খালেদা জিয়া: সময়ের স্রোতে বাংলাদেশের এক দীর্ঘ রাজনৈতিক অধ্যায়

A
Admin
২৫ জুলাই, ২০২৬ ১৬:৩৭:২৭

বাংলাদেশের রাজনীতিতে কিছু নাম থাকে, যাদের পরিচয় শুধু ক্ষমতা বা পদে সীমাবদ্ধ নয়—তারা হয়ে ওঠেন সময়ের প্রতিচ্ছবি। খালেদা জিয়া তেমনই এক অনিবার্য নাম। তাকে বোঝার অর্থ, গত চার দশকের বাংলাদেশের রাজনীতিকে বোঝা। তার উত্থান, সংগ্রাম, বিতর্ক ও নীরব সহিষ্ণুতা—সব মিলিয়ে তিনি এক পূর্ণাঙ্গ রাজনৈতিক অধ্যায়।

ব্রিটিশ ভারতের বঙ্গ প্রদেশের জলপাইগুড়িতে ১৯৪৫ সালের ১৫ আগস্ট জন্ম নেওয়া খালেদা জিয়া দিনাজপুরের এক সাধারণ পরিবারে শৈশব ও কৈশোর ছিল নিরাবেগ ও অনাড়ম্বর। রাজনীতির সঙ্গে তার প্রত্যক্ষ কোনো সম্পর্ক ছিল না। গৃহিণী হিসেবে সংসার ও সন্তানই ছিল তার প্রধান জগৎ। কিন্তু ইতিহাস অনেক সময় মানুষকে তার প্রস্তুতি ছাড়াই দায়িত্বের মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে দেয়। শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের শাহাদাতের পর সেই ইতিহাসের কেন্দ্রবিন্দুতে এসে দাঁড়ান খালেদা জিয়া।

১৯৮১ সালের সেই শোকাবহ ঘটনার পর তিনি শুধু একজন স্বজনহারা স্ত্রীই ছিলেন না, তিনি হয়ে ওঠেন একটি রাজনৈতিক উত্তরাধিকার বহনকারী নাম। রাজনীতিতে তার প্রবেশ ছিল অনিচ্ছাকৃত, কিন্তু দায়িত্ব ছিল অনিবার্য। সেই সময় একজন নারী হিসেবে, তাও আবার রাজনীতিতে অভিজ্ঞতাহীন অবস্থায়, একটি বড় রাজনৈতিক দলের নেতৃত্ব গ্রহণ ছিল সহজ সিদ্ধান্ত নয়। তবুও তিনি পিছিয়ে যাননি। বরং ধীরে ধীরে তিনি নিজেকে রাজনীতির কঠিন বাস্তবতার সঙ্গে মানিয়ে নেন।

সামরিক শাসনের সময় খালেদা জিয়া হয়ে ওঠেন গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের আন্দোলনের অন্যতম মুখ। স্বৈরশাসনবিরোধী আন্দোলনে তার ভূমিকা তাকে আপসহীন ও দৃঢ় নেত্রী হিসেবে পরিচিত করে তোলে। রাজপথে নামা, গ্রেপ্তার হওয়া, আন্দোলনের ঝুঁকি নেওয়া—সবকিছুই তিনি গ্রহণ করেন নেতৃত্বের দায় থেকে। এই সময়েই তার রাজনৈতিক চরিত্রের একটি স্পষ্ট রূপ গড়ে ওঠে—তিনি আপসের চেয়ে প্রতিরোধকে বেছে নেওয়া একজন নেত্রী।

১৯৯১ সালে প্রথমবারের মতো প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণের মধ্য দিয়ে খালেদা জিয়ার রাষ্ট্রক্ষমতার অধ্যায় শুরু হয়। তার নেতৃত্বে সংসদীয় গণতন্ত্র পুনঃপ্রবর্তিত হয়, যা বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক। এরপর তিনি আরও দুইবার প্রধানমন্ত্রী হন। তার শাসনামলে নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা চালু হয়, যা দীর্ঘদিন দেশের নির্বাচন ব্যবস্থার একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে বিবেচিত হয়েছে।

শিক্ষা, অবকাঠামো, যোগাযোগ এবং সামাজিক খাতে তার সরকারের নানা উদ্যোগ দেশের উন্নয়ন ধারায় প্রভাব ফেলেছে।  ক্ষমতার বাইরে থাকার সময়েও খালেদা জিয়া ছিলেন রাজনৈতিকভাবে প্রভাবশালী। বিরোধীদলীয় নেত্রী হিসেবে তিনি রাজপথের আন্দোলনে সক্রিয় ছিলেন। সরকারবিরোধী কর্মসূচি, অবরোধ ও হরতালের রাজনীতি—এসবই তার রাজনৈতিক কৌশলের অংশ ছিল। এই রাজনীতি যেমন সমর্থকদের কাছে শক্ত অবস্থানের প্রতীক, তেমনি সমালোচকদের কাছে প্রশ্নবিদ্ধ। ইতিহাস হয়তো একদিন এই সময়ের মূল্যায়ন আরও নিরপেক্ষভাবে করবে।

খালেদা জিয়ার জীবনের সবচেয়ে করুণ ও কঠিন অধ্যায় শুরু হয় তার কারাবরণের মধ্য দিয়ে। রাজনৈতিক মামলায় দীর্ঘ সময় কারাগারে থাকা, বয়সজনিত নানা অসুস্থতা এবং পর্যাপ্ত চিকিৎসা নিয়ে অনিশ্চয়তা—সব মিলিয়ে এটি ছিল এক মানবিক সংকটের সময়। এই অধ্যায়ে তাকে খুব কমই প্রকাশ্যে কথা বলতে দেখা গেছে। অভিযোগ, প্রতিক্রিয়া কিংবা আবেগপ্রবণ বক্তব্যের বদলে তিনি বেছে নিয়েছেন নীরবতা। এই নীরবতা অনেকের কাছে দুর্বলতা মনে হলেও বাস্তবে এটি ছিল এক ধরনের দৃঢ়তা—যা সব রাজনীতিকের থাকে না।

খালেদা জিয়া বাংলাদেশের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী। দক্ষিণ এশিয়ার রাজনৈতিক বাস্তবতায় এটি ছিল এক গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা। পুরুষপ্রধান রাজনীতিতে নিজের অবস্থান তৈরি করা, দলকে নেতৃত্ব দেওয়া এবং রাষ্ট্র পরিচালনা করা—সবকিছুই তিনি করেছেন সামাজিক ও রাজনৈতিক প্রতিবন্ধকতা অতিক্রম করে। তার নেতৃত্ব নারীর ক্ষমতায়নের একটি দৃষ্টান্ত হয়ে থাকবে, যদিও তিনি নিজে কখনো নারীবাদী রাজনীতির প্রতীক হিসেবে নিজেকে উপস্থাপন করেননি।

খালেদা জিয়ার রাজনৈতিক জীবন বিতর্কমুক্ত নয়। তার বিরুদ্ধে অভিযোগ আছে, সমালোচনা আছে, প্রশ্ন আছে। আবার একই সঙ্গে আছে অবদান, নেতৃত্ব ও সংগ্রামের ইতিহাস। তাকে ভালোবাসা বা না-ভালোবাসার প্রশ্নে মানুষ বিভক্ত হতে পারে, কিন্তু তাকে উপেক্ষা করার সুযোগ নেই। কারণ তিনি বাংলাদেশের রাজনীতিকে প্রভাবিত করেছেন গভীরভাবে—রাষ্ট্রক্ষমতায় থেকেও, বিরোধিতায় থেকেও।

বাংলাদেশের রাজনীতি আজ যে জায়গায় দাঁড়িয়ে আছে, তার পেছনে খালেদা জিয়ার ভূমিকা অনস্বীকার্য। তিনি রাজনীতির এক দীর্ঘ সময়কে প্রতিনিধিত্ব করেন—যেখানে গণতন্ত্রের জন্য আন্দোলন ছিল, আবার ক্ষমতার দ্বন্দ্বও ছিল; যেখানে নেতৃত্ব ছিল, আবার নিঃসঙ্গতাও ছিল।

সময় একদিন সব কিছুর নির্মোহ বিচার করবে। কে ঠিক ছিল, কে ভুল ছিল—তার রায় দেবে ইতিহাস। কিন্তু আজ স্মরণিকার পাতায় দাঁড়িয়ে এটুকু বলা যায়, খালেদা জিয়া কেবল একজন সাবেক প্রধানমন্ত্রী নন। তিনি বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসের এক জীবন্ত দলিল, এক সংগ্রামী অধ্যায় এবং সময়ের স্রোতে এক অনিবার্য নাম।

মন্তব্য (0)

মন্তব্য করুন

এখনো কোনো মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্য করুন!

বিজ্ঞাপনের জন্য খালি স্পেস

শিরোনাম:
সদ্য. জাতীয় সংসদের নতুন সদস্য হিসেবে শপথ নিলেন ফয়সল আমীন ও এলিজা জামান সদ্য. হাসিনার সম্পত্তি বিক্রির অর্ধেক অর্থ পাবেন জুলাই অভ্যুত্থানে নিহতদের স্বজনেরা, মন্ত্রণালয়ে চিঠি সদ্য. ওমরাহ পালনে ২২ সদস্যকে সৌদি আরব পাঠাচ্ছে আনসার-ভিডিপি সদ্য. আইনশৃঙ্খলা নিয়ন্ত্রণে গাজীপুরে ২৫ জন নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট ও ১১ প্লাটুন বিজিবি মোতায়েন সদ্য. রাষ্ট্রপতির সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে বঙ্গভবনে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান সদ্য. হাসিনা জীবিত থাকা পর্যন্ত অস্থিরতা সৃষ্টির চেষ্টা চলতে পারে: প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা সদ্য. পদ্মা সেতুর পর পাঁচ বছরে বিআইডব্লিউটিসির লোকসান ১৩৭ কোটি টাকা সদ্য. ১২ কেজি এলপিজি সিলিন্ডারের দাম বাড়ল ২২৩ টাকা সদ্য. আজ রাতেই উপকূলে আছড়ে পড়তে পারে ঘূর্ণিঝড় ‘মুরাসু’ সদ্য. মঙ্গলবার আনুষ্ঠানিকভাবে শপথ নেবেন মির্জা ফয়সল আমীন-এলিজা জামান সদ্য. জাতীয় সংসদের নতুন সদস্য হিসেবে শপথ নিলেন ফয়সল আমীন ও এলিজা জামান সদ্য. হাসিনার সম্পত্তি বিক্রির অর্ধেক অর্থ পাবেন জুলাই অভ্যুত্থানে নিহতদের স্বজনেরা, মন্ত্রণালয়ে চিঠি সদ্য. ওমরাহ পালনে ২২ সদস্যকে সৌদি আরব পাঠাচ্ছে আনসার-ভিডিপি সদ্য. আইনশৃঙ্খলা নিয়ন্ত্রণে গাজীপুরে ২৫ জন নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট ও ১১ প্লাটুন বিজিবি মোতায়েন সদ্য. রাষ্ট্রপতির সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে বঙ্গভবনে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান সদ্য. হাসিনা জীবিত থাকা পর্যন্ত অস্থিরতা সৃষ্টির চেষ্টা চলতে পারে: প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা সদ্য. পদ্মা সেতুর পর পাঁচ বছরে বিআইডব্লিউটিসির লোকসান ১৩৭ কোটি টাকা সদ্য. ১২ কেজি এলপিজি সিলিন্ডারের দাম বাড়ল ২২৩ টাকা সদ্য. আজ রাতেই উপকূলে আছড়ে পড়তে পারে ঘূর্ণিঝড় ‘মুরাসু’ সদ্য. মঙ্গলবার আনুষ্ঠানিকভাবে শপথ নেবেন মির্জা ফয়সল আমীন-এলিজা জামান