বাংলাদেশ পুলিশের মহাপরিদর্শক (আইজিপি) বাহারুল আলম বলেছেন, দেশের ইতিহাসে এবারই প্রথম পুলিশকে নির্বাচনের জন্য বিশেষ প্রশিক্ষণ দেওয়া হচ্ছে। শুক্রবার পর্যন্ত দেড় লাখ পুলিশ সদস্যের মধ্যে ১ লাখ ৩৩ হাজার জনকে এ প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়েছে। আগামী ২০ জানুয়ারির মধ্যে বাকি সদস্যদের প্রশিক্ষণ সম্পন্ন হবে। তিনি জানান, স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয় সব ভোটকেন্দ্রে সিসিটিভি স্থাপন করবে। পাশাপাশি ঝুঁকিপূর্ণ ৮ হাজার এবং মধ্যম ঝুঁকিতে থাকা ১৬ হাজার ভোটকেন্দ্রে দায়িত্বপ্রাপ্ত পুলিশ সদস্যদের বডি ক্যামেরা দেওয়া হবে।
শনিবার (১০ জানুয়ারি) দুপুরে রংপুর পুলিশ লাইন্স স্কুল অ্যান্ড কলেজ অডিটোরিয়ামে রংপুর বিভাগে কর্মরত পুলিশের বিভিন্ন ইউনিটের অফিসার ও ফোর্সের সঙ্গে বিশেষ কল্যাণ সভা শেষে সাংবাদিকদের তিনি এসব কথা বলেন।
আইজিপি বলেন, আইনশৃঙ্খলা সভায় তিনি উপদেষ্টাদের স্পষ্টভাবে জানিয়েছেন যে, নির্বিঘ্নে আইন প্রয়োগের জন্য তাকে পূর্ণ সমর্থন ও গ্রিন সিগন্যাল দিতে হবে। তিনি নিরপেক্ষভাবে আইন প্রয়োগ করতে চান উল্লেখ করে বলেন, কোনো দল বা বড় রাজনৈতিক নেতাদের গ্রেপ্তার নিয়ে চাপ বা ভয় থাকলে পুলিশ সদস্যরা সঠিকভাবে দায়িত্ব পালন করতে পারবে না। পুলিশ যদি অন্যায় করে, সে ক্ষেত্রে জবাবদিহি অবশ্যই হবে। তবে আইনগত দায়িত্ব পালন করতে গেলে অনেক সময় মানুষ ভুলভাবে ব্যাখ্যা করে। নির্বিঘ্নে আইন প্রয়োগ করাই পুলিশের জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ এবং সমাজের পূর্ণ সমর্থন ছাড়া সুষ্ঠু নির্বাচন পরিচালনা সম্ভব নয় বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
তিনি বলেন, নির্বাচনের সময় আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্থিতিশীল রাখা পুলিশের দায়িত্ব। এ কাজে পুলিশের সঙ্গে ছয় লাখ আনসার সদস্য দায়িত্ব পালন করবেন। পাশাপাশি নির্বাচনপূর্ব সময়ে সেনাবাহিনী, নৌবাহিনী ও বিমান বাহিনী সহযোগিতা করবে। বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ ও কোস্ট গার্ডও অপরাধ নিয়ন্ত্রণে কাজ করছে। তিনি স্বীকার করেন, গত ১৫ বছরে পুলিশ দলীয় প্রভাবে নানা বিচ্যুতির মধ্য দিয়ে গেছে এবং কিছু গণবিরোধী কর্মকাণ্ড হয়েছে। জুলাই-আগস্টে বিপুলসংখ্যক আন্দোলনকারী নিহত হওয়ার ঘটনায় পুলিশের ওপর দায়ভার এসেছে। এসব অবস্থা থেকে বেরিয়ে পুলিশকে পুনরায় স্বমহিমায় দাঁড় করানো, মনোবল বাড়ানো এবং পেশাদারিত্বে ফিরিয়ে আনতে গত এক বছর ধরে চেষ্টা চলছে।
আইজিপি বলেন, অপরাধ শতভাগ নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব নয়। প্রতি বছর গড়ে সাড়ে তিন হাজার থেকে চার হাজার হত্যাকাণ্ড ঘটে। তবু চেষ্টা থাকবে যেন একজন মানুষও প্রাণ না হারায়। শরীফ ওসমান হাদী হত্যাকাণ্ড পুরো জাতিকে নাড়া দিয়েছে এবং এর সুষ্ঠু তদন্ত ও বিচার নিশ্চিত করার দায় পুলিশের ওপর এসেছে। খুলনা অঞ্চলে সাম্প্রতিক সময়ে কিছু হত্যাকাণ্ডের ঘটনা ঘটলেও অধিকাংশ ক্ষেত্রে সুষ্ঠু তদন্ত করা সম্ভব হয়েছে বলে তিনি জানান।
তিনি আরও বলেন, দেশে সব সম্প্রদায়ের মানুষ শান্তি ও সম্প্রীতির সঙ্গে বসবাস করছে। তবে সুযোগসন্ধানীরা বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করলে পুলিশ আইনের আওতায় আনার চেষ্টা করে। জুলাই-আগস্টের পর সংখ্যালঘুদের ওপর হামলা, মাজারে আক্রমণ ও অগ্নিসংযোগের ঘটনায় মামলা করে দোষীদের বিরুদ্ধে চার্জশিট দেওয়া হয়েছে। তবে বিচার ব্যবস্থার দীর্ঘসূত্রিতার কারণে রংপুর বিভাগে ২০১৫ থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত হত্যাকাণ্ডের মামলার মাত্র এক-তৃতীয়াংশের বিচার সম্পন্ন হয়েছে। মামলা জটের ফলে বিচার বিলম্বিত হওয়ায় অপরাধীরা উৎসাহিত হচ্ছে, যা ব্যবস্থাগত দুর্বলতা। এ ক্ষেত্রে বিশেষ আইন প্রণয়নসহ সরকারের মনোযোগ প্রয়োজন বলে তিনি মত দেন এবং ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক সরকার বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে দেখবে বলে প্রত্যাশা প্রকাশ করেন।
সভায় রংপুর রেঞ্জের ডিআইজি আমিনুল ইসলাম, মেট্রোপলিটন পুলিশ কমিশনার মজিদ আলী, জেলা পুলিশ সুপার মারুফাত হুসাইনসহ ঊর্ধ্বতন পুলিশ কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।