হিমালয় অঞ্চলে হিমবাহ ধসের পর সৃষ্ট ভয়াবহ বন্যা ও ভূমিধসে নেপাল ও তিব্বতে প্রাণহানি ৬০০ ছাড়িয়েছে। এখন পর্যন্ত দুই অঞ্চলে অন্তত ৬৩১ জনের মৃত্যুর খবর পাওয়া গেছে। নিখোঁজ রয়েছেন প্রায় আড়াই হাজার মানুষ। দুর্গম এলাকাগুলোতে উদ্ধারকারী দল পৌঁছাতে না পারায় হতাহতের সংখ্যা আরও বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
শনিবার (২৯ আগস্ট) আল জাজিরার এক প্রতিবেদনে এ তথ্য জানানো হয়েছে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, নেপালে এখন পর্যন্ত ৬২৬ জনের মৃত্যু হয়েছে। নিখোঁজ রয়েছেন ১ হাজার ৯২৪ জন। সীমান্তের অপর পাশে তিব্বতে প্রাণ হারিয়েছেন আরও পাঁচজন এবং নিখোঁজ রয়েছেন ৫৫৮ জন। ফলে দুই অঞ্চলে নিখোঁজ মানুষের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে প্রায় ২ হাজার ৫০০।
দুর্যোগের ভয়াবহতায় বেশ কিছু এলাকায় যোগাযোগব্যবস্থা ভেঙে পড়েছে। বন্যার পানির পাশাপাশি কাদা, পাথর ও ধ্বংসাবশেষে সড়ক ও বিভিন্ন অবকাঠামো ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় দুর্গম অঞ্চলে উদ্ধার তৎপরতা ব্যাহত হচ্ছে।
হিমবাহ ধস থেকে বিপর্যয়
বুধবার সকালে হিমালয়ের প্রায় ৫ হাজার ২০০ মিটার উচ্চতায় একটি হিমবাহের বড় অংশ ভেঙে পড়ে। পাহাড়ের ঢাল বেয়ে নিচে নামার সময় বরফের সঙ্গে বিপুল পরিমাণ পাথর, মাটি ও ধ্বংসাবশেষ মিশে যায়। পরে এসব উপাদান লেন্দে নদীতে গিয়ে পড়লে নদীতে হঠাৎ করে বিপুল পানির চাপ তৈরি হয়।
এরপর সেই স্রোত দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে নেপালের রাসুয়া, নুওয়াকোট ও ধাদিং জেলার বিস্তীর্ণ এলাকায়। ত্রিশূলী নদীর একটি পর্যবেক্ষণকেন্দ্রের তথ্য অনুযায়ী, মাত্র ৩০ মিনিটের মধ্যে নদীর পানির উচ্চতা প্রায় ৯ মিটার বেড়ে যায়।
প্রবল স্রোতে বহু ঘরবাড়ি, সড়ক ও যোগাযোগ অবকাঠামো ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। অনেক এলাকা বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ায় সেখানে আটকে থাকা মানুষের কাছে এখনো উদ্ধারকারী দল পৌঁছাতে পারেনি।
প্রাথমিকভাবে এ ঘটনার পেছনে ভূমিকম্পের প্রভাব থাকার আশঙ্কা করা হলেও পরে যুক্তরাষ্ট্রের ভূতাত্ত্বিক জরিপ সংস্থার বিশ্লেষণে ভিন্ন তথ্য উঠে আসে। সংস্থাটির মতে, ভূমিকম্পের মতো যে কম্পন শনাক্ত হয়েছিল, সেটি মূলত হিমবাহ ধসের সময় সৃষ্ট ভূমিধসের কারণে হয়েছে।
নতুন হ্রদ ঘিরে নতুন শঙ্কা
হিমবাহ ধসের এলাকায় নতুন একটি হ্রদ সৃষ্টি হওয়ায় বিপদের আশঙ্কা আরও বেড়েছে। ধসে তৈরি প্রাকৃতিক বাঁধের পেছনে পানি জমতে থাকায় সেটি ভেঙে গেলে আবারও আকস্মিক বন্যা দেখা দিতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন বিশেষজ্ঞরা।
এই ঝুঁকির কারণে একপর্যায়ে উদ্ধার অভিযান সাময়িকভাবে স্থগিত রাখা হয়। পরে পরিস্থিতি পর্যালোচনা করে ঝুঁকি নিয়ন্ত্রণযোগ্য মনে হওয়ায় আবারও উদ্ধারকাজ শুরু করা হয়েছে।
তবে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, নতুন তৈরি হওয়া হ্রদের প্রাকৃতিক বাঁধ এখনো পুরোপুরি নিরাপদ নয়। কলোরাডো বিশ্ববিদ্যালয়ের হিমবাহ দুর্যোগ বিশেষজ্ঞ আলটন বায়ার্সের মতে, পাথর ও ধ্বংসাবশেষ দিয়ে তৈরি বাঁধটি অস্থিতিশীল হওয়ায় যেকোনো সময় ভেঙে পড়তে পারে।
তাঁদের মতে, হ্রদের পানি ধীরে ধীরে স্বাভাবিক পথে বেরিয়ে যাওয়া সবচেয়ে নিরাপদ পরিস্থিতি। প্রয়োজন হলে চীনা প্রকৌশলী ও উদ্ধারকারীরা নিয়ন্ত্রিত উপায়ে পানি বের করে দেওয়ার উদ্যোগ নিতে পারেন।
আন্তর্জাতিক সহায়তা নিচ্ছে নেপাল
ভয়াবহ পরিস্থিতি মোকাবিলায় নেপাল সরকার এখন আন্তর্জাতিক সহায়তা গ্রহণের সিদ্ধান্ত নিয়েছে। ভারত ও চীনের কাছ থেকে বিশেষজ্ঞ সহায়তা চাওয়া হয়েছে। দুর্গম এলাকা এবং ধ্বংসস্তূপে আটকে থাকা মানুষ উদ্ধারে দক্ষ সদস্যদের নিয়ে দল পাঠানোর উদ্যোগ নিয়েছে দেশ দুটি।
এর আগে বড় পরিসরে বিদেশি উদ্ধারকারী দল নেওয়ার বিষয়ে কিছুটা অনাগ্রহ দেখিয়েছিল কাঠমান্ডু। দেশটির নিজস্ব উদ্ধারকারী বাহিনী পরিস্থিতি মোকাবিলায় সক্ষম বলে তখন জানানো হয়েছিল। তবে দুর্যোগের ব্যাপকতা বাড়তে থাকায় এখন আন্তর্জাতিক সহযোগিতাকে গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
এদিকে চীনের প্রধানমন্ত্রী লি ছিয়াং বৃহস্পতিবার তিব্বতের গিরং এলাকা পরিদর্শন করেছেন। একই সময়ে প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং উদ্ধার ও ত্রাণ কার্যক্রম নিয়ে বৈঠক করেন। হিমবাহ-সংলগ্ন হ্রদগুলোর ঝুঁকি পর্যবেক্ষণ এবং বৈজ্ঞানিকভাবে উদ্ধার ও ত্রাণ পরিকল্পনা তৈরির নির্দেশ দিয়েছেন তিনি।
নেপালের দুর্যোগ মোকাবিলায় ভারত, জাতিসংঘ, আন্তর্জাতিক রেডক্রস ফেডারেশন, অস্ট্রেলিয়া, দক্ষিণ কোরিয়া ও যুক্তরাষ্ট্রসহ বিভিন্ন দেশ ও আন্তর্জাতিক সংস্থা সহায়তার হাত বাড়িয়েছে।
তবে উদ্ধার অভিযানে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে দুর্গম ভূপ্রকৃতি ও ক্ষতিগ্রস্ত যোগাযোগব্যবস্থা। ফলে প্রত্যন্ত এলাকায় ঠিক কত মানুষ আটকা পড়ে আছেন, সে বিষয়ে এখনো পূর্ণাঙ্গ তথ্য পাওয়া যায়নি।
উদ্ধারকারী দলগুলো দুর্গত এলাকাগুলোতে পৌঁছানোর সঙ্গে সঙ্গে হতাহতের প্রকৃত চিত্র আরও স্পষ্ট হবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। একই সঙ্গে নতুন হ্রদের বাঁধ ভেঙে দ্বিতীয় দফায় বন্যার আশঙ্কা থাকায় পরিস্থিতি নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে।
সদ্য সংবাদ/এসকে