গুমের ঘটনায় প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে জড়িত ব্যক্তিদের পাশাপাশি এর নেপথ্যের পরিকল্পনাকারীদেরও বিচারের মুখোমুখি করে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করার দাবি জানিয়েছেন জামায়াতে ইসলামীর আমির ও জাতীয় সংসদের বিরোধীদলীয় নেতা ডা. শফিকুর রহমান।
আন্তর্জাতিক গুম দিবস উপলক্ষে শনিবার (২৯ আগস্ট) দেওয়া এক বিবৃতিতে তিনি এ দাবি জানান।
বিবৃতিতে ডা. শফিকুর রহমান বলেন, বছরের পর বছর ধরে নিখোঁজ থাকা মানুষগুলোর পরিবার অনিশ্চয়তা ও মানসিক যন্ত্রণা নিয়ে দিন কাটাচ্ছে। প্রিয়জনের কোনো সন্ধান না পাওয়ার কষ্ট ভুক্তভোগী পরিবারের সদস্যরাই সবচেয়ে ভালো বোঝেন। তাই গুমের শিকার ব্যক্তিদের স্মরণ করার পাশাপাশি তাদের পরিবারের প্রতি সমবেদনা জানান তিনি।
বাংলাদেশে গুমের ঘটনাকে মানবাধিকার লঙ্ঘনের গুরুতর উদাহরণ হিসেবে উল্লেখ করেন জামায়াত আমির। তার দাবি, শেখ হাসিনার শাসনামলে বিরোধী রাজনৈতিক দলের নেতাকর্মীসহ বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার সাত শতাধিক মানুষ গুমের শিকার হয়েছেন। বিরোধী মত দমনে ‘আয়নাঘর’-এর মতো গোপন বন্দিশালা ব্যবহারের অভিযোগও করেন তিনি।
ডা. শফিকুর রহমান বলেন, স্বাধীন একটি রাষ্ট্রে নাগরিকদের গুম করে গোপন স্থানে আটকে রাখা মৌলিক মানবাধিকারের চরম লঙ্ঘন। একই সঙ্গে এটি আন্তর্জাতিক আইনেরও পরিপন্থি।
দীর্ঘদিন নিখোঁজ থাকার পর কয়েকজনের ফিরে আসার প্রসঙ্গ তুলে ধরে তিনি বলেন, সাবেক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল আব্দুল্লাহিল আমান আযমী ও সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী ব্যারিস্টার আরমান আহমদ বিন কাসেম দীর্ঘ সময় বন্দিদশায় থাকার পর ফিরে এসেছেন। তবে জামায়াত নেতা হাফেজ জাকির হোসাইন, ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী আল মোকাদ্দাস ও মোহাম্মদ ওলিউল্লাহ, বিএনপি নেতা ইলিয়াস আলী এবং সাবেক কমিশনার চৌধুরী আলমসহ অনেকে এখনও নিখোঁজ। তাদের পরিণতি সম্পর্কে পরিবার ও স্বজনরা এখনো নিশ্চিত নন বলেও উল্লেখ করেন তিনি।
গুম প্রতিরোধে প্রণীত আইন নিয়েও সরকারের সমালোচনা করেন জামায়াত আমির। তিনি বলেন, গুম প্রতিরোধ ও প্রতিকার অধ্যাদেশ, ২০২৫-কে আইনে পরিণত না করে সরকার নতুন আইনের উদ্যোগ নিয়েছে। তবে প্রস্তাবিত খসড়ায় গুমের সংজ্ঞা ও বিভিন্ন বিধানে পরিবর্তন আনা হয়েছে, যা মূল উদ্দেশ্যকে দুর্বল করতে পারে।
বিশেষ করে গুমের মতো অপরাধের তদন্তের দায়িত্ব পুলিশের ওপর দেওয়ার বিষয়ে আপত্তি জানান তিনি। তার মতে, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর বিরুদ্ধে অভিযোগের তদন্ত একই বাহিনীর হাতে থাকলে তদন্তের নিরপেক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন উঠতে পারে। গুমের মতো বিশেষ ধরনের অপরাধ তদন্তে আলাদা ও স্বাধীন ব্যবস্থা থাকা প্রয়োজন।
গুমের তথ্য সংরক্ষণ ও ব্যবস্থাপনার দায়িত্ব সরকারের অধীনে রাখার বিষয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করেন ডা. শফিকুর রহমান। তার দাবি, অতীতে গুমের ঘটনায় রাষ্ট্রীয় কাঠামোর সম্পৃক্ততার অভিযোগ থাকায় সরকারের নিয়ন্ত্রণে তথ্যভাণ্ডার পরিচালিত হলে এর নিরপেক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন থেকে যেতে পারে।
জাতীয় মানবাধিকার কমিশনকে গুমের তদন্ত ও অনুসন্ধান প্রক্রিয়া থেকে বাদ দেওয়ারও সমালোচনা করেন তিনি। তার মতে, গুমের মতো সংবেদনশীল মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনায় একটি স্বাধীন ও নিরপেক্ষ প্রতিষ্ঠানের কার্যকর ভূমিকা থাকা জরুরি।
বিবৃতিতে জামায়াত আমির নিখোঁজ ও গুম হওয়া সব নাগরিককে দ্রুত খুঁজে বের করে পরিবারের কাছে ফিরিয়ে দেওয়ার আহ্বান জানান। একই সঙ্গে গুমের সঙ্গে জড়িত ব্যক্তি ও নেপথ্যের মূল পরিকল্পনাকারীদের শনাক্ত করে বিচারের আওতায় এনে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করতে সরকারের প্রতি দাবি জানান তিনি।
এ ছাড়া গুমকে একটি বিশেষ অপরাধ হিসেবে স্বীকৃতি দিয়ে এর তদন্ত, অনুসন্ধান ও বিচার কার্যক্রমের জন্য স্বাধীন ও কার্যকর আইনি কাঠামো গড়ে তোলার আহ্বান জানান ডা. শফিকুর রহমান।
সদ্য সংবাদ/এসকে