক সহায়তা দিয়ে বিষয়টি মিটিয়ে ফেলা হয়েছে। ফলে একই এলাকায়, এমনকি একই ধরনের কারখানায় আবারও দুর্ঘটনা ঘটছে।
কেরানীগঞ্জ শিল্পঘন এলাকা হলেও নিয়মিত ফায়ার সেফটি অডিট, ঝুঁকিপূর্ণ কেমিক্যাল গুদাম চিহ্নিতকরণ বা স্থানান্তরের কার্যকর উদ্যোগ চোখে পড়ে না। ফায়ার সার্ভিস, উপজেলা প্রশাসন, পরিবেশ অধিদপ্তর ও কলকারখানা পরিদর্শন অধিদপ্তরের মধ্যে সমন্বয়ের অভাব স্পষ্ট।
স্থানীয়দের অভিযোগ, দুর্ঘটনার আগে কোনো সতর্কতা নেই, আর ঘটনার পর প্রশাসনের তৎপরতা সীমাবদ্ধ থাকে ঘটনাস্থলে গিয়ে বক্তব্য দেওয়ার মধ্যেই।
স্কুল, মাদ্রাসা ও বাজারের কাছেই কেমিক্যাল গুদাম থাকায় শিশু ও সাধারণ মানুষের জীবন প্রতিদিন ঝুঁকির মুখে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, অবৈধ কেমিক্যাল গুদাম উচ্ছেদ, ঝুঁকিপূর্ণ শিল্প স্থানান্তর এবং তদন্ত প্রতিবেদনের ভিত্তিতে শাস্তি নিশ্চিত না করা পর্যন্ত কেরানীগঞ্জে আগুন ও বিস্ফোরণ বন্ধ হবে না।
তার আগ পর্যন্ত কেরানীগঞ্জ থাকবে একটি নীরব ঝুঁকির ওপর দাঁড়িয়ে থাকা জনপদ।
সদ্য সংবাদ/ইস্পাহানী ইমরান