ইরানে চলমান সরকারবিরোধী বিক্ষোভ ঘিরে পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে উঠেছে। বিক্ষোভকারীদের ওপর দমন–পীড়নের অভিযোগ তুলে আবারও সামরিক পদক্ষেপের হুমকি দিয়েছেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। জবাবে ইরান জানিয়েছে, তারা যুদ্ধ চায় না, তবে যে কোনো পরিস্থিতি মোকাবিলায় পুরোপুরি প্রস্তুত। একই সঙ্গে সংলাপের পথও খোলা রাখা হয়েছে।
সোমবার (১২ জানুয়ারি) বিক্ষোভের ১৬তম দিনে নরওয়েভিত্তিক মানবাধিকার সংস্থা ইরান হিউম্যান রাইটস জানায়, নিরাপত্তা বাহিনীর সঙ্গে সংঘর্ষে অন্তত ৬৪৮ জন বিক্ষোভকারী নিহত হয়েছেন। যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক সংস্থা এইচআরএএনএর তথ্য অনুযায়ী, ১০ হাজার ৫০০-এর বেশি বিক্ষোভকারীকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। অন্যদিকে ইরান দাবি করেছে, সংঘর্ষে তাদের ১০৯ জন নিরাপত্তা সদস্য নিহত হয়েছেন। তবে বিক্ষোভকারীদের হতাহতের কোনো সরকারি সংখ্যা প্রকাশ করেনি তেহরান।
এরই মধ্যে ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি বলেছেন, বিক্ষোভ ‘পরিস্থিতি পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে’ রয়েছে। তবে ট্রাম্পের বক্তব্য পরিস্থিতিতে নতুন উত্তেজনা যোগ করেছে। রোববার এয়ারফোর্স ওয়ানে সাংবাদিকদের ট্রাম্প বলেন, বিক্ষোভকারীদের হত্যার মাধ্যমে তেহরান “শেষসীমা অতিক্রম করা শুরু করেছে” বলে মনে হচ্ছে। তিনি জানান, যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক বাহিনী বিষয়টি নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করছে এবং ‘কঠোর পদক্ষেপের’ বিভিন্ন বিকল্প বিবেচনায় রয়েছে।
ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ইসমাইল বাগেরি বলেন, ইরান সংলাপে আগ্রহী, তবে বিদেশি হস্তক্ষেপ মেনে নেবে না। পররাষ্ট্রমন্ত্রী আরাগচিও পুনর্ব্যক্ত করেন, তেহরান যুদ্ধ চায় না, কিন্তু প্রস্তুত রয়েছে এবং আলোচনার দরজা খোলা।
মঙ্গলবার ইরান ইস্যুতে জ্যেষ্ঠ উপদেষ্টাদের সঙ্গে বৈঠকে বসার কথা রয়েছে ট্রাম্পের। মার্কিন সংবাদমাধ্যম ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল জানিয়েছে, যুক্তরাষ্ট্রের বিবেচ্য বিকল্পগুলোর মধ্যে রয়েছে সামরিক হামলা, গোপন সাইবার অভিযান, নিষেধাজ্ঞা জোরদার এবং সরকারবিরোধী পক্ষকে সহায়তা।
ইরান সতর্ক করেছে, হামলা হলে ইসরায়েল ও মধ্যপ্রাচ্যে অবস্থিত মার্কিন ঘাঁটিগুলো বৈধ লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হবে। বর্তমানে বাহরাইন, ইরাক, কাতার, কুয়েত, সৌদি আরব, জর্ডান, মিসর ও সংযুক্ত আরব আমিরাতে যুক্তরাষ্ট্রের আটটি স্থায়ী সামরিক ঘাঁটি রয়েছে।
এদিকে বিক্ষোভের মাত্রা কিছুটা কমেছে বলে দাবি করছে তেহরান। সরকার গত বৃহস্পতিবার থেকে ইন্টারনেট বন্ধ রাখায় আন্দোলনের গতি কমেছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকেরা। রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম জানিয়েছে, বিভিন্ন শহরে সরকারপন্থী সমাবেশ হয়েছে এবং রাজধানী তেহরানে প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান এতে অংশ নেন।
আন্তর্জাতিক অঙ্গনে ইরানের দমন–পীড়নের নিন্দা জানিয়েছে ইউরোপীয় ইউনিয়ন, কানাডা, জার্মানি ও ফিনল্যান্ড। জাতিসংঘ মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেস তেহরানকে ‘সর্বোচ্চ সংযম’ দেখানোর আহ্বান জানিয়েছেন। অপরদিকে চীন ইরানের প্রতি সমর্থন জানিয়ে বলেছে, তারা কোনো দেশের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে বিদেশি হস্তক্ষেপের বিরোধী।
এই বিক্ষোভকে ১৯৭৯ সালের ইসলামি বিপ্লবের পর ইরানের সরকারের জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখা হচ্ছে।