অন্যদিকে আলিসন বেকার কৌশলগত দিক থেকে বিশ্বের সবচেয়ে পরিপূর্ণ গোলরক্ষকদের একজন হিসেবে বিবেচিত। শট ঠেকানো, ক্রস নিয়ন্ত্রণ এবং রক্ষণভাগ থেকে খেলা গড়ে তোলায় তাঁর দক্ষতা প্রশংসিত। একের বিপরীতে এক পরিস্থিতিতেও তিনি অসাধারণ। তবে পেনাল্টি শুটআউটে এখনো নিজেকে সেভাবে প্রমাণ করতে পারেননি। সবকিছু বিবেচনায় নকআউট টুর্নামেন্টে বড় মঞ্চে সাফল্য ও মানসিক দৃঢ়তার কারণে মার্তিনেজকে সামান্য এগিয়ে রাখা যায়।
বিশ্বকাপ ফুটবলের মহারণ শুরু হতে আর মাত্র কয়েক ঘণ্টার অপেক্ষা। এরপরই যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা ও মেক্সিকোর মাটিতে পর্দা উঠবে বিশ্ব ফুটবলের সবচেয়ে বড় আসরের। শেষ মুহূর্তের প্রস্তুতিতে ব্যস্ত অংশ নেওয়া দলগুলো। পাশাপাশি সম্ভাব্য শিরোপাপ্রত্যাশীদের নিয়ে চলছে নানা বিশ্লেষণ। সেই আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে দক্ষিণ আমেরিকার দুই চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী আর্জেন্টিনা ও ব্রাজিল।
একদিকে বর্তমান বিশ্বচ্যাম্পিয়ন আর্জেন্টিনার ভারসাম্যপূর্ণ ও তারকাসমৃদ্ধ দল, অন্যদিকে শক্তিশালী ও সমানভাবে তারকাখচিত ব্রাজিল। গোলরক্ষক থেকে আক্রমণভাগ পর্যন্ত দুই দলের শক্তি ও দুর্বলতা নিয়ে চলছে তুলনামূলক আলোচনা।
গোলপোস্টের নিচে আর্জেন্টিনার এমিলিয়ানো মার্তিনেজ এবং ব্রাজিলের আলিসন বেকার বর্তমান সময়ের সেরা গোলরক্ষকদের অন্যতম। বড় ম্যাচে বিশেষ করে আর্জেন্টিনার জার্সিতে মার্তিনেজের দৃঢ়তা ও আত্মবিশ্বাস আলাদা করে নজর কাড়ে। পেনাল্টি শুটআউটে তাঁর দক্ষতা ইতোমধ্যে বিশ্বজুড়ে স্বীকৃত। ২০২২ বিশ্বকাপে নেদারল্যান্ডসের বিপক্ষে কোয়ার্টার ফাইনাল এবং ফ্রান্সের বিপক্ষে ফাইনালে একাধিক পেনাল্টি ঠেকিয়ে দলকে শিরোপা জয়ে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখেন তিনি। ফাইনালের শেষ মুহূর্তে রানদাল কোলো মুয়ানির শট রুখে দিয়েও দলকে নিশ্চিত বিপদ থেকে বাঁচান।
অন্যদিকে আলিসন বেকার কৌশলগত দিক থেকে বিশ্বের সবচেয়ে পরিপূর্ণ গোলরক্ষকদের একজন হিসেবে বিবেচিত। শট ঠেকানো, ক্রস নিয়ন্ত্রণ এবং রক্ষণভাগ থেকে খেলা গড়ে তোলায় তাঁর দক্ষতা প্রশংসিত। একের বিপরীতে এক পরিস্থিতিতেও তিনি অসাধারণ। তবে পেনাল্টি শুটআউটে এখনো নিজেকে সেভাবে প্রমাণ করতে পারেননি। সবকিছু বিবেচনায় নকআউট টুর্নামেন্টে বড় মঞ্চে সাফল্য ও মানসিক দৃঢ়তার কারণে মার্তিনেজকে সামান্য এগিয়ে রাখা যায়।
পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০২২ বিশ্বকাপের পর থেকে সবচেয়ে কম গোল হজম করা দল আর্জেন্টিনা। তবে ব্যক্তিগত সামর্থ্য ও বিকল্প খেলোয়াড়ের দিক থেকে ব্রাজিলের রক্ষণভাগকে অনেকেই বেশি শক্তিশালী মনে করেন। মারকিনিওস, ব্রেমার ও গ্যাব্রিয়েল মাগালায়েসের মতো নির্ভরযোগ্য সেন্টারব্যাকদের উপস্থিতি দলটিকে বাড়তি সুবিধা দিয়েছে। মারকিনিওস রক্ষণ সামলানোর পাশাপাশি বল এগিয়ে নেওয়ার কাজও করতে পারেন, আর ব্রেমার শারীরিক লড়াই ও বক্স রক্ষণে কার্যকর।
বিশ্বকাপে ব্রাজিলের বড় অস্ত্র হয়ে উঠতে পারেন গ্যাব্রিয়েল মাগালায়েস। গত মৌসুমে ক্লাব ফুটবলে তাঁর ধারাবাহিক পারফরম্যান্স ছিল প্রশংসনীয়। বিশেষ করে ইউরোপের শীর্ষ প্রতিযোগিতার ফাইনালে দীর্ঘ সময় ধরে রক্ষণ সামলানোর দক্ষতা তাঁর সামর্থ্যেরই প্রমাণ। তবে ফুলব্যাক পজিশনে ব্রাজিলের কিছুটা দুর্বলতা রয়েছে। চোটের কারণে ওয়েসলির ছিটকে যাওয়া দলটির জন্য বাড়তি দুশ্চিন্তা তৈরি করেছে। তবু দানিলো কিংবা অ্যালেক্স সান্দ্রো সেরা ছন্দে থাকলে রক্ষণভাগে দৃঢ়তা ধরে রাখা সম্ভব।
আর্জেন্টিনার রক্ষণভাগের মূল শক্তি অভিজ্ঞতা। ক্রিস্টিয়ান রোমেরো ও নিকোলাস ওতামেন্দি বড় মঞ্চে নিজেদের সামর্থ্যের প্রমাণ দিয়েছেন। ব্যক্তিগত নৈপুণ্যে ব্রাজিলের তুলনায় কিছুটা পিছিয়ে থাকলেও দলগত সমন্বয়ের কারণে আর্জেন্টিনার রক্ষণভাগ কার্যকর হয়ে ওঠে। তবে বিকল্প খেলোয়াড়ের ঘাটতি রয়েছে। ওতামেন্দি কিংবা চোট কাটিয়ে ফেরা রোমেরো প্রত্যাশিত পারফরম্যান্স দিতে না পারলে বিপাকে পড়তে হতে পারে কোচ লিওনেল স্কালোনিকে। যদিও সেরা ছন্দে থাকলে এই জুটিই আর্জেন্টিনার বড় ভরসা। লিসান্দ্রো মার্তিনেজও রক্ষণভাগে বৈচিত্র্য যোগ করবেন। ফুলব্যাকে নাহুয়েল মলিনা ও নিকোলাস তাগলিয়াফিকো স্কালোনির পরিকল্পনার সঙ্গে মানিয়ে ধারাবাহিকভাবে ভালো খেলছেন। তবু ব্যক্তিগত সামর্থ্যের বিচারে রক্ষণভাগে ব্রাজিলকে সামান্য এগিয়ে রাখা যায়।
দুই দলের সবচেয়ে বড় পার্থক্য চোখে পড়ে মাঝমাঠে। আর্জেন্টিনার মিডফিল্ড শৃঙ্খলাবদ্ধ, নিয়ন্ত্রিত ও সৃজনশীল; বিপরীতে ব্রাজিলের মাঝমাঠ বেশি নির্ভর করে অভিজ্ঞতা ও শারীরিক সক্ষমতার ওপর। এনজো ফার্নান্দেজ, অ্যালেক্সিস ম্যাক অ্যালিস্টার ও রদ্রিগো দি পলের সমন্বয়ে গড়া আর্জেন্টিনার মিডফিল্ড ত্রয়ী বর্তমানে বিশ্বের অন্যতম সেরা হিসেবে বিবেচিত।
গত বিশ্বকাপের সেরা তরুণ খেলোয়াড় এনজো এখন আরও পরিণত। পাস দেওয়া, খেলার গতি নিয়ন্ত্রণ এবং প্রতিপক্ষের চাপ সামলাতে তিনি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন। ম্যাক অ্যালিস্টার দলকে ভারসাম্য এনে দেন, পাশাপাশি রক্ষণ থেকে আক্রমণে রূপান্তরেও কার্যকর। অন্যদিকে দি পল মাঠে ইঞ্জিনের মতো কাজ করেন। সৃষ্টিশীলতার চেয়ে তাঁর মূল অবদান প্রতিপক্ষকে চাপে রাখা, রক্ষণকে সহায়তা করা এবং প্রতিপক্ষের মূল পরিকল্পনাকারীকে আটকে রাখা।
ব্রাজিলের মাঝমাঠে বড় নাম ব্রুনো গিমারেস। বল নিয়ন্ত্রণ, লম্বা পাস ও চাপের মধ্যে খেলার দক্ষতা তাঁকে আলাদা করেছে। তবে পুরো ম্যাচে একই ছন্দ বজায় রাখা এবং দলের সঙ্গে সমন্বয় তৈরি করা তাঁর জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হতে পারে। কাসেমিরো অভিজ্ঞ হলেও বয়সের প্রভাব তাঁর খেলায় স্পষ্ট। লুকাস পাকেতা আক্রমণভাগে সৃজনশীলতা যোগ করলেও পুরো টুর্নামেন্টে ধারাবাহিকতা ধরে রাখতে পারবেন কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন থেকেই যায়। পাশাপাশি এই তিন মিডফিল্ডারের বোঝাপড়ার ওপরও ব্রাজিলের সাফল্যের অনেকটা নির্ভর করবে।
ব্রাজিল ও আর্জেন্টিনার লড়াই মানেই আক্রমণভাগের ঝলক। আর্জেন্টিনার আক্রমণভাগ পরিকল্পিত ও কার্যকর হলেও ব্রাজিলের আক্রমণভাগ বেশি বৈচিত্র্যময় এবং ব্যক্তিগত প্রতিভায় সমৃদ্ধ। বেঞ্চের শক্তি এবং আর্জেন্টিনার অতিরিক্ত লিওনেল মেসিনির্ভরতার কারণে আক্রমণে ব্রাজিলকে সামান্য এগিয়ে রাখা হচ্ছে।
ভিনিসিয়ুস জুনিয়র, রাফিনিয়া, নেইমার, এনদ্রিক, গ্যাব্রিয়েল মার্তিনেল্লি ও মাতেউস কুনিয়ার উপস্থিতি ব্রাজিলের আক্রমণভাগকে করেছে সমৃদ্ধ। ভিনিসিয়ুস গতি, ড্রিবলিং এবং একক প্রচেষ্টায় প্রতিপক্ষের রক্ষণ ভাঙার সামর্থ্যের জন্য পরিচিত। রাফিনিয়া কৌশলগতভাবে পরিপক্ব, পাশাপাশি আক্রমণ ও রক্ষণ—দুই দায়িত্বই পালন করতে সক্ষম। পূর্ণ ফিট নেইমার থাকলে তিনি উইং, মাঝমাঠ ও আক্রমণের শেষ ভাগে খেলার গতি নিয়ন্ত্রণে বড় ভূমিকা রাখতে পারেন। বেঞ্চে থাকা এনদ্রিক ও মার্তিনেল্লিও ম্যাচের চিত্র বদলে দেওয়ার সামর্থ্য রাখেন। আর মাতেউস কুনিয়া দ্বিতীয় স্ট্রাইকার হিসেবে আক্রমণে নতুন মাত্রা যোগ করতে পারেন।
অন্যদিকে আর্জেন্টিনার আক্রমণভাগে বিকল্পের সংখ্যা তুলনামূলক কম হলেও দলটি অত্যন্ত সুশৃঙ্খল ও কার্যকর। লিওনেল মেসিই এই আক্রমণভাগের কেন্দ্রবিন্দু, যিনি একই সঙ্গে গোলদাতা ও সুযোগ সৃষ্টিকারী। তবে সব ম্যাচে তাঁকে পুরো সময় খেলানোর বিষয়টি ঝুঁকিও তৈরি করতে পারে। হুলিয়ান আলভারেজ চাপের মধ্যে কার্যকর ফুটবল খেলতে পারেন এবং প্রয়োজন হলে মাঝমাঠে নেমেও আক্রমণ সাজাতে সক্ষম। লাওতারো মার্তিনেজ বক্সের ভেতরে সুযোগ কাজে লাগানোর দক্ষতায় আলাদা। নিকো পাজ ও থিয়াগো আলমাদা বিকল্প হিসেবে প্রস্তুত থাকলেও অতিরিক্ত মেসিনির্ভরতা আর্জেন্টিনার জন্য একটি বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে থাকবে। সবকিছু বিবেচনায় আক্রমণভাগে গভীরতা ও বিকল্পের প্রাচুর্যের কারণে ব্রাজিল সামান্য বাড়তি সুবিধা নিয়ে বিশ্বকাপের লড়াইয়ে নামছে। সূত্র: প্রথম আলো