ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন–পরবর্তী সময়ে দেশে শান্তি ও শৃঙ্খলা অক্ষুণ্ন রাখাকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমান। তিনি স্পষ্ট করে বলেন, যেকোনো মূল্যে আইনশৃঙ্খলা স্বাভাবিক রাখতে হবে এবং সহিংসতা, প্রতিশোধ কিংবা উসকানিমূলক কোনো কর্মকাণ্ড কোনোভাবেই সহ্য করা হবে না।
শনিবার বিকেলে রাজধানীর হোটেল ইন্টারকন্টিনেন্টাল–এ আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে তিনি এসব কথা বলেন। এ সময় নেতা-কর্মীদের শান্ত ও সতর্ক থাকার আহ্বান জানিয়ে তারেক রহমান বলেন, নির্বাচনী প্রতিদ্বন্দ্বিতার কারণে কোথাও কোথাও ভুল–বোঝাবুঝি বা উত্তেজনা সৃষ্টি হয়ে থাকতে পারে, তবে তা যেন কখনোই প্রতিহিংসা বা প্রতিশোধে রূপ না নেয়।
তিনি বলেন, যেকোনো পরিস্থিতিতেই ন্যায়পরায়ণতাই হবে আদর্শ। কোনো ধরনের অন্যায় বা বেআইনি কর্মকাণ্ড বরদাশত করা হবে না। দলমত, ধর্ম-বর্ণ কিংবা ভিন্নমত—কোনো অজুহাতেই দুর্বলের ওপর সবলের আক্রমণ মেনে নেওয়া হবে না। আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা না হলে সব প্রচেষ্টা ব্যর্থ হবে উল্লেখ করে তিনি বলেন, সরকারি দল হোক বা বিরোধী দল—আইন সবার জন্যই সমান এবং তার প্রয়োগ হবে বিধিবদ্ধ নিয়মে।
নির্বাচনে নিরঙ্কুশ বিজয়ের পর এটিই ছিল তারেক রহমানের প্রথম সংবাদ সম্মেলন। দেশি-বিদেশি সাংবাদিকদের উপস্থিতিতে আয়োজিত এ অনুষ্ঠানে বিএনপির জ্যেষ্ঠ নেতারা উপস্থিত ছিলেন। সূচনা বক্তব্য দেন দলের মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর এবং সমাপনী বক্তব্য রাখেন স্থায়ী কমিটির সদস্য নজরুল ইসলাম খান।
আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা ছাড়া গণতন্ত্র টেকসই হয় না—এ কথা পুনর্ব্যক্ত করে তারেক রহমান বলেন, নির্বাচন–পরবর্তী সময়ে কেউ যেন সুযোগ নিয়ে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করতে না পারে, সে বিষয়ে সবাইকে সজাগ থাকতে হবে।
বিএনপিকে বিজয়ী করায় দেশবাসীকে অভিনন্দন জানিয়ে তিনি বলেন, এ বিজয় কোনো দলের একক নয়—এটি বাংলাদেশের, গণতন্ত্রের এবং গণতন্ত্রকামী জনগণের জয়। আজ থেকে সবাই নতুনভাবে স্বাধীনতার স্বাদ পাচ্ছে বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
তিনি আরও বলেন, ফ্যাসিবাদের রেখে যাওয়া ভঙ্গুর অর্থনীতি, দুর্বল আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি এবং অকার্যকর করে দেওয়া সাংবিধানিক ও বিধিবদ্ধ প্রতিষ্ঠান—এমন বাস্তবতার মধ্য দিয়েই নতুন যাত্রা শুরু হচ্ছে। দীর্ঘ দেড় দশকের বেশি সময় পর জনগণের সরাসরি ভোটে দায়বদ্ধ সংসদ ও সরকার প্রতিষ্ঠিত হতে যাচ্ছে উল্লেখ করে তিনি সবাইকে ঐক্যবদ্ধ থাকার আহ্বান জানান, যাতে কোনো অপশক্তি দেশে আবার ফ্যাসিবাদ কায়েম করতে না পারে বা দেশকে তাঁবেদার রাষ্ট্রে পরিণত করতে না পারে।
নির্বাচনে অংশ নেওয়া জামায়াতে ইসলামী, এনসিপি, ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ সহ সব রাজনৈতিক দলকে আন্তরিক অভিনন্দন জানান তারেক রহমান। তিনি বলেন, দেশ গঠনে সবার ভাবনা গুরুত্বপূর্ণ। পথ ও মত আলাদা হলেও দেশের স্বার্থে সবাই এক—জাতীয় ঐক্যই শক্তি, বিভাজন দুর্বলতা।
গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে রাজনৈতিক দলগুলোকেই গণতন্ত্রের বাতিঘর আখ্যা দিয়ে তিনি বলেন, সরকার ও বিরোধী দল নিজ নিজ অবস্থান থেকে দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করলে দেশে গণতন্ত্র প্রাতিষ্ঠানিক রূপ পাবে।
শান্তিপূর্ণভাবে একটি অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচন সম্পন্ন হওয়ায় নির্বাচন কমিশন, প্রশাসন ও অন্তর্বর্তীকালীন সরকারসহ সংশ্লিষ্ট সবাইকে বিশেষ ধন্যবাদ জানান বিএনপির চেয়ারম্যান।
রাষ্ট্র মেরামতের অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত করে তিনি বলেন, জনগণের রায় পেলে বিএনপি যে রাষ্ট্র সংস্কারের রূপরেখা দিয়েছে, তা অন্যান্য গণতান্ত্রিক দল ও জনগণের সঙ্গে মতবিনিময়ের মাধ্যমে প্রণীত ৩১ দফার আলোকে পর্যায়ক্রমে বাস্তবায়ন করা হবে। দলীয় ইশতেহার এবং জুলাই সনদে দেওয়া প্রতিশ্রুতির প্রতিও বিএনপি অঙ্গীকারবদ্ধ থাকবে।
দলের চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়া’কে স্মরণ করে তারেক রহমান বলেন, এমন আনন্দঘন মুহূর্তে তাঁর অনুপস্থিতি সবাইকে ভারাক্রান্ত করে। জনগণের অধিকার ও গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার সংগ্রামে তিনি আপসহীন ছিলেন এবং স্বৈরাচার কিংবা ফ্যাসিবাদের সঙ্গে কখনোই আপস করেননি বলে মন্তব্য করেন তিনি।
শেষে বিএনপির সর্বস্তরের নেতা-কর্মী ও সমর্থকদের ধন্যবাদ জানিয়ে তারেক রহমান বলেন, শত নির্যাতন–নিপীড়নের মধ্যেও তারা রাজপথ ছাড়েননি। এবার দেশ গড়ার পালা উল্লেখ করে তিনি সবাইকে দায়িত্বশীল আচরণের আহ্বান জানান এবং শত উসকানির মুখেও শান্ত থাকার নির্দেশ দেন। বক্তব্য শেষে তিনি দেশি-বিদেশি সাংবাদিকদের বিভিন্ন প্রশ্নের জবাব দেন।