ব্রাহ্মণবাড়িয়ার নবীনগর উপজেলার চরলাপাং এলাকায় মেঘনা নদী যেন পরিণত হয়েছে অবৈধ বালু উত্তোলনের স্থায়ী ঘাঁটিতে। সরকারি অনুমোদন ও পরিবেশ আইন উপেক্ষা করে দিনের পর দিন ড্রেজার বসিয়ে বালু উত্তোলনের সেই দৃশ্য বৃহস্পতিবার জেলা প্রশাসনের পরিচালিত ভ্রাম্যমাণ আদালতের অভিযানে সাময়িকভাবে থামলেও একদিন না যেতেই আবারও আগের চেহারায় ফিরেছে নদী এলাকা। শুক্রবার সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত অসংখ্য ড্রেজার ও বাল্কহেড বসিয়ে প্রকাশ্যে বালু উত্তোলন চলতে দেখা গেছে, যা প্রশাসনিক অভিযানের কার্যকারিতা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন তুলেছে।
বৃহস্পতিবার (৮ জানুয়ারি) বিকেল থেকে রাত পর্যন্ত প্রায় ছয় ঘণ্টাব্যাপী অভিযানে চরলাপাং এলাকায় মেঘনা নদী থেকে অবৈধ বালু উত্তোলনের দায়ে ২টি ড্রেজার ও ২টি বাল্কহেড জব্দ করা হয়। এ সময় ড্রেজার ও বাল্কহেডের চালকসহ মোট ৫ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়। তবে বহুল আলোচিত বালু মহালের সঙ্গে জড়িত মূল নিয়ন্ত্রক ও অর্থের যোগানদাতারা আগেভাগেই সরে যাওয়ায় অভিযানে তারা ধরা পড়েনি।
গ্রেপ্তারকৃতরা হলেন— পটুয়াখালির বাসিন্দা ড্রেজার চালক মো. শহীদুল ইসলাম (৫০), ব্রাহ্মণবাড়িয়ার বাসিন্দা ইনফরম্যান্ট মো. আকবর খান (২৩), পটুয়াখালির বাল্কহেড চালক মো. মিজান মিয়া (২৬), পিরোজপুরের বালু শ্রমিক শরীফ মিয়া (২৮) এবং ভোলার বালু শ্রমিক জামাল মিয়া (২৬)। ভ্রাম্যমাণ আদালতে তাৎক্ষণিক বিচার শেষে তাঁদের প্রত্যেককে বিভিন্ন মেয়াদে বিনাশ্রম কারাদণ্ড প্রদান করা হয়। এর মধ্যে সর্বনিম্ন এক মাস এবং সর্বোচ্চ ছয় মাসের কারাদণ্ড দেওয়া হয়।
জেলা ও উপজেলা প্রশাসন সূত্রে জানা গেছে, দীর্ঘদিন ধরে একটি সংঘবদ্ধ ও প্রভাবশালী চক্র চরলাপাং এলাকার মেঘনা নদীতে ইজারার শর্ত ভেঙে অতিরিক্ত ও নিষিদ্ধ খননযন্ত্র বসিয়ে দিন-রাত সমানতালে বালু উত্তোলন করে আসছিল। এই লাগামহীন খননের ফলে নদীর গতিপথ বদলে গিয়ে তীরবর্তী গ্রামগুলোতে ভয়াবহ ভাঙন দেখা দিয়েছে। বসতভিটা ও ফসলি জমি নদীগর্ভে বিলীন হওয়ার ঝুঁকিতে পড়েছে বলে অভিযোগ স্থানীয়দের।
অভিযানের পরদিন শুক্রবার সকালে আবারও নতুন ড্রেজার এনে নদীতে নামানো হয় বলে স্থানীয়রা জানান। তাঁদের অভিযোগ, অভিযানে যেসব ড্রেজার জব্দ হয়নি, সেগুলোর মালিকরাই পুনরায় কার্যক্রম শুরু করেছে। প্রশাসনের উপস্থিতি শেষ হলেই অবৈধ বালু উত্তোলন আগের মতোই পুরোদমে চালু হয়ে যায়।
জেলা প্রশাসনের নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট প্রিন্স সরকার ও এম. কায়সারের নেতৃত্বে পরিচালিত বৃহস্পতিবারের মোবাইল কোর্টে সেনাবাহিনী, জেলা পুলিশ ও নৌপুলিশ যৌথভাবে দায়িত্ব পালন করে। অভিযানের সময় নদী এলাকায় ব্যাপক তৎপরতা দেখা গেলেও প্রকৃত হোতারা বরাবরের মতোই ধরাছোঁয়ার বাইরে থেকে যায়।
স্থানীয় বাসিন্দারা ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, একদিনের অভিযানে শ্রমিকদের গ্রেপ্তার করা হলেও অবৈধ বালু উত্তোলনের মূল কারিগররা থেকে যায় নিরাপদে। তাঁদের মতে, স্থায়ী নজরদারি ও মালিক পক্ষের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা না নিলে মেঘনা নদী ও আশপাশের জনপদ রক্ষা করা সম্ভব নয়।
এ বিষয়ে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার জেলা প্রশাসক শারমিন আক্তার জাহান বলেন, অবৈধ বালু উত্তোলনের বিরুদ্ধে প্রশাসনের অবস্থান কঠোর। এ ধরনের অভিযান চলমান থাকবে এবং নির্বাচন-পরবর্তী সময়ে বালু মহালের সঙ্গে জড়িতদের বিরুদ্ধে আরও কঠোর আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।