দেশে ৮২ লাখ মানুষ মাদকাসক্ত, সবচেয়ে বেশি ব্যবহৃত হচ্ছে গাঁজা

A
Admin
২৫ জুলাই, ২০২৬ ১৬:৩৭:২৮
বাংলাদেশে মাদক ব্যবহার আর আড়ালে থাকা কোনো সমস্যা নয়; এটি এখন একটি স্পষ্ট জনস্বাস্থ্য ও সামাজিক সংকটে রূপ নিয়েছে। জাতীয় পর্যায়ের এক গবেষণায় উঠে এসেছে, দেশে বর্তমানে আনুমানিক ৮২ লাখ মানুষ কোনো না কোনো ধরনের অবৈধ মাদক ব্যবহার করছে, যা মোট জনসংখ্যার প্রায় ৪ দশমিক ৮৮ শতাংশ। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি ব্যবহৃত মাদক গাঁজা, যার ব্যবহারকারীর সংখ্যা প্রায় ৬১ লাখ।

রোববার (২৫ জানুয়ারি) বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় (বিএমইউ) আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে গবেষণার ফলাফল প্রকাশ করা হয়।

গবেষণায় বলা হয়েছে, দেশে মাদক ব্যবহার একটি গুরুতর জনস্বাস্থ্য, সামাজিক ও অর্থনৈতিক সমস্যায় পরিণত হয়েছে। তবে সিগারেট সেবনকে এই গবেষণায় মাদক ব্যবহারের আওতায় ধরা হয়নি।

মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের (ডিএনসি) তত্ত্বাবধানে পরিচালিত এই গবেষণা বিএমইউ এবং রিসার্চ অ্যান্ড ম্যানেজমেন্ট কনসালটেন্টস লিমিটেড (আরএমসিএল) যৌথভাবে সম্পন্ন করে। ২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারি থেকে জুন পর্যন্ত নেটওয়ার্ক স্কেল-আপ মেথড ব্যবহার করে দেশের আটটি বিভাগের ১৩টি জেলা ও ২৬টি উপজেলায় তথ্য সংগ্রহ করা হয়।

বিভাগভেদে মাদক ব্যবহারের হারে উল্লেখযোগ্য পার্থক্য দেখা গেছে। ময়মনসিংহে মাদক ব্যবহারের হার সবচেয়ে বেশি—৬ দশমিক ০২ শতাংশ। এরপর রংপুরে ৬ দশমিক শূন্য শতাংশ এবং চট্টগ্রামে ৫ দশমিক ৫০ শতাংশ। তুলনামূলকভাবে রাজশাহীতে হার সবচেয়ে কম—২ দশমিক ৭২ শতাংশ, আর খুলনায় ৪ দশমিক ০৮ শতাংশ।

সংখ্যার হিসাবে সবচেয়ে বেশি মাদক ব্যবহারকারী ঢাকা বিভাগে, প্রায় ২২ লাখ ৯০ হাজার। এরপর চট্টগ্রাম বিভাগে ১৮ লাখ ৭৯ হাজার এবং রংপুর বিভাগে প্রায় ১০ লাখ ৮০ হাজার মানুষ মাদক গ্রহণ করছে। সব মিলিয়ে দেশে যেকোনো ধরনের মাদক ব্যবহারকারীর সংখ্যা দাঁড়িয়েছে প্রায় ৮১ লাখ ৯৫ হাজার।

মাদক প্রকারভেদে বিশ্লেষণে দেখা যায়, দেশে সবচেয়ে বেশি ব্যবহৃত মাদক গাঁজা (ক্যানাবিস), যার ব্যবহারকারী প্রায় ৬০ লাখ ৮০ হাজার। এরপর রয়েছে ইয়াবা বা মেথামফেটামিন (প্রায় ২৩ লাখ), অ্যালকোহল (২০ লাখ), কোডিনযুক্ত কাশির সিরাপ, ঘুমের ওষুধ ও হেরোইন। ইনজেকশনের মাধ্যমে মাদক গ্রহণকারীর সংখ্যা প্রায় ৩৯ হাজার, যাদের মধ্যে এইচআইভি ও হেপাটাইটিসসহ সংক্রামক রোগের ঝুঁকি অত্যন্ত বেশি।

গবেষণায় আরও জানা যায়, একজন মাদক ব্যবহারকারী গড়ে প্রতি মাসে প্রায় ছয় হাজার টাকা মাদকের পেছনে ব্যয় করেন। একই ব্যক্তি একাধিক ধরনের মাদক সেবন করতেও পারে।

বয়সভিত্তিক বিশ্লেষণে দেখা গেছে, মাদক ব্যবহারকারীদের একটি বড় অংশ খুব অল্প বয়সেই মাদকে জড়িয়ে পড়ে। প্রায় ৩৩ শতাংশ ব্যবহারকারী ৮ থেকে ১৭ বছর বয়সে প্রথম মাদক গ্রহণ করে এবং ৫৯ শতাংশ শুরু করে ১৮ থেকে ২৫ বছর বয়সে।

বেকারত্ব, বন্ধুমহলের চাপ, আর্থিক অনিশ্চয়তা, পারিবারিক অস্থিরতা, মানসিক চাপ এবং অনানুষ্ঠানিক পেশায় যুক্ত থাকা মাদক ব্যবহারের প্রধান ঝুঁকিপূর্ণ কারণ হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে। আশঙ্কাজনকভাবে, প্রায় ৯০ শতাংশ ব্যবহারকারী জানিয়েছেন—মাদক সহজেই পাওয়া যায়।

চিকিৎসা ও পুনর্বাসন সুবিধা নিয়েও গবেষণায় হতাশাজনক চিত্র উঠে এসেছে। মাত্র ১৩ শতাংশ মাদক ব্যবহারকারী কখনো চিকিৎসা বা পুনর্বাসন সেবা পেয়েছেন। যদিও অর্ধেকের বেশি ব্যবহারকারী মাদক ছাড়ার চেষ্টা করেছেন, পর্যাপ্ত চিকিৎসা, কাউন্সেলিং ও সামাজিক সহায়তার অভাবে অধিকাংশই সফল হতে পারেননি।

মাদক ব্যবহারকারীরা চিকিৎসা ও পুনর্বাসন (৬৯ শতাংশ), কাউন্সেলিং (৬২ শতাংশ) এবং কর্মসংস্থান সহায়তাকে (৪১ শতাংশ) সবচেয়ে জরুরি প্রয়োজন হিসেবে উল্লেখ করেছেন। পাশাপাশি ৬৮ শতাংশ ব্যবহারকারী সামাজিক ও পারিবারিক পর্যায়ে অপবাদ ও বৈষম্যের শিকার হওয়ার কথাও জানিয়েছেন।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই গবেষণা স্পষ্ট করে দেখিয়েছে—মাদক সমস্যা কেবল আইনশৃঙ্খলার বিষয় নয়; এটি একটি বহুমাত্রিক জনস্বাস্থ্য ও সামাজিক সংকট। তাই দমনমূলক ব্যবস্থার পাশাপাশি প্রতিরোধ, চিকিৎসা, পুনর্বাসন, মানসিক স্বাস্থ্যসেবা এবং সামাজিক পুনঃএকত্রীকরণ নিশ্চিত করা জরুরি।

অনুষ্ঠানে বিএমইউর ভাইস-চ্যান্সেলর অধ্যাপক ডা. মো. শাহিনুল আলম বলেন, 'আমরা মনে করি মাদকাসক্তরা অন্য কেউ। কিন্তু বাস্তবে আমরাও এবং আমাদের সন্তানরাও ঝুঁকির মধ্যে আছি। সবাইকে ঐক্যবদ্ধভাবে এই বিপদ মোকাবিলা করতে হবে।'

মাদক নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের মহাপরিচালক মো. হাসান মারুফ বলেন, 'পরিবার থেকেই মাদক প্রতিরোধ শুরু করতে হবে। মাদকাসক্তদের চিকিৎসা সম্প্রসারণে ঢাকা ছাড়াও সাত বিভাগে ২০০ শয্যার পুনর্বাসন কেন্দ্র স্থাপনের প্রকল্প অনুমোদন পেয়েছে।'

বিএমইউর কোষাধ্যক্ষ অধ্যাপক ডা. নাহরীন আখতার বলেন, 'শিশু ও তরুণদের মাদকের ভয়াবহ ক্ষতি থেকে রক্ষা করতে সরবরাহ ও চাহিদা—দুটিই একসঙ্গে কমাতে হবে।'

মন্তব্য (0)

মন্তব্য করুন

এখনো কোনো মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্য করুন!

বিজ্ঞাপনের জন্য খালি স্পেস

শিরোনাম:
সদ্য. একনেকে আড়াই লাখ কোটি টাকার তিন মেট্রোরেল প্রকল্প অনুমোদন সদ্য. পাঠ্যবইয়ে অন্তর্ভুক্ত হচ্ছে জিয়াউর রহমানের লেখা সদ্য. আন্তর্জাতিক জলসীমায় ভারত-পাকিস্তান নৌবাহিনীর জাহাজের মাঝে সংঘর্ষ সদ্য. সাজাপ্রাপ্ত পলাতক আসামিদের ফেরাতে ভারতের সুনির্দিষ্ট উত্তর নেই: পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী সদ্য. জয় বাংলা স্লোগান দিয়ে বিএনপি কার্যালয়ে হামলা-ভাঙচুর, আ. লীগ নেতার বাড়িতে আগুন সদ্য. মক্কায় ড্রোন হামলার অভিযোগকে ‘ডাহা মিথ্যা’ আখ্যা দিল হুতিরা সদ্য. সৌদিসহ মধ্যপ্রাচ্যের ৬ মুসলিম দেশের সঙ্গে ইসরায়েলের বৈঠক সদ্য. সরকারি চাকরিতে উচ্চতর গ্রেড পাওয়ার প্রক্রিয়ায় আসছে পরিবর্তন সদ্য. দেশের ৫ বিভাগে ভারী বর্ষণের আভাস সদ্য. গুলশান থানার ওসি প্রত্যাহার, কারণ জানাল সদর দপ্তর সদ্য. একনেকে আড়াই লাখ কোটি টাকার তিন মেট্রোরেল প্রকল্প অনুমোদন সদ্য. পাঠ্যবইয়ে অন্তর্ভুক্ত হচ্ছে জিয়াউর রহমানের লেখা সদ্য. আন্তর্জাতিক জলসীমায় ভারত-পাকিস্তান নৌবাহিনীর জাহাজের মাঝে সংঘর্ষ সদ্য. সাজাপ্রাপ্ত পলাতক আসামিদের ফেরাতে ভারতের সুনির্দিষ্ট উত্তর নেই: পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী সদ্য. জয় বাংলা স্লোগান দিয়ে বিএনপি কার্যালয়ে হামলা-ভাঙচুর, আ. লীগ নেতার বাড়িতে আগুন সদ্য. মক্কায় ড্রোন হামলার অভিযোগকে ‘ডাহা মিথ্যা’ আখ্যা দিল হুতিরা সদ্য. সৌদিসহ মধ্যপ্রাচ্যের ৬ মুসলিম দেশের সঙ্গে ইসরায়েলের বৈঠক সদ্য. সরকারি চাকরিতে উচ্চতর গ্রেড পাওয়ার প্রক্রিয়ায় আসছে পরিবর্তন সদ্য. দেশের ৫ বিভাগে ভারী বর্ষণের আভাস সদ্য. গুলশান থানার ওসি প্রত্যাহার, কারণ জানাল সদর দপ্তর