বরিশালে অগ্রণী হাউজিং (আবাসন) লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক আব্দুল আজিজ হাওলাদারকে মারধর ও শারীরিক নির্যাতনের মাধ্যমে চেক ও স্ট্যাম্পে স্বাক্ষর নেওয়ার ঘটনায় অভিযুক্ত মোস্তাফিজুর রহমান লিটুকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ।
রোববার (৫ জুলাই) দুপুর ২টার দিকে নগরীর সদর রোডের টপ টেন নামের একটি ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের সামনে থেকে তাকে গ্রেপ্তার করা হয়। বিষয়টি নিশ্চিত করে বরিশাল কোতোয়ালি মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. আল মামুন উল ইসলাম জানান, এ ঘটনায় বিকেলে সংবাদ সম্মেলনের মাধ্যমে বিস্তারিত জানানো হবে।
ঘটনাটি ঘটে গত ২৭ জুন সন্ধ্যা সাড়ে ৭টার দিকে নগরীর সদর রোডে অবস্থিত অগ্রণী হাউজিংয়ের কার্যালয়ে। তবে ঘটনাটির সিসিটিভি ফুটেজ শনিবার (৪ জুলাই) রাতে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লে তা ব্যাপক আলোচনার জন্ম দেয়। এর আগেই ভুক্তভোগী আব্দুল আজিজ আদালতে একটি নালিশি মামলা দায়ের করেন। আদালত সেটিকে এফআইআর হিসেবে গ্রহণের নির্দেশ দিয়েছেন বলে জানিয়েছেন তিনি।
ভাইরাল হওয়া সিসিটিভি ফুটেজে দেখা যায়, আব্দুল আজিজ হাওলাদারের কক্ষে চারজন যুবক প্রবেশ করেন। তাদের মধ্যে মোস্তাফিজুর রহমান লিটু তাকে মারধর করেন এবং একপর্যায়ে শারীরিকভাবে নির্যাতন করে দুটি চেক ও একটি সাদা স্ট্যাম্পে স্বাক্ষর নেন। এ সময় ভুক্তভোগীকে ‘বাচ্চু, বাচ্চু’ বলে কাউকে ডাকতেও শোনা যায়। পরে আরেক ব্যক্তি কক্ষে প্রবেশ করলে তাকেও কিছু সময় আটকে রেখে ধাক্কা দিয়ে বের করে দেওয়া হয়। পুরো ঘটনাটি মোবাইল ফোনে ধারণ করা হয়।
স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, অভিযুক্ত লিটু নগরীর কাটপট্টি সড়কের বাসিন্দা এবং স্থানীয়ভাবে যুবদলের রাজনীতির সঙ্গে সম্পৃক্ত হিসেবে পরিচিত। তার বড় ভাই মাহবুবুর রহমান পিন্টু জেলা স্বেচ্ছাসেবক দলের সাবেক সভাপতি।
ভুক্তভোগী আব্দুল আজিজ হাওলাদারের ভাষ্য, মোস্তাফিজুর রহমান লিটু একসময় তাদের আবাসন ব্যবসার অংশীদার ছিলেন। পরে বিনিয়োগের বিপরীতে জমি হস্তান্তরের মাধ্যমে হিসাব চূড়ান্ত করা হয় এবং লিটুর আর কোনো পাওনা নেই—এ মর্মে অঙ্গীকারনামাও দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু এরপরও লিটু তার কাছে এক কোটি টাকা দাবি করে আসছিলেন।
তার অভিযোগ, ২৭ জুন সন্ধ্যায় লিটু অফিসে এসে তাকে মারধর করেন। একপর্যায়ে ভয়ভীতি দেখিয়ে, শারীরিক নির্যাতন চালিয়ে এবং অণ্ডকোষ চেপে ধরে জোর করে ৭০ লাখ টাকার একটি চেক, একটি সাদা চেক এবং দুটি সাদা স্ট্যাম্পে স্বাক্ষর করিয়ে নেন।
আব্দুল আজিজ জানান, ঘটনার পর তিনি সংশ্লিষ্ট ব্যাংকে অভিযোগ জানানোয় ওই চেক থেকে কোনো অর্থ উত্তোলন সম্ভব হয়নি। পরে তিনি আদালতের দ্বারস্থ হন। তিনি আরও বলেন, ভাইরাল হওয়া সিসিটিভি ফুটেজটি তিনিই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশ করেছেন।
অন্যদিকে অভিযোগ অস্বীকার করেছেন মোস্তাফিজুর রহমান লিটু। তার দাবি, তারা সবাই অগ্রণী হাউজিংয়ের পরিচালক ছিলেন এবং আব্দুল আজিজ তাদের অর্থ আত্মসাৎ করেছেন। এ বিষয়ে পরে সংবাদ সম্মেলনের মাধ্যমে বিস্তারিত জানানো হবে বলেও তিনি উল্লেখ করেন।
এ ঘটনায় লিটুর বড় ভাই মাহবুবুর রহমান পিন্টু বলেন, এমডিকে হেনস্তার অভিযোগ সম্পর্কে তিনি আগে কিছু জানতেন না। তার ভাষ্য, ভাইয়ের সঙ্গে অগ্রণী হাউজিংয়ের দীর্ঘদিনের ব্যবসায়িক সম্পর্ক ছিল, তবে বর্তমান লেনদেন বা বিরোধ সম্পর্কে তিনি অবগত নন। এমনকি ঘটনাস্থলে উপস্থিত থাকার অভিযোগও তিনি অস্বীকার করেন।
নিজের রাজনৈতিক অবস্থান প্রসঙ্গে পিন্টু বলেন, ভাইয়ের সঙ্গে তার কোনো রাজনৈতিক সম্পৃক্ততা নেই। “আমাদের পরিচয় শুধু আমরা একই বাবার সন্তান—এর বাইরে রাজনৈতিকভাবে তার সঙ্গে আমার কোনো সম্পর্ক নেই,” বলেন তিনি।
এ বিষয়ে বরিশাল মহানগর বিএনপির সদস্যসচিব আফরোজা খানম নাসরিন বলেন, কেউ অপরাধ করলে তার বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া যেতে পারে, তবে কাউকে প্রকাশ্যে লাঞ্ছিত করা গ্রহণযোগ্য নয়। যদি বিএনপি বা এর অঙ্গসংগঠনের কেউ জড়িত থাকে, তার বিরুদ্ধেও ব্যবস্থা নিতে হবে।
বরিশাল কোতোয়ালি মডেল থানার ওসি মো. আল মামুন উল ইসলাম বলেন, ভুক্তভোগী থানায় এসে মৌখিকভাবে বিষয়টি জানিয়েছেন। আদালতের আদেশের কপি রোববার থানায় পৌঁছাতে পারে। লিখিত অভিযোগ পাওয়ার পর তদন্ত সাপেক্ষে প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।