এক যুগ আগেও একজন সাধারণ গাড়িচালক ছিলেন আবেদ আলী। হঠাৎই পাল্টে যায় সবকিছু। পিএসসির প্রশ্নফাঁসের চক্র গড়ে তুলে বনে যান অঢেল সম্পদের মালিক। সম্প্রতি আবেদের নেতৃত্বে পরিচালিত ৫৫ সদস্যের চক্রের পরিচয় পাওয়া গেছে।
আবেদ মাদারীপুরের ডাসার উপজেলার বোতলা গ্রামে গড়ে তোলেন আলিশান বাড়ি। এ ছাড়া ঢাকায় একাধিক বাড়ি, ফ্ল্যাটসহ নামে-বেনামে বিপুল সম্পদ রয়েছে তাঁর। তিনি আওয়ামী লীগের নেতা দাবি করে মাদারীপুরের ডাসার উপজেলা চেয়ারম্যান প্রার্থী হিসেবেও প্রচারণা চালান।
আবেদ আলী বছরের পর বছর পিএসসির প্রশ্নফাঁসের টাকায়ই গড়ে তুলেছেন অঢেল সম্পদ। সম্প্রতি এর আদ্যোপান্ত বেরিয়ে এসেছে এ-সংক্রান্ত মামলার চার্জশিটে। দীর্ঘ তদন্তের ভিত্তিতে ১৮ মে আদালতে জমা দেওয়া ৪১ পৃষ্ঠার চার্জশিটের পরতে পরতে রয়েছে চাঞ্চল্যকর নানা তথ্য। আলোচিত মামলাটি ২০২৪ সালের ৯ জুলাই রাজধানীর পল্টন থানায় দায়ের করা হয়।
তদন্তে উঠে এসেছে, পরীক্ষার আগেই নির্বাচিত প্রার্থীদের কাছে প্রশ্নসহ উত্তর পৌঁছে দেওয়া হতো। প্রার্থীদের নির্দিষ্ট স্থানে এনে প্রশ্ন ও উত্তর মুখস্থ করানো হতো। এরপর পরীক্ষার দিন তাঁদের কেন্দ্রে পাঠানো হতো। বিনিময়ে তারা মোটা অঙ্কের টাকা আগাম নিয়ে নিতেন। চক্রটির বিস্তার ছিল দেশের বিভিন্ন জেলায়। এতে সরকারি চাকরিজীবী, পিএসসির বর্তমান ও সাবেক কর্মকর্তা-কর্মচারী, ব্যবসায়ী, চিকিৎসাসংশ্লিষ্ট ব্যক্তি, শিক্ষার্থী এবং বিভিন্ন পেশার মানুষ যুক্ত ছিলেন বলে তদন্তে জানা গেছে। অভিযোগপত্রে বলা হয়েছে, নেটওয়ার্কটি বিজি প্রেস থেকে শুরু করে বিভিন্ন সরকারি প্রতিষ্ঠান এবং বেসরকারি এনজিও পর্যায় পর্যন্ত বিস্তৃত ছিল।
তদন্ত কর্মকর্তার মতে, প্রশ্নফাঁস কার্যক্রম পরিচালনায় সংঘবদ্ধ চক্রটি দীর্ঘ সময় সক্রিয় ছিল এবং তারা পরীক্ষার গোপনীয়তা ভেঙে রাষ্ট্রীয় নিয়োগব্যবস্থাকে প্রশ্নবিদ্ধ করেছে। চার্জশিটে বাংলাদেশ সরকারি কর্ম কমিশন আইন, ২০২৩-এর ১১ ও ১৫ ধারায় অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে বিচার চাওয়া হয়েছে। অভিযোগ প্রমাণিত হলে সর্বোচ্চ ১০ বছরের কারাদণ্ডের বিধান রয়েছে এই আইনে।
চক্রের কয়েকজন সদস্যের নামে-বেনামে বিপুল সম্পদের তথ্য পাওয়া গেছে। সেই সম্পদের উৎস যাচাই এবং সম্ভাব্য অর্থ পাচারের অনুসন্ধানে পৃথক উদ্যোগ নেওয়ার সুপারিশ করা হয়েছে। সংশ্লিষ্ট সূত্র বলছে, মানি লন্ডারিংয়ের বিষয়টি নিয়ে পৃথক তদন্ত শুরু হলে প্রশ্নফাঁস বাণিজ্যের আর্থিক পরিধি সম্পর্কে আরও বিস্তৃত তথ্য বেরিয়ে আসতে পারে।
চার্জশিটে বলা হয়েছে, এ চক্রের কর্মকাণ্ড ছিল রাষ্ট্রীয় নিয়োগব্যবস্থার বিরুদ্ধে সংঘটিত একটি সুপরিকল্পিত অপরাধ। আদালতে বিচার কার্যক্রম শুরু হলে প্রশ্নফাঁসের নেপথ্যে থাকা আরও প্রভাবশালী ব্যক্তি ও গোষ্ঠীর নাম সামনে আসতে পারে বলে সংশ্লিষ্টদের ধারণা।
প্রশ্নফাঁসচক্রের মূলহোতা আবেদের নেতৃত্বে পরিচালিত ৫৫ সদস্যের চক্রে ছিলেন পিএসসির কর্মকর্তা-কর্মচারী, বিভিন্ন সরকারি প্রতিষ্ঠানের কর্মচারী, ব্যবসায়ী, শিক্ষার্থী এবং পরীক্ষার্থী সংগ্রহকারী দালালচক্রের সদস্যরা।
এর মধ্যে গ্রেপ্তার ৩৬ আসামি হলেন— পিএসসির সাবেক গাড়িচালক সৈয়দ আবেদ আলী, মো. নোমান সিদ্দিক, মো. খলিলুর রহমান, পিএসসির অফিস সহায়ক সাজেদুল ইসলাম, ব্যবসায়ী আবু সোলেমান মো. সোহেল, জাহাঙ্গীর আলম, এস এম আলমগীর কবীর, প্রতিরক্ষা ও অর্থ বিভাগের অডিটর প্রিয়নাথ রায়, মো. জাহিদুল ইসলাম, পিএসসির উপপরিচালক (ডিডি) মো. আবু জাফর, মো. শাহাদাত হোসেন, ইমিগ্রেশন ও পাসপোর্ট অধিদপ্তরের অফিস সহকারী কাম-কম্পিউটার মুদ্রাক্ষরিক মো. মামুনুর রশিদ, সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মেডিকেল টেকনিশিয়ান নিয়ামুল হাসান, ব্যবসায়ী মো. সাখাওয়াত হোসেন, সাইম হোসেন, ড্যাফোডিলের শিক্ষার্থী লিটন সরকার, আবেদ আলীর ছেলে সৈয়দ সোহানুর রহমান সিয়াম, পিএসসির সাবেক সহকারী পরিচালক নিখিল চন্দ্র রায়, মো. শরীফুল ইসলাম ভূঁইয়া, দীপক বণিক, মো. খোরশেদ আলম খোকন, কাজী মো. সুমন, এ কে এম গোলাম পারভেজ, মেহেদী হাসান খান, মো. মিজানুর রহমান, আতিকুল ইসলাম, এটিএম মোস্তফা, মাহফুজ কালু, মো. আসলাম হোসেন, কৌশিক দেবনাথ, মোজাহিদুল ইসলাম, মজনু মিয়া, মোহাম্মদ আকরাম হোসেন, মো. আব্দুল আজিম, রূপন চন্দ্র দাস ও মাহামুদ হাসান মান্না।
পলাতক ১৯ আসামি হলেন— সুমন কুমার বসু, বিপাশ চাকমা, মো. দেলোয়ার হোসাইন, মোহাম্মদ মাহবুবুর রহমান দীপু, মো. শহিদুল ইসলাম, মো. আল মামুন, মো. আনিছুর রহমান, মো. ওয়াসিম খান, মো. জসিম উদ্দিন, মো. ফেরদৌস আহম্মদ, মো. মান্নান উদ্দিন, মো. আশরাফুল আলম, জাহিদুল সরদার, মো. সোহেল পারভেজ, মো. জুয়েল আল মামুন, মো. বিল্লাল হোসেন, মো. রুবেল শরীফ, শাকের আহমেদ আল-আমিন এবং এম এম নাজমুল হাসান। তাঁদের বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারির আবেদন করা হয়েছে। সূত্র: বাংলাদেশ টাইমস