রাজধানী থেকে গ্রাম জীবনযাত্রার ব্যয় বেড়ে চাপে পড়েছেন নিম্ন ও মধ্যবিত্ত শ্রেণির মানুষ। নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দামের ঊর্ধ্বগতি, বাসাভাড়া, গ্যাস-বিদ্যুতের খরচ ও পরিবহন ব্যয় মেটাতে গিয়ে মাস শেষে আয়-ব্যয়ের হিসাব মেলাতে পারছেন না অনেকেই। আয়ের তুলনায় ব্যয় বাড়ায় প্রয়োজনের তালিকা ছোট করার পাশাপাশি অনেক পরিবারকে কাটছাঁট করতে হচ্ছে খাবারের তালিকাও।
একসময় দুই বেলা ভাতের সঙ্গে মাছ, মাংস কিংবা সবজি রাখা মধ্যবিত্ত পরিবারের স্বাভাবিক খাদ্যাভ্যাসের অংশ ছিল। এখন অনেক পরিবারের কাছে নিয়মিত মাছ-মাংস কেনাটাও হয়ে উঠেছে বাড়তি খরচের বিষয়। বিশেষ দিনগুলোতে পরিবারের সদস্যদের একটু ভালো খাবার খাওয়ানোর ইচ্ছা থাকলেও বাজারদর সেই সামর্থ্যে বাধা হয়ে দাঁড়াচ্ছে।
রাজধানীর কারওয়ান বাজারে বাজার করতে আসা এক মধ্যবিত্ত ক্রেতার সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, কয়েক বছর আগের আয়ে যে পরিমাণ বাজার করা সম্ভব হতো, এখন একই আয়ে তার অর্ধেক পণ্য কিনতেও হিমশিম খেতে হচ্ছে।
তিনি বলেন, আগের আয় দিয়ে যেভাবে পরিবার চালাতেন, এখন একই আয় দিয়ে তা সম্ভব হচ্ছে না। শুধু শাকসবজি নয়, মাছ, মাংসসহ প্রায় সব ধরনের প্রয়োজনীয় পণ্যের দাম বেড়েছে। বিশেষ দিনগুলোতে সন্তানদের জন্য একটু ভালো খাবারের ব্যবস্থা করতে ইচ্ছা থাকলেও সামর্থ্য হয় না। ফলে গরু বা ব্রয়লার মুরগির পরিবর্তে মুরগির গিলা-কলিজার মতো তুলনামূলক কম দামের পণ্য কিনেই পরিবারের চাহিদা মেটাতে হচ্ছে।
আরেক ক্রেতার অভিজ্ঞতাও প্রায় একই। একসময় তুলনামূলক স্বচ্ছন্দে সংসার চালালেও এখন তাকে নিজের দৈনন্দিন অভ্যাসে পরিবর্তন আনতে হচ্ছে। বাজারে গিয়ে পছন্দের মাছের সামনে দাঁড়িয়েও দাম শুনে ফিরে আসছেন তিনি।
তার ভাষ্য, কয়েক হাজার টাকা দামের ইলিশ এখন তার নাগালের বাইরে। মাছ খাওয়ার ইচ্ছা মেটাতে তাই তুলনামূলক সস্তা পাঙ্গাস কিংবা অন্য মাছের দিকে ঝুঁকতে হচ্ছে। অথচ যেসব মাছকে একসময় নিম্ন ও মধ্যবিত্তের নাগালের মধ্যে মনে করা হতো, সেগুলোর দামও এখন আগের তুলনায় অনেক বেশি।
শুধু বাজার খরচই নয়, বাসাবাড়ির অন্যান্য ব্যয়ও বাড়ছে। গ্যাস, বিদ্যুৎ, পানি, বাসাভাড়া ও যাতায়াতের খরচ মিলিয়ে মাসিক ব্যয়ের বড় একটি অংশ চলে যাচ্ছে মৌলিক প্রয়োজন মেটাতেই।
মো. মিন্টু নামে এক ক্রেতা বলেন, দিনের বড় একটি সময় বাসায় গ্যাসের সংকট থাকে। রাতে বিদ্যুৎও আসা-যাওয়া করে। এর মধ্যে নিত্যপণ্যের দাম বাড়ায় সংসারের খরচ চালানো কঠিন হয়ে পড়েছে। পরিবারের চাহিদা পূরণ করতে গিয়ে প্রতিনিয়ত হিসাব কষতে হচ্ছে। বাজারে যে পণ্যটি তুলনামূলক কম দামে পাওয়া যায়, সেটিই কিনে নিতে হচ্ছে।
দ্রব্যমূল্যের চাপে সবচেয়ে বেশি পরিবর্তন এসেছে নিম্ন ও মধ্য আয়ের মানুষের কেনাকাটার ধরনে। আগে প্রয়োজন অনুযায়ী বাজার করা হলেও এখন অনেকেই পণ্যের দাম দেখে তালিকা তৈরি করছেন। কোনো পণ্যের দাম বেশি হলে সেটি বাদ দিয়ে বিকল্প কম দামের পণ্য কিনছেন।
মাছ-মাংসের পরিমাণ কমানোর পাশাপাশি অনেক পরিবার কমিয়ে দিয়েছে ফল, দুধ ও অন্যান্য পুষ্টিকর খাবারের ব্যবহারও। বিশেষ প্রয়োজন ছাড়া নতুন পোশাক, ঘরের আসবাব, বিনোদন কিংবা বাইরে খাওয়ার মতো খরচও অনেকেই বাদ দিচ্ছেন।
অর্থাৎ জীবনযাত্রার মৌলিক চাহিদা মেটানোর পর যে অর্থটুকু সঞ্চয় বা স্বস্তির জন্য থাকার কথা, সেটিও এখন চলে যাচ্ছে দৈনন্দিন ব্যয় মেটাতে।
রাজধানীতে জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধির আরেকটি বড় কারণ বাসাভাড়া। বিভিন্ন এলাকায় গত এক বছরে ছোট ও মাঝারি আকারের বাসার ভাড়া বেড়েছে বলে জানিয়েছেন ভাড়াটিয়ারা। এলাকাভেদে ছোট বাসার ভাড়া মাসে প্রায় ৭৫০ থেকে ১ হাজার ৫০০ টাকা পর্যন্ত বেড়েছে। বড় বাসার ক্ষেত্রে বৃদ্ধির পরিমাণ আরও বেশি।
বাড়তি ভাড়া মেটাতে অনেক পরিবারকে বাসা পরিবর্তনের কথা ভাবতে হচ্ছে। কেউ কেউ অপেক্ষাকৃত দূরের এলাকায় চলে যাচ্ছেন, যাতে কম ভাড়ায় বাসা পাওয়া যায়। তবে দূরে বাসা নেওয়ার ফলে আবার বেড়ে যাচ্ছে যাতায়াতের খরচ ও সময়।
বাসাভাড়ার পাশাপাশি কর্মজীবী মানুষের ব্যয়ের বড় অংশ চলে যাচ্ছে যাতায়াতে। জ্বালানি, রক্ষণাবেক্ষণ ও অন্যান্য ব্যয় বৃদ্ধির প্রভাবে পরিবহন খরচ বেড়েছে বলে অভিযোগ যাত্রীদের।
প্রতিদিন কর্মস্থলে যাতায়াত করা নিম্ন ও মধ্য আয়ের মানুষের জন্য এই বাড়তি ব্যয় মাস শেষে বড় অঙ্কে দাঁড়াচ্ছে। ফলে বেতন বাড়লেও প্রকৃত অর্থে হাতে থাকা অর্থ দিয়ে আগের মতো জীবনযাপন করা কঠিন হয়ে পড়ছে।
অর্থনীতিবিদদের মতে, জীবনযাত্রার ব্যয় নির্ধারণে শুধু বাজারদর নয়, আয় বৃদ্ধির হারও গুরুত্বপূর্ণ। মানুষের আয় যদি দ্রব্যমূল্য ও অন্যান্য ব্যয়ের তুলনায় কম হারে বাড়ে, তাহলে প্রকৃত ক্রয়ক্ষমতা কমে যায়।
বিশেষ করে বেসরকারি খাতে কর্মরত নিম্ন ও মধ্য আয়ের মানুষের ক্ষেত্রে এই চাপ বেশি অনুভূত হচ্ছে। বেতন বাড়লেও বাজারদর, বাসাভাড়া, পরিবহন, গ্যাস-বিদ্যুৎ ও অন্যান্য সেবার খরচ একই সময়ে বেড়ে গেলে সেই বাড়তি আয় দিয়ে অতিরিক্ত ব্যয় সামাল দেওয়া সম্ভব হয় না।
ফলে অনেক পরিবার সঞ্চয় ভেঙে সংসার চালাচ্ছে। কেউ ধারদেনা করছেন, আবার কেউ প্রয়োজনীয় খরচ পিছিয়ে দিচ্ছেন। সন্তানদের শিক্ষা, চিকিৎসা, বিনোদন কিংবা ভবিষ্যতের জন্য সঞ্চয়ের মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়েও কাটছাঁট করতে হচ্ছে অনেক পরিবারকে।
নিত্যপণ্যের দাম বৃদ্ধির প্রভাব পড়ছে পারিবারিক আনন্দ-উৎসবেও। ঈদ, জন্মদিন কিংবা অন্য কোনো বিশেষ দিনে পরিবারের সদস্যদের জন্য একটু ভালো খাবার বা নতুন কিছু কেনার ইচ্ছা থাকলেও অনেকে এখন আগে প্রয়োজনের তালিকা মিলিয়ে দেখছেন।
একজন ক্রেতার কথায়, আগে বিশেষ দিনে পরিবারের জন্য গরুর মাংস বা ভালো মানের মুরগি কেনার কথা ভাবা যেত। এখন সেই খরচ বহন করা কঠিন। ফলে সন্তানদের আবদার পূরণ করতে তুলনামূলক কম দামের খাবার বেছে নিতে হচ্ছে।
এভাবে বাজারের মূল্যবৃদ্ধি শুধু মানুষের পকেটেই চাপ তৈরি করছে না, বদলে দিচ্ছে তাদের জীবনযাপনের ধরন ও পারিবারিক সিদ্ধান্তও।
দ্রব্যমূল্যের চাপ শুধু নিম্ন আয়ের মানুষের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। মধ্যবিত্তের ওপরও এর প্রভাব স্পষ্ট। যাদের আয় তুলনামূলক বেশি, তারাও বলছেন—আগের মতো সঞ্চয় করা যাচ্ছে না। মাসিক আয়ের বড় অংশই চলে যাচ্ছে বাসা, খাবার, যাতায়াত ও অন্যান্য প্রয়োজনীয় খাতে।
ফলে ভবিষ্যৎ নিয়ে অনিশ্চয়তা বাড়ছে। জরুরি সময়ে চিকিৎসা, সন্তানের উচ্চশিক্ষা কিংবা হঠাৎ কোনো বড় ব্যয় এলে কীভাবে তা সামাল দেওয়া হবে, সেই চিন্তাও রয়েছে অনেক পরিবারের।
অর্থনৈতিক চাপ দীর্ঘস্থায়ী হলে এর প্রভাব শুধু বাজারের কেনাকাটায় সীমাবদ্ধ থাকে না। মানুষের খাদ্যাভ্যাস, স্বাস্থ্য, শিক্ষা, সঞ্চয় ও সামাজিক জীবনের ওপরও এর প্রভাব পড়ে। নিম্ন ও মধ্য আয়ের মানুষের একটি বড় অংশ যখন নিয়মিত প্রয়োজনীয় পণ্য কিনতে গিয়ে আয়-ব্যয়ের ভারসাম্য হারায়, তখন সেটি সামগ্রিক অর্থনীতির জন্যও উদ্বেগের বিষয় হয়ে ওঠে।
সাধারণ মানুষের প্রত্যাশা, নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের বাজারে স্থিতিশীলতা ফেরাতে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া হবে। একই সঙ্গে বাসাভাড়া, পরিবহন ও অন্যান্য নাগরিক সেবার ব্যয় নিয়ন্ত্রণে উদ্যোগ নেওয়া হবে। মানুষের আয় ও জীবনযাত্রার ব্যয়ের মধ্যে ভারসাম্য তৈরি না হলে মূল্যস্ফীতির এই চাপ থেকে স্বস্তি পাওয়া কঠিন বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
সব মিলিয়ে বাজারের ব্যাগ যেমন ছোট হচ্ছে, তেমনি ছোট হচ্ছে নিম্ন ও মধ্যবিত্ত পরিবারের স্বপ্নের তালিকাও। প্রতিদিনের প্রয়োজন মেটাতে গিয়ে ভবিষ্যতের পরিকল্পনা পিছিয়ে দিতে হচ্ছে বহু পরিবারকে। তাই দ্রব্যমূল্যের লাগাম টানা এখন শুধু অর্থনৈতিক বিষয় নয়, সাধারণ মানুষের স্বাভাবিক জীবনযাপন নিশ্চিত করারও অন্যতম বড় চ্যালেঞ্জ।
সদ্য সংবাদ/এসএস