বিগত সরকারের আমলে গুম, খুন ও রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ দমনে রাষ্ট্রীয় বিভিন্ন সংস্থাকে ব্যবহার করে চারটি অপরাধী চক্র গড়ে তোলা হয়েছিল বলে অভিযোগ করেছেন সাবেক সেনাপ্রধান জেনারেল (অব.) ইকবাল করিম ভূঁইয়া। রোববার আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে দেওয়া জবানবন্দিতে তিনি বলেন, শেখ হাসিনার নিরাপত্তা উপদেষ্টা মেজর জেনারেল (অব.) তারিক আহমেদ সিদ্দীকির নেতৃত্বেই এসব চক্র পরিচালিত হতো।
ন্যাশনাল টেলিকমিউনিকেশন মনিটরিং সেন্টারের সাবেক মহাপরিচালক জিয়াউল আহসানের বিরুদ্ধে দায়ের করা মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল–১-এ এই সাক্ষ্য দেন সাবেক সেনাপ্রধান। বিচারপতি মো. গোলাম মর্তূজা মজুমদারের নেতৃত্বাধীন ট্রাইব্যুনালে তার জবানবন্দি গ্রহণ করা হয়।
জবানবন্দিতে ইকবাল করিম ভূঁইয়া বলেন, তারিক আহমেদ সিদ্দীকি নিজেকে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও বাহিনীপ্রধানদের মধ্যকার ‘সুপার চিফ’ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছিলেন। ডিজিএফআই, এনএসআই, র্যাব, এনটিএমসি, আনসার ও বিজিবিসহ বিভিন্ন সংস্থাকে তিনি নিজের নিয়ন্ত্রণে আনেন। এর মাধ্যমেই চারটি আলাদা চক্রের সৃষ্টি হয়। প্রথমটি ছিল অপরাধ চক্র, যেখানে ডিজিএফআই, এনএসআই, র্যাব ও এনটিএমসি ব্যবহৃত হতো। এই চক্রের মাধ্যমে রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ দমন, হত্যা ও গুমের মতো ঘটনা ঘটানো হয়।
তিনি জানান, দ্বিতীয় চক্রটি ছিল ডিপ স্টেট, যা এমএসপিএম, ডিজিএফআই ও এনএসআইয়ের মাধ্যমে পরিচালিত হতো। এই কাঠামোর ভেতর দিয়েই তিন বাহিনী সংক্রান্ত নীতিনির্ধারণী সিদ্ধান্ত নেওয়া হতো, যা অনেক সময় বাহিনীপ্রধানদের সিদ্ধান্তের সঙ্গে সাংঘর্ষিক ছিল।
সাবেক সেনাপ্রধানের ভাষ্য অনুযায়ী, তৃতীয় চক্রটি ছিল কেনাকাটা চক্র। এতে পিএসও, এএফডি, ডিজিডিপি ও বাহিনীপ্রধানরা যুক্ত ছিলেন। এর মাধ্যমে বিভিন্ন সামরিক ও রাষ্ট্রীয় কেনাকাটায় প্রভাব বিস্তার করা হতো। চতুর্থ চক্রটি ছিল সামরিক প্রকৌশলী চক্র। ইঞ্জিনিয়ারিং কোরের কর্মকর্তা হওয়ায় তারিক আহমেদ সিদ্দীকি ইঞ্জিনিয়ারিং কোরের জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তাদের নিয়ে আলাদা একটি নেটওয়ার্ক গড়ে তোলেন এবং তাদের মাধ্যমে বিভিন্ন জাতীয় প্রকল্পে প্রভাব বিস্তার করেন, যা অবৈধ অর্থ আয়ের প্রধান উৎসে পরিণত হয়।
র্যাব প্রসঙ্গে ইকবাল করিম ভূঁইয়া বলেন, সেনাপ্রধান হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার পর তিনি র্যাবের তৎকালীন এডিজি কর্নেল মুজিবকে ডেকে ক্রসফায়ার বন্ধের নির্দেশ দেন এবং র্যাব ইন্টেলিজেন্সের প্রধান লে. কর্নেল জিয়াউল আহসানকে নিয়ন্ত্রণে রাখার কথা বলেন। শুরুতে আশ্বাস মিললেও পরে তিনি বুঝতে পারেন, ঘটনাগুলো বন্ধ না হয়ে বরং আড়ালে ঘটছে। বেনজীর আহমেদ র্যাবের ডিজি এবং জিয়াউল আহসান এডিজি হওয়ার পর পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে ওঠে।
তিনি জানান, জিয়াউল আহসানের সঙ্গে কথা বলতে তিনি ডিরেক্টর মিলিটারি ইন্টেলিজেন্স ব্রিগেডিয়ার জেনারেল জগলুল আহসান ও আর্মি সিকিউরিটি ইউনিটের কমান্ডিং অফিসার ব্রিগেডিয়ার জেনারেল ফজলকে দায়িত্ব দেন। তবে তাদের কেউই কার্যকর কোনো প্রতিশ্রুতি আদায় করতে পারেননি। পরবর্তীতে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা হিসেবে জিয়াউল আহসানকে র্যাব থেকে সেনাবাহিনীতে ফিরিয়ে আনার আদেশ দেওয়া হলেও তা মানা হয়নি। একপর্যায়ে তাকে সেনানিবাসে প্রবেশ নিষিদ্ধ করা হলেও প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশে সেই নিষেধাজ্ঞা তুলে নেওয়া হয়।
সাবেক সেনাপ্রধান আরও বলেন, র্যাবে দায়িত্ব পালনের পর অনেক পেশাদার সেনা কর্মকর্তা পেশাদার খুনি হয়ে ফিরতেন, যা তাকে গভীরভাবে ব্যথিত করত। এ পরিস্থিতিতে তিনি সেনাবাহিনীর ভবিষ্যৎ নিয়ে উদ্বিগ্ন হয়ে প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে সাক্ষাৎ করে র্যাবে নিয়োজিত সেনা সদস্যদের ফিরিয়ে আনার অনুরোধ জানান। তখন প্রধানমন্ত্রী স্বীকার করেন, র্যাব রক্ষীবাহিনীর চেয়েও খারাপ হয়ে উঠেছে। তবে এ বিষয়ে কোনো কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি।