আদ্-দ্বীন ফাউন্ডেশনের পরিচালক (কোম্পানি অ্যাফেয়ার্স) তারিকুল ইসলাম মুকুল জানান, স্বাস্থ্য অধিদপ্তর ও স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় যে ত্রুটিগুলোর কথা উল্লেখ করেছিল, সেগুলো সংশোধন করে সচিবের কাছে আবেদন জমা দেওয়া হয়েছে। এখন সরকারের সিদ্ধান্তের অপেক্ষায় রয়েছে কর্তৃপক্ষ।
রোববার জাতীয় সংসদে স্বাস্থ্যমন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন বলেন, চিকিৎসকদের গাফিলতি, কেন্দ্রীয় শীতাতপ নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা বন্ধ থাকা এবং পর্যাপ্ত অক্সিজেনের অভাবের কারণেই একই দিনে ছয় নবজাতকের মৃত্যু ঘটে। তিনি জানান, হাইপারক্যাপনিয়ায় আক্রান্ত শিশুদের সংকটময় মুহূর্তেও প্রয়োজনীয় চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করা সম্ভব হয়নি। এমনকি দায়িত্বরত চিকিৎসক ও নার্সদের উপস্থিতিও ছিল না।
স্বাস্থ্যমন্ত্রী আরও বলেন, আদ্-দ্বীন মেডিকেল কলেজের ভবিষ্যৎ নির্ভর করবে হাসপাতালসংক্রান্ত সিদ্ধান্তের ওপর। তবে শিক্ষার্থীদের বিষয়টি সরকারের বিবেচনায় রয়েছে এবং তাদের আতঙ্কিত হওয়ার কারণ নেই।
স্বাস্থ্য শিক্ষা অধিদপ্তরের মহাপরিচালক অধ্যাপক ডা. নাজমুল হোসেন বলেন, লাইসেন্সের শর্ত লঙ্ঘন ও গুরুতর অব্যবস্থাপনার কারণে হাসপাতালটির লাইসেন্স বাতিল করা হয়েছে। একই সঙ্গে পরিচালনা পর্ষদ ভেঙে দিয়ে সরকারি তত্ত্বাবধানে নতুন প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা নিয়োগ দেওয়া হয়েছে।
লাইসেন্স বাতিল নাকি স্থগিত—এ বিষয়ে বিভ্রান্তির প্রসঙ্গে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক অধ্যাপক ডা. প্রভাত চন্দ্র বিশ্বাস বলেন, এটি মূলত শব্দ ব্যবহারের পার্থক্য। কার্যত হাসপাতালের লাইসেন্স বাতিল করা হয়েছে। তবে কর্তৃপক্ষ আপিল করেছে এবং সরকার প্রক্রিয়া অনুযায়ী পরবর্তী সিদ্ধান্ত নেবে।
হাসপাতাল বন্ধ থাকলেও মেডিকেল কলেজের একাডেমিক কার্যক্রম চালু রয়েছে। তবে ক্লিনিক্যাল প্রশিক্ষণ ও ইন্টার্নশিপ নিয়ে সবচেয়ে বেশি উদ্বেগে রয়েছেন ভারত ও মালদ্বীপের ২৯৫ জন বিদেশি শিক্ষার্থী। তাদের আশঙ্কা, নিজ দেশের মেডিকেল কাউন্সিলের নিয়ম অনুযায়ী নিজ প্রতিষ্ঠানের হাসপাতাল ছাড়া অন্য কোথাও ইন্টার্নশিপ করলে তা স্বীকৃতি নাও পেতে পারে। এ কারণে তারা স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় ও সংশ্লিষ্ট দপ্তরে স্মারকলিপিও দিয়েছেন।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, হাসপাতালের পরিচালনা পর্ষদে ইতোমধ্যে পরিবর্তন আনা হয়েছে। ভবনের কাঠামোগত সংস্কার, হাসপাতাল চত্বরে বেকারি অপসারণসহ কয়েকটি শর্ত পূরণের ভিত্তিতে লাইসেন্স পুনর্বহালের বিষয়টি সরকার বিবেচনা করছে। কর্তৃপক্ষও এসব শর্ত মানতে সম্মত হয়েছে। জনস্বার্থের কথা বিবেচনা করে হাসপাতালটি পুনরায় চালুর দিকেই সরকার এগোচ্ছে বলে মন্ত্রণালয়ের একাধিক কর্মকর্তা জানিয়েছেন।
লাইসেন্স বাতিলের ফলে স্বল্পমূল্যে চিকিৎসাসেবা পাওয়া সাধারণ মানুষও ভোগান্তিতে পড়েছেন। এ অবস্থায় হাসপাতালটি পুনরায় চালুর দাবিতে জাতীয় প্রেস ক্লাবের সামনে মানববন্ধন করেন বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ। বক্তারা নবজাতক মৃত্যুর ঘটনার নিরপেক্ষ তদন্ত, দায়ীদের শাস্তি এবং শিক্ষার্থী ও রোগীদের স্বার্থ রক্ষার দাবি জানান।
গণস্বাস্থ্য কেন্দ্রের চেয়ারম্যান শিরীন পারভিন বলেন, দীর্ঘদিন ধরে স্বল্প আয়ের মানুষের চিকিৎসার ভরসাস্থল ছিল আদ্-দ্বীন হাসপাতাল। একটি দুর্ঘটনার পর পুরো প্রতিষ্ঠান বন্ধ করে দেওয়ার সিদ্ধান্তে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন সাধারণ রোগীরা। তিনি দ্রুত হাসপাতালের স্বাভাবিক কার্যক্রম চালুর আহ্বান জানান।
একই ধরনের মত দিয়েছে বেসরকারি হাসপাতাল মালিকদের সংগঠন বিপিএইচসিডিএ। সংগঠনটির সভাপতি ডা. মো. মোসাদ্দেক হোসেন বিশ্বাস ডাম্বেল এবং মহাসচিব ডা. এ এম শামীম এক যৌথ বিবৃতিতে বলেন, ঘটনার সঙ্গে জড়িতদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা ও ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারকে ক্ষতিপূরণ দেওয়া প্রয়োজন। তবে একটি ঘটনার কারণে দীর্ঘদিনের সেবাদানকারী একটি হাসপাতালের লাইসেন্স বাতিল করে দেওয়া সমস্যার স্থায়ী সমাধান নয়। এতে সবচেয়ে বেশি ক্ষতির মুখে পড়বে মধ্যবিত্ত ও নিম্নআয়ের মানুষ।
এদিকে জামায়াত সমর্থিত চিকিৎসকদের সংগঠন এনডিএফ এবং এনসিপির চিকিৎসক সংগঠন এনএইচএ পৃথক বিবৃতিতে হাসপাতাল বন্ধের সিদ্ধান্ত পুনর্বিবেচনার আহ্বান জানিয়েছে। তবে এ বিষয়ে আদ্-দ্বীন হাসপাতাল ও নিহত নবজাতকদের পরিবারের আইনজীবী অ্যাডভোকেট শিশির মনির কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি।