রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন এলাকায় নারীদের মধ্যে মাদক গ্রহণের প্রবণতা বাড়ছে বলে সংশ্লিষ্টদের পর্যবেক্ষণে উঠে এসেছে। গাঁজা, ইয়াবা ও ই-সিগারেটের পাশাপাশি মদেও আসক্ত হয়ে পড়ছেন কিছু তরুণী। মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছর মদ পানের পারমিট বা লাইসেন্সের জন্য এক হাজারের বেশি নারী আবেদন করেছেন।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, নারীদের মাদকাসক্তি শুধু ব্যক্তিগত পর্যায়েই নয়, এর প্রভাব পরিবার ও ভবিষ্যৎ প্রজন্মের ওপরও পড়তে পারে। বিশেষ করে মাদকাসক্ত নারীর গর্ভধারণের ক্ষেত্রে নানা ধরনের স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি হতে পারে। পাশাপাশি সামাজিক সংকোচ ও পারিবারিক কারণে অনেক নারী সময়মতো চিকিৎসার আওতায় আসেন না।
মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০২০ সাল থেকে চলতি বছরের ৩০ জুন পর্যন্ত সরকারি মাদকাসক্তি নিরাময়কেন্দ্রগুলোতে ৩ হাজার ১০৬ জন নারী চিকিৎসা নিয়েছেন। তবে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, সরকারি কেন্দ্রের পরিসংখ্যানের বাইরে বেসরকারি চিকিৎসাকেন্দ্রে চিকিৎসা নেওয়া নারীর সংখ্যা আরও বেশি।
রাজধানীর বেশকিছু নারী মাদকাসক্তি নিরাময়কেন্দ্রে বর্তমানে কয়েক ডজন নারী চিকিৎসাধীন রয়েছেন। তাদের মধ্যে ইয়াবায় আসক্ত নারীর সংখ্যাই বেশি। চিকিৎসাধীনদের মধ্যে শিক্ষার্থী, চিকিৎসক, গৃহিণী, ব্যবসায়ী ও বিভিন্ন পেশার নারী রয়েছেন। এতে সমাজের বিভিন্ন শ্রেণি-পেশায় মাদকের বিস্তারের বিষয়টি স্পষ্ট হচ্ছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
চিকিৎসাকেন্দ্রের সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, পারিবারিক অশান্তি, দাম্পত্য কলহ, হতাশা, অসৎ সঙ্গ ও মাদকে আসক্ত বন্ধু বা স্বজনের প্রভাবে অনেক নারী নেশায় জড়িয়ে পড়ছেন। অল্প বয়সে বিয়ে, পারিবারিক বিচ্ছেদ কিংবা নানা মানসিক চাপও কারও কারও ক্ষেত্রে মাদকের দিকে ঝুঁকে পড়ার কারণ হয়ে উঠছে।
বিশেষজ্ঞরা আরও বলছেন, ইয়াবা নিয়ে নারীদের মধ্যে একটি বিপজ্জনক ভুল ধারণা রয়েছে। শরীরের ওজন কমানোর আশায় কেউ কেউ ইয়াবা সেবন শুরু করেন। এতে সাময়িকভাবে ক্ষুধা কমে ওজন কমতে পারে, কিন্তু দীর্ঘমেয়াদে মারাত্মক শারীরিক ও মানসিক জটিলতা তৈরি হতে পারে।
এদিকে নারীদের মধ্যে মদ সেবনের প্রবণতা নিয়েও আলোচনা রয়েছে। নারকোটিক্সের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের ৩০ জুন পর্যন্ত সাত শতাধিক নারীর নামে মদ পানের পারমিট ইস্যু করা হয়েছে। আরও কয়েকশ আবেদন প্রক্রিয়াধীন রয়েছে বলে জানা গেছে।
রাজধানীর গুলশান, উত্তরা ও তেজগাঁও এলাকায় নারী মদসেবীদের পারমিটের সংখ্যা তুলনামূলক বেশি। চলতি বছর ৩০ জুন পর্যন্ত গুলশানে ২৮৮, উত্তরায় ২০৭ এবং তেজগাঁওয়ে ৬২ জন নারী পারমিট পেয়েছেন। রাজধানীর আরও কয়েকটি এলাকা থেকেও নারীরা পারমিটের জন্য আবেদন করেছেন।
তবে পারমিট পাওয়ার প্রক্রিয়া নিয়ে প্রশ্নও রয়েছে। সংশ্লিষ্টদের অভিযোগ, চিকিৎসার প্রয়োজন দেখিয়ে কেউ কেউ অ্যালকোহল গ্রহণের অনুমতি নিচ্ছেন। ভুয়া বা নামসর্বস্ব চিকিৎসকের ব্যবস্থাপত্র ব্যবহার করে পারমিট নেওয়ার অভিযোগও রয়েছে। এ ক্ষেত্রে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের কিছু অসাধু কর্মকর্তার যোগসাজশের অভিযোগ উঠলেও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কার্যকর নজরদারি প্রয়োজন বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
দেশের একটি নারী মাদকাসক্তি নিরাময়কেন্দ্রের পরামর্শকের মতে, শিক্ষিত তরুণীদের মধ্যেও মাদক গ্রহণের প্রবণতা বাড়ছে। বিশেষ করে মদ ও ইয়াবার প্রতি তাদের একটি অংশের আসক্তি তৈরি হচ্ছে। বিভিন্ন বয়সী নারী বর্তমানে মাদকাসক্তির চিকিৎসা নিতে আসছেন বলেও জানান তিনি।
মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা বলছেন, নারীদের মাদকের দিকে ঝুঁকে পড়ার পেছনে পারিবারিক পরিবেশ, অসৎ সঙ্গ, বন্ধু বা স্বামীর প্রভাবসহ নানা কারণ কাজ করে। পরিবারের কোনো সদস্য নিয়মিত ধূমপান বা অ্যালকোহল গ্রহণ করলে অন্য সদস্যদের মধ্যেও এর প্রভাব পড়তে পারে।
সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, নারীদের মাদকাসক্তি প্রতিরোধে শুধু আইন প্রয়োগ যথেষ্ট নয়। পারিবারিক সচেতনতা বাড়ানোর পাশাপাশি সহজলভ্য চিকিৎসা, কাউন্সেলিং এবং পুনর্বাসনের সুযোগ বাড়ানো জরুরি। একই সঙ্গে মাদক ও অ্যালকোহলের পারমিট দেওয়ার প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা গেলে অপব্যবহারের সুযোগও কমানো সম্ভব।
সদ্য সংবাদ/এসকে