ব্লুমবার্গের প্রতিবেদন /রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র যেভাবে বদলে দেবে বাংলাদেশের জ্বালানি খাত

A
Admin
২৫ জুলাই, ২০২৬ ১৬:৩৭:৩৩
পদ্মা নদীর তীরে নির্মাণাধীন রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র এখন শুধু একটি অবকাঠামো প্রকল্প নয়, বাংলাদেশের জ্বালানি নিরাপত্তা ও শিল্পায়নের ভবিষ্যৎ নিয়েও নতুন প্রত্যাশার প্রতীক। ২০২৮ সালে প্রকল্পটি পুরোপুরি চালু হলে রাশিয়ার সহায়তায় নির্মিত দুটি চুল্লি দেশের মোট বিদ্যুতের প্রায় ১৫ শতাংশ সরবরাহ করবে বলে আশা করা হচ্ছে।

বিশ্বজুড়ে জ্বালানি নিরাপত্তা, কার্বন নিঃসরণ কমানো এবং বিদ্যুতের ক্রমবর্ধমান চাহিদার প্রেক্ষাপটে উন্নয়নশীল দেশগুলোর কাছে পারমাণবিক শক্তি আবারও গুরুত্ব পাচ্ছে। বাংলাদেশের মতো দেশ জীবাশ্ম জ্বালানির ওপর নির্ভরতা কমিয়ে দীর্ঘমেয়াদি বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত করতে রূপপুর প্রকল্পকে একটি কৌশলগত বিনিয়োগ হিসেবে দেখছে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ইরান সংঘাত এবং রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের মতো ভূরাজনৈতিক ঘটনাগুলো দেখিয়ে দিয়েছে, জ্বালানি সরবরাহে বৈশ্বিক সংকট উন্নয়নশীল দেশগুলোকে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত করে। এ কারণে বিকল্প ও নির্ভরযোগ্য বিদ্যুৎ উৎস হিসেবে পারমাণবিক শক্তির গুরুত্ব আরও বেড়েছে।

তবে রূপপুর প্রকল্প বাস্তবায়নে সময় ও ব্যয় দুই ক্ষেত্রেই বড় চ্যালেঞ্জের মুখে পড়তে হয়েছে। ২ হাজার ৪০০ মেগাওয়াট ক্ষমতার এই কেন্দ্র নির্মাণে এক দশকের বেশি সময় লেগেছে। কোভিড-১৯ মহামারি, রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ এবং সাম্প্রতিক আঞ্চলিক সংঘাত প্রকল্পের অগ্রগতিকে প্রভাবিত করেছে। ফলে ২০২৩ সালে প্রথম ইউনিট চালুর যে লক্ষ্য ছিল, তা পিছিয়ে যায়।

নিউক্লিয়ার পাওয়ার প্ল্যান্ট কোম্পানি বাংলাদেশ লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. জাহেদুল হাসান জানিয়েছেন, প্রথম ইউনিট ২০২৭ সালের শুরুতে এবং দ্বিতীয় ইউনিট ২০২৮ সালে উৎপাদনে যাওয়ার আশা করা হচ্ছে।

প্রকল্পের ব্যয়ও উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। ওয়ার্ল্ড নিউক্লিয়ার অ্যাসোসিয়েশনের তথ্য অনুযায়ী, রাশিয়ার রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান রোসাটমের সঙ্গে চুক্তি অনুযায়ী প্রকল্পটির ব্যয় প্রায় ১২ দশমিক ৬৫ বিলিয়ন মার্কিন ডলার। তবে ডলারের বিপরীতে টাকার অবমূল্যায়নের কারণে স্থানীয় মুদ্রায় ব্যয় আগের অনুমোদিত হিসাবের তুলনায় প্রায় এক-চতুর্থাংশ বেড়েছে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের নিউক্লিয়ার ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের অধ্যাপক মো. শফিকুল ইসলাম বলেন, নির্ধারিত সময়ে প্রকল্প শেষ হলে অতিরিক্ত ব্যয় যেমন এড়ানো যেত, তেমনি জীবাশ্ম জ্বালানি আমদানির ব্যয়ও উল্লেখযোগ্যভাবে কমানো সম্ভব হতো।

অন্যদিকে প্রকল্প কর্তৃপক্ষের দাবি, দীর্ঘমেয়াদে বিদ্যুতের নিরবচ্ছিন্ন সরবরাহ, জ্বালানি নিরাপত্তা এবং উৎপাদন ব্যয়ের দিক থেকে রূপপুর দেশের জন্য লাভজনক বিনিয়োগ হবে।

রূপপুরের পাশাপাশি ভবিষ্যতের জ্বালানি পরিকল্পনায় ক্ষুদ্র মডুলার রিয়্যাক্টর ব্যবহারের সম্ভাবনাও বিবেচনা করছে সরকার। বিদ্যুৎ ও জ্বালানি মন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদের তথ্য অনুযায়ী, ৩০০ থেকে ৪০০ মেগাওয়াট উৎপাদনক্ষমতার এ ধরনের কেন্দ্র নির্মাণের বিষয়ে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে প্রাথমিক আলোচনা চলছে। সরকারের পরিকল্পনা, ভবিষ্যতে বড় আকারের কেন্দ্রের পরিবর্তে তুলনামূলক ছোট ও দ্রুত নির্মাণযোগ্য কেন্দ্রের দিকেই অগ্রসর হওয়া।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, পারমাণবিক বিদ্যুতের সবচেয়ে বড় সুবিধা হলো এটি নিরবচ্ছিন্ন, নির্ভরযোগ্য এবং কম কার্বন নিঃসরণকারী বিদ্যুৎ উৎপাদন করে। তবে উচ্চ প্রাথমিক বিনিয়োগ, দীর্ঘ নির্মাণকাল এবং ব্যয় বৃদ্ধির ঝুঁকি এখনো বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে রয়ে গেছে।

ইনস্টিটিউট ফর এনার্জি ইকোনমিক্স অ্যান্ড ফাইন্যান্স অ্যানালাইসিসের বাংলাদেশবিষয়ক প্রধান বিশ্লেষক শফিকুল আলমের মতে, রূপপুর চালু হলে আগামী পাঁচ থেকে সাত বছরে নতুন বেসলোড বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণের প্রয়োজন কমবে। এতে নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে বিনিয়োগ এবং জাতীয় বিদ্যুৎ সঞ্চালনব্যবস্থা আধুনিকায়নের সুযোগ বাড়বে।

তবে পারমাণবিক বিদ্যুৎ কর্মসূচি সফল করতে দক্ষ জনবল, কার্যকর ও স্বাধীন নিয়ন্ত্রক সংস্থা, জনসমর্থন এবং ব্যবহৃত পারমাণবিক জ্বালানির নিরাপদ ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্ব দিচ্ছেন বিশেষজ্ঞরা। তাঁদের মতে, নতুন প্রযুক্তি গ্রহণের ক্ষেত্রে উন্নয়নশীল দেশগুলোর সতর্ক থাকা প্রয়োজন, যাতে অপ্রমাণিত প্রযুক্তির পরীক্ষাক্ষেত্রে পরিণত হতে না হয়।

বিশ্বের পারমাণবিক প্রযুক্তির বাজার বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্র, রাশিয়া, চীন, ফ্রান্স ও দক্ষিণ কোরিয়ার মতো কয়েকটি দেশের নিয়ন্ত্রণে। নির্মাণাধীন অধিকাংশ নতুন রিয়্যাক্টরও এশিয়ায়, যেখানে চীন ও রাশিয়ার প্রভাব সবচেয়ে বেশি।

রোসাটমের মতে, উন্নয়নশীল দেশগুলোর জন্য পারমাণবিক বিদ্যুৎ শুধু জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করে না, বরং শিল্পায়ন, প্রকৌশল দক্ষতা ও বৈজ্ঞানিক সক্ষমতা বৃদ্ধিতেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। পাশাপাশি দীর্ঘমেয়াদি ঋণ সুবিধার কারণে প্রকল্পের প্রাথমিক আর্থিক চাপও তুলনামূলকভাবে কমানো সম্ভব হয়।

দক্ষিণ এশিয়ার আঞ্চলিক বাস্তবতাও বাংলাদেশের পারমাণবিক কর্মসূচিকে উৎসাহিত করছে। ভারত ২০৪৭ সালের মধ্যে ১০০ গিগাওয়াট পারমাণবিক বিদ্যুৎ উৎপাদনের লক্ষ্য নিয়েছে। অন্যদিকে পাকিস্তান ইতোমধ্যে চীনের সহায়তায় একাধিক পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র চালু করেছে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, রূপপুর প্রকল্প শুধু বিদ্যুৎ উৎপাদনের উদ্যোগ নয়; এটি বাংলাদেশের প্রযুক্তিগত সক্ষমতা, জ্বালানি নিরাপত্তা এবং দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক উন্নয়নের পথে একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক হিসেবেও বিবেচিত হচ্ছে।

ব্লুমবার্গের এই প্রতিবেদনটি প্রকাশ করেছে ভারতীয় সংবাদমাধ্যম দ্য হিন্দু বিজনেসলাইনও

মন্তব্য (0)

মন্তব্য করুন

এখনো কোনো মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্য করুন!

বিজ্ঞাপনের জন্য খালি স্পেস

শিরোনাম:
সদ্য. অবশেষে জারি হলো নতুন পে-স্কেলের প্রজ্ঞাপন সদ্য. আজ জাতীয় গ্রিডে যুক্ত হবে সাড়ে ১২ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস সদ্য. আজই হতে পারে পে-স্কেলের প্রজ্ঞাপন, নতুন কাঠামো নিয়ে যা জানা গেল সদ্য. অপ্রতিমের ময়নাতদন্ত সম্পন্ন, রোববার কুবিতে প্রথম জানাজা সদ্য. ঢাকার তিন স্থানে যাত্রীবাহী বাসে আগুন সদ্য. অপ্রতিম হত্যাকাণ্ডে কুবিতে আগামীকাল সাধারণ শোক, ক্লাস-পরীক্ষা স্থগিত সদ্য. স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর ছয় মাসের ‘সাফল্য’ তুলে ধরে হাসনাতের ফেসবুক পোস্ট সদ্য. অপ্রতিম হত্যার রহস্য উদঘাটনে মাঠে পাঁচ বাহিনী সদ্য. লং মার্চ থেকে ফেরার পথে সিরাজগঞ্জে জামায়াতের সাবেক ইউনিয়ন আমিরকে কুপিয়ে জখম, অভিযোগে বিএনপি সদ্য. শিক্ষিকার ছেলের হত্যাকাণ্ডে কুবি ছাত্রদলের শোক, দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি সদ্য. অবশেষে জারি হলো নতুন পে-স্কেলের প্রজ্ঞাপন সদ্য. আজ জাতীয় গ্রিডে যুক্ত হবে সাড়ে ১২ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস সদ্য. আজই হতে পারে পে-স্কেলের প্রজ্ঞাপন, নতুন কাঠামো নিয়ে যা জানা গেল সদ্য. অপ্রতিমের ময়নাতদন্ত সম্পন্ন, রোববার কুবিতে প্রথম জানাজা সদ্য. ঢাকার তিন স্থানে যাত্রীবাহী বাসে আগুন সদ্য. অপ্রতিম হত্যাকাণ্ডে কুবিতে আগামীকাল সাধারণ শোক, ক্লাস-পরীক্ষা স্থগিত সদ্য. স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর ছয় মাসের ‘সাফল্য’ তুলে ধরে হাসনাতের ফেসবুক পোস্ট সদ্য. অপ্রতিম হত্যার রহস্য উদঘাটনে মাঠে পাঁচ বাহিনী সদ্য. লং মার্চ থেকে ফেরার পথে সিরাজগঞ্জে জামায়াতের সাবেক ইউনিয়ন আমিরকে কুপিয়ে জখম, অভিযোগে বিএনপি সদ্য. শিক্ষিকার ছেলের হত্যাকাণ্ডে কুবি ছাত্রদলের শোক, দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি