নির্বাচনে প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বিতা হচ্ছে দুই দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক শক্তির মধ্যে—একটি হলো ইসলামপন্থি জামায়াতে ইসলামী, যা মধ্যপন্থি হিসেবে পরিচিত, এবং অন্যটি হলো বিএনপি, যার নেতৃত্ব এখন সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার ছেলে তারেক রহমানের হাতে। ভোটের পূর্বাভাসে বিএনপি জয়ী হওয়ার সম্ভাবনা বেশি। তবে রাজনৈতিক বাস্তবতা এবং দুই দলের শাসনকালের দুর্নীতি ও কড়া সমালোচনা মনে করিয়ে দেয় যে, পরবর্তী সরকারকে বড় চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে হবে।
বিপ্লবের পরের বাংলাদেশ নতুন রাজনৈতিক এজেন্ডার দিকে এগোবার সুযোগ পেয়েছে, কিন্তু পুরোপুরি তা কাজে লাগানো যায়নি। অভ্যুত্থানের সময় দেশের ভয়াবহ রাজনৈতিক অস্থিরতা কাটিয়ে ওঠা এবং অন্তর্বর্তী সরকারের শান্তি বজায় রাখা এমন একটি অর্জন, যা উদ্যাপনের যোগ্য।
অর্থনৈতিক অগ্রগতি এখন পরবর্তী সরকারের প্রধান চ্যালেঞ্জ। নোবেলজয়ী অর্থনীতিবিদ মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বে অন্তর্বর্তী সরকার দেশকে বড় ধরনের অর্থনৈতিক বিপর্যয় থেকে রক্ষা করেছে। তবে দীর্ঘমেয়াদি সংস্কার এবং কাঠামোগত পরিবর্তন এখন অপরিহার্য। বাংলাদেশ চলতি বছর ‘স্বল্পোন্নত দেশ’ থেকে উত্তরণ ঘটাতে যাচ্ছে। এর ফলে বাণিজ্যে বিশেষ সুবিধা ও স্বল্পসুদে ঋণের সুযোগ ধীরে ধীরে কমে যাবে। নতুন সরকারকে শিল্পকারখানার দক্ষতা বাড়ানো, রাজস্ব আদায় বৃদ্ধি করা (বর্তমানে জিডিপির মাত্র ৭ শতাংশ), অপ্রয়োজনীয় আমলাতান্ত্রিক জটিলতা কমানো এবং দুর্নীতিগ্রস্ত কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে কড়া ব্যবস্থা নেওয়া জরুরি।
আন্তর্জাতিক সম্পর্কেও নতুন নেতৃত্বকে সঠিক ভারসাম্য বজায় রাখতে হবে। বিশেষ করে ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক বাংলাদেশের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। দীর্ঘদিন শেখ হাসিনাকে সমর্থন দেওয়ার ফলে দেশের মধ্যে কিছু ক্ষোভ রয়েছে, আবার হিন্দুবিদ্বেষের অভিযোগও দুই দেশের মধ্যে উত্তেজনার সূত্রপাত করেছে। নতুন সরকারকে এই সম্পর্ক নতুন করে গুছিয়ে নিতে হবে।
ভেতরের রাজনৈতিক সংস্কারও চ্যালেঞ্জের মধ্যে রয়েছে। নির্বাচনের দিন নাগরিকদের গণভোটের মাধ্যমে সাংবিধানিক সংস্কারের পক্ষে মত দেওয়ার সুযোগ থাকবে। এর লক্ষ্য ভবিষ্যতে স্বৈরতন্ত্রের পুনরাবিরোধ কমানো। পরবর্তী সরকারের দায়িত্ব হবে এই সংস্কারগুলোকে কার্যকর আইনি কাঠামোর মধ্যে বাস্তবায়ন করা, যদিও এর প্রতি প্রতিরোধ ও প্রলোভন থাকবে।
অন্তর্বর্তী সরকার ইতিমধ্যেই আওয়ামী লীগের কার্যক্রম নিষিদ্ধ করেছে। পরবর্তী সরকারকে দলটির ভবিষ্যৎ নিয়ে ন্যায্য সিদ্ধান্ত নিতে হবে। বিষয়টি কঠিন, কারণ শেখ হাসিনার শাসনামলে প্রায় ১,৪০০ মানুষের মৃত্যু হয়েছে, যা দল এখনও স্বীকার করেনি। তবে নতুন বাংলাদেশ গড়তে হলে ন্যায়বিচারের সঙ্গে ক্ষমার ভারসাম্যও রাখতে হবে।
বিপ্লবের পর বাংলাদেশ এখন ঝুঁকিপূর্ণ কিন্তু সম্ভাবনাময় এক পথচলায়। আসন্ন নির্বাচন গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠার একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক হলেও, নতুন বাংলাদেশ গড়ার দীর্ঘ ও কঠিন কাজ এখনও শুরু হয়নি। রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা, অর্থনৈতিক সংস্কার, আন্তর্জাতিক সম্পর্ক ও নাগরিক অধিকার—এই সবই নতুন সরকারের দায়িত্বের অন্তর্ভুক্ত।