৩২ ডিসি ও রিটার্নিং কর্মকর্তাদের বাধ্যতামূলক অবসরের শঙ্কা

A
Admin
২৫ জুলাই, ২০২৬ ১৬:৩৭:৩২

সরকারি চাকরি আইন অনুযায়ী, ২৫ বছর চাকরি পূর্ণ হওয়ার পর জনস্বার্থে যে কোনো কর্মকর্তাকে বাধ্যতামূলক অবসরে পাঠানোর সুযোগ রয়েছে।

বিসিএস (প্রশাসন) ২০তম ব্যাচের কর্মকর্তাদের চাকরির ২৫ বছর পূর্ণ হয়েছে গত ২৮ মে। এই ব্যাচের অন্তত ৩২ জন কর্মকর্তা ২০১৮ সালের একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে জেলা প্রশাসক (ডিসি) ও রিটার্নিং কর্মকর্তার দায়িত্ব পালন করেছিলেন।

আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে অনুষ্ঠিত ওই নির্বাচন দেশের ইতিহাসে অন্যতম বিতর্কিত নির্বাচন হিসেবে আলোচিত। নির্বাচনের পর এসব কর্মকর্তার প্রায় সবাই যুগ্ম সচিব পদে পদোন্নতি পান।

কিন্তু ২০২৪ সালের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর তাদের প্রায় সবাইকে সক্রিয় দায়িত্ব থেকে সরিয়ে জনপ্রশাসনে বিশেষ ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওএসডি) করা হয়। এখন চাকরির ২৫ বছর পূর্ণ হওয়ার পর তাদের ব্যাপারে কী পদক্ষেপ নেওয়া যেতে পারে, তা নিয়ে সরকারের বিভিন্ন পর্যায়ে আলোচনা চলছে।

২০১৮ সালের সংসদ নির্বাচনে ডিসি ও রিটার্নিং কর্মকর্তার দায়িত্ব পালন করেছিলেন ২০তম ব্যাচের এই কর্মকর্তারা।

এই কর্মকর্তাদের বাধ্যতামূলক অবসরে পাঠানো হবে, নাকি সরকার তাদের অভিজ্ঞতাকে বিশেষভাবে কাজে লাগাবে—তা নিয়ে জনপ্রশাসন বিশেষজ্ঞদের মধ্যেও মতদ্বৈধতা দেখা দিয়েছে।

প্রশাসনের একটি অংশ মনে করছে, ২০১৮ সালের নির্বাচনের সময় দায়িত্বে থাকা কর্মকর্তাদের বিষয়ে রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক মূল্যায়ন প্রয়োজন। অন্যদিকে আরেকটি অংশের মতে, দীর্ঘ প্রশাসনিক অভিজ্ঞতাসম্পন্ন কর্মকর্তাদের একযোগে অবসরে পাঠানো রাষ্ট্রের জন্য লাভজনক নাও হতে পারে। তা ছাড়া তাদের অবসরে পাঠালে সরকারকে একসঙ্গে বিপুল অর্থ ব্যয় করতে হবে।

এর আগে ১৭ ও ১৮ ব্যাচের কয়েকজন কর্মকর্তাকে চাকরির ২৫ বছর পূর্ণ হওয়ার পর বাধ্যতামূলক অবসরে পাঠানো হয়। গত ২৮ মে চাকরির ২৫ বছর পূর্ণ হওয়ায় ২০তম ব্যাচের কর্মকর্তাদের মধ্যেও একই ধরনের আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। ইতোমধ্যে প্রশাসনের একটি গ্রুপ তাদের বাধ্যতামূলক অবসরে পাঠানোর জন্য সক্রিয় হয়ে উঠেছে।

এ ব্যাপারে প্রশাসনের দায়িত্বশীল এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, “২০১৮ সালের নির্বাচনে মাঠ প্রশাসনের ভূমিকা নিয়ে সরকারের ভেতরে আলোচনা রয়েছে। তাদের ভূমিকা ও কার্যক্রম কী ছিল, সেসব বিষয় নথিপত্রের আলোকে পর্যালোচনা করা হচ্ছে।”

তবে তিনি একই সঙ্গে বলেন, “সরকারি কর্মকর্তারা মূলত রাষ্ট্রের নির্দেশনা বাস্তবায়ন করেন। রাজনৈতিক সিদ্ধান্তের দায় পুরোপুরি প্রশাসনের ওপর বর্তালে ভবিষ্যতে মাঠপর্যায়ে সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নে নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে। অনেক কর্মকর্তাই তখন মাঠ প্রশাসনে কাজ করার আগ্রহ হারিয়ে ফেলবেন।”

প্রশাসনের একাধিক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা মনে করেন, ওএসডি অবস্থায় দীর্ঘদিন ধরে কর্মকর্তাদের বসিয়ে রাখা যেমন কার্যকর নয়, তেমনি একযোগে বিপুলসংখ্যক কর্মকর্তাকে অবসরে পাঠানোও বাস্তবসম্মত সমাধান নয়।

এ প্রসঙ্গে সাবেক সচিব ও জনপ্রশাসন বিশেষজ্ঞ আনোয়ার ফারুক প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, “প্রশাসনে জবাবদিহি অবশ্যই থাকতে হবে। কিন্তু জবাবদিহি ও প্রতিশোধমূলক ব্যবস্থা এক বিষয় নয়। যদি কোনো কর্মকর্তার বিরুদ্ধে নির্দিষ্ট অভিযোগ বা প্রমাণ থাকে, তাহলে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া যেতে পারে। কিন্তু কেবল একটি সময়ের দায়িত্ব পালনের কারণে পুরো গ্রুপকে অবসরে পাঠানোর সিদ্ধান্ত প্রশাসনের জন্য ইতিবাচক বার্তা নাও দিতে পারে।”

তিনি বলেন, “রাষ্ট্রের সবচেয়ে বড় সম্পদ দক্ষ মানবসম্পদ। দীর্ঘ অভিজ্ঞতাসম্পন্ন কর্মকর্তাদের যোগ্যতা ও সক্ষমতা বিবেচনায় নিয়ে উপযুক্ত দায়িত্বে কাজে লাগানো রাষ্ট্রের জন্য বেশি ফলপ্রসূ হতে পারে।”

২০১৮ সালের ৩০ ডিসেম্বর অনুষ্ঠিত একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন নিয়ে ভোটগ্রহণের দিন থেকেই ব্যাপক অভিযোগ ওঠে। বিরোধী রাজনৈতিক দল, নাগরিক সমাজ এবং আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকদের একটি অংশ ভোটের আগের রাতে ব্যালট বাক্স ভর্তি করা, বিরোধী দলের এজেন্টদের কেন্দ্র থেকে বের করে দেওয়া এবং ভোটারদের ভোটাধিকার প্রয়োগে বাধা দেওয়ার অভিযোগ তোলে।

যদিও নির্বাচন কমিশন এবং তৎকালীন সরকার এসব অভিযোগ অস্বীকার করেছিল। কিন্তু পরে কমিশনের ভূমিকার পাশাপাশি মাঠ প্রশাসনের নিরপেক্ষতা নিয়েও প্রশ্ন ওঠে। নির্বাচনপূর্ব সময়ে ডিসিদের রিটার্নিং কর্মকর্তা হিসেবে নিয়োগের বৈধতা নিয়ে আদালতেও রিট হয়।

বিশ্লেষকেরা মনে করেন, অনেক কর্মকর্তাই হয়তো ২০১৮ সালের নির্বাচনের দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে ব্যক্তিগতভাবে দ্বিধায় ছিলেন। কিন্তু বাস্তবতা হলো, প্রশাসনিক কাঠামোয় আদেশ অমান্য করার সংস্কৃতি নেই। ফলে পুরো ব্যবস্থাই একধরনের রাজনৈতিক দায়ের মধ্যে পড়ে গেছে।

তারা বলছেন, প্রশাসন নিরপেক্ষতা হারালে নির্বাচন কমিশনের সাংবিধানিক সক্ষমতাও কার্যত দুর্বল হয়ে পড়ে। বিশেষ করে ডিসি ও এসপিরা যখন একই সঙ্গে আইনশৃঙ্খলা, মাঠ প্রশাসন ও নির্বাচনি ব্যবস্থাপনার কেন্দ্রে থাকেন, তখন তাদের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। তবে রাষ্ট্রের সবচেয়ে বড় শক্তি প্রশাসনের নিরপেক্ষতা। যদি কর্মকর্তারা মনে করেন, রাজনৈতিক আনুগত্যই টিকে থাকার একমাত্র পথ, তাহলে ভবিষ্যতের নির্বাচনগুলোতেও একই সংকট ফিরে আসবে।

প্রশাসনের একটি অংশ বলছে, অতীতের বিতর্কিত অধ্যায়ের সঙ্গে যুক্ত কর্মকর্তাদের বিষয়ে সিদ্ধান্ত নিতে গিয়ে সরকার রাজনৈতিক বার্তা দিতে চাইতে পারে। অন্য অংশের মতে, রাষ্ট্রীয় স্বার্থে অভিজ্ঞ কর্মকর্তাদের দক্ষতা কাজে লাগানোই হবে অধিকতর বাস্তবসম্মত সিদ্ধান্ত।

ফলে এখন সবার দৃষ্টি জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় ও সরকারের পরবর্তী সিদ্ধান্তের দিকে। কারণ, এই সিদ্ধান্ত শুধু কয়েকজন কর্মকর্তার চাকরি-ভাগ্য নির্ধারণ করবে না; বরং ভবিষ্যতে প্রশাসন রাজনৈতিক নির্দেশনা, পেশাগত দায়বদ্ধতা এবং ব্যক্তিগত ঝুঁকির প্রশ্নকে কীভাবে দেখবে, সে সম্পর্কেও একটি গুরুত্বপূর্ণ বার্তা দেবে।

সূত্র:  প্রতিদিনের বাংলাদেশ

মন্তব্য (0)

মন্তব্য করুন

এখনো কোনো মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্য করুন!

বিজ্ঞাপনের জন্য খালি স্পেস

শিরোনাম:
সদ্য. অবশেষে জারি হলো নতুন পে-স্কেলের প্রজ্ঞাপন সদ্য. আজ জাতীয় গ্রিডে যুক্ত হবে সাড়ে ১২ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস সদ্য. আজই হতে পারে পে-স্কেলের প্রজ্ঞাপন, নতুন কাঠামো নিয়ে যা জানা গেল সদ্য. অপ্রতিমের ময়নাতদন্ত সম্পন্ন, রোববার কুবিতে প্রথম জানাজা সদ্য. ঢাকার তিন স্থানে যাত্রীবাহী বাসে আগুন সদ্য. অপ্রতিম হত্যাকাণ্ডে কুবিতে আগামীকাল সাধারণ শোক, ক্লাস-পরীক্ষা স্থগিত সদ্য. স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর ছয় মাসের ‘সাফল্য’ তুলে ধরে হাসনাতের ফেসবুক পোস্ট সদ্য. অপ্রতিম হত্যার রহস্য উদঘাটনে মাঠে পাঁচ বাহিনী সদ্য. লং মার্চ থেকে ফেরার পথে সিরাজগঞ্জে জামায়াতের সাবেক ইউনিয়ন আমিরকে কুপিয়ে জখম, অভিযোগে বিএনপি সদ্য. শিক্ষিকার ছেলের হত্যাকাণ্ডে কুবি ছাত্রদলের শোক, দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি সদ্য. অবশেষে জারি হলো নতুন পে-স্কেলের প্রজ্ঞাপন সদ্য. আজ জাতীয় গ্রিডে যুক্ত হবে সাড়ে ১২ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস সদ্য. আজই হতে পারে পে-স্কেলের প্রজ্ঞাপন, নতুন কাঠামো নিয়ে যা জানা গেল সদ্য. অপ্রতিমের ময়নাতদন্ত সম্পন্ন, রোববার কুবিতে প্রথম জানাজা সদ্য. ঢাকার তিন স্থানে যাত্রীবাহী বাসে আগুন সদ্য. অপ্রতিম হত্যাকাণ্ডে কুবিতে আগামীকাল সাধারণ শোক, ক্লাস-পরীক্ষা স্থগিত সদ্য. স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর ছয় মাসের ‘সাফল্য’ তুলে ধরে হাসনাতের ফেসবুক পোস্ট সদ্য. অপ্রতিম হত্যার রহস্য উদঘাটনে মাঠে পাঁচ বাহিনী সদ্য. লং মার্চ থেকে ফেরার পথে সিরাজগঞ্জে জামায়াতের সাবেক ইউনিয়ন আমিরকে কুপিয়ে জখম, অভিযোগে বিএনপি সদ্য. শিক্ষিকার ছেলের হত্যাকাণ্ডে কুবি ছাত্রদলের শোক, দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি