কুমিল্লায় সপ্তম শ্রেণির শিক্ষার্থী জান্নাতুল তাজমিন হত্যা মামলার তদন্তে একাধিক ব্যক্তির সম্পৃক্ততার তথ্য পাওয়ার কথা জানিয়েছে পুলিশ। নিহত শিক্ষার্থীর ব্যবহৃত আইফোন উদ্ধার, কললিস্ট পর্যালোচনা এবং তথ্যপ্রযুক্তির সহায়তায় তদন্তে অগ্রগতি হয়েছে। এ ঘটনায় গ্রেপ্তার সিএনজিচালিত অটোরিকশাচালক মো. সুমনকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে। অন্যদের শনাক্ত ও গ্রেপ্তারের জন্যও অভিযান চালানো হচ্ছে।
শুক্রবার (৯ অক্টোবর) সন্ধ্যায় কুমিল্লার পুলিশ সুপার মো. আনিসুজ্জামান এসব তথ্য জানান। তিনি বলেন, হত্যাকাণ্ডের সম্ভাব্য উদ্দেশ্য সম্পর্কে পুলিশ অনেকটাই নিশ্চিত হয়েছে। সুমনকে জিজ্ঞাসাবাদ করে বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পাওয়া গেছে। তাজমিনের মুঠোফোনের কললিস্ট ও প্রযুক্তিগত তথ্য বিশ্লেষণ করেও আরও কয়েকজনের সংশ্লিষ্টতার তথ্য মিলেছে। তাঁদের গ্রেপ্তারে অভিযান চলছে।
পুলিশ সুপার আরও জানান, এ বিষয়ে বিস্তারিত তথ্য শনিবার সকাল ১০টায় সংবাদ সম্মেলনের মাধ্যমে জানানো হবে।
পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, গত ৪ অক্টোবর বাসা থেকে বের হওয়ার পর নিখোঁজ হয় তাজমিন। পরিবারের সদস্যদের ভাষ্য, বান্ধবীর বাড়িতে বেড়াতে যাওয়ার কথা বলে সে বাসা ছেড়েছিল। পরে তার মুঠোফোনের কললিস্ট বিশ্লেষণ করে পুলিশ জানতে পারে, ওই দিন সে ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় গিয়েছিল। পরদিন কুমিল্লায় ফিরে আবার কক্সবাজারের উদ্দেশে রওনা হয়।
তদন্তসংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, ৭ অক্টোবর দুপুর সাড়ে ১২টার দিকে কক্সবাজার থেকে যাত্রা শুরু করে তাজমিন। ওই দিন রাতে কুমিল্লার পদুয়ার বাজার এলাকায় নূরজাহান হোটেলের সামনে গাড়ি থেকে নামে সে। সিসিটিভি ফুটেজে তাকে একা নামতে দেখা গেছে। পরবর্তী সময়ে আশপাশের বিভিন্ন ক্যামেরার ফুটেজে হাতে মুঠোফোন ও কাঁধে ভ্যানিটি ব্যাগ নিয়ে তাকে চলাফেরা করতে দেখা যায়। একপর্যায়ে সে সড়কের দিকে চলে যায়। এরপর তার অবস্থান সম্পর্কে নিশ্চিত হওয়ার মতো কোনো ফুটেজ পাওয়া যায়নি।
শুক্রবার বিকেলে অটোরিকশাচালক সুমনের দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে তাজমিনের ব্যবহৃত আইফোনটি উদ্ধার করা হয়। ফোনের কললিস্ট, যোগাযোগের বিবরণ এবং অন্যান্য ডিজিটাল তথ্য খতিয়ে দেখছেন তদন্তকারীরা। একই সঙ্গে বিভিন্ন এলাকার সিসিটিভি ফুটেজও বিশ্লেষণ করা হচ্ছে।
তবে ফোনের তথ্য থেকে ঠিক কী জানা গেছে, হত্যাকাণ্ডে কারা জড়িত কিংবা কী উদ্দেশ্যে এ ঘটনা ঘটানো হয়েছে, সে বিষয়ে বিস্তারিত প্রকাশ করেনি পুলিশ।
গত বৃহস্পতিবার (৮ অক্টোবর) সকালে কুমিল্লার লালমাই উপজেলার পেরুল উত্তর ইউনিয়নের জগৎপুর গ্রামের একটি ফসলি জমি থেকে তাজমিনের মরদেহ উদ্ধার করা হয়। ঘটনাস্থলের পাশেই পরিত্যক্ত অবস্থায় একটি সিএনজিচালিত অটোরিকশা পায় পুলিশ।
গাড়িটির নিবন্ধনসংক্রান্ত তথ্য যাচাই করে এর মালিক হিসেবে লালমাই উপজেলার আবুল হাসেমকে শনাক্ত করা হয়। বৃহস্পতিবার রাতে তাঁকে জিজ্ঞাসাবাদ করলে তিনি জানান, অটোরিকশাটি ভাড়ায় চালাতেন মো. সুমন। তিনি লালমাই উপজেলার বাগমারা ইউনিয়নের জয়নগর এলাকায় শ্বশুরবাড়িতে থাকতেন।
এরপর সুমনের সন্ধানে অভিযান চালিয়ে শুক্রবার চট্টগ্রাম থেকে তাঁকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। তাঁর দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ওই দিন বিকেলেই তাজমিনের আইফোন উদ্ধার করা হয়।
সুমনের বাড়ি চাঁদপুরের কচুয়া উপজেলায়। কয়েক বছর আগে বিয়ের পর তিনি ঘরজামাই হিসেবে লালমাইয়ের জয়নগর গ্রামে বসবাস শুরু করেন। প্রায় এক মাস আগে পারিবারিক বিরোধের জেরে শ্বশুরবাড়ি ছেড়ে চলে যান বলে জানা গেছে।
তবে হত্যাকাণ্ডে সুমনের সুনির্দিষ্ট ভূমিকা কী ছিল এবং অন্য কেউ এতে সরাসরি জড়িত কি না, সে বিষয়ে তদন্ত এখনো শেষ হয়নি।
স্থানীয় বাসিন্দা আবু তাহের জানান, ঘটনার খবর পেয়ে তিনি ঘটনাস্থলের কাছে যান। সেখানে ধানক্ষেতের পাশে একটি সিএনজিচালিত অটোরিকশা পড়ে থাকতে দেখেন। আশপাশের জমিতে দৌড়াদৌড়ি ও ধস্তাধস্তির চিহ্ন ছিল বলেও দাবি করেন তিনি।
আবু তাহেরের ভাষ্য, জমিতে থাকা চিহ্ন অনুসরণ করে সামনের একটি ধানক্ষেতে নারীর মরদেহ দেখতে পান তিনি। পরে জাতীয় জরুরি সেবা ৯৯৯-এ ফোন করে পুলিশকে বিষয়টি জানান। খবর পেয়ে পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়ে মরদেহ উদ্ধার করে।
এ ঘটনায় বৃহস্পতিবার রাতে তাজমিনের বাবা আবদুল আলীম লালমাই থানায় অজ্ঞাতনামা ব্যক্তিদের আসামি করে হত্যা মামলা করেন।
তাজমিনের ব্রাহ্মণবাড়িয়া ও কক্সবাজারে যাওয়ার উদ্দেশ্য কী ছিল, সেখানে কারও সঙ্গে তার সাক্ষাৎ হয়েছিল কি না এবং কুমিল্লায় ফেরার পর কারও সঙ্গে যোগাযোগ হয়েছিল কি না—এসব বিষয় খতিয়ে দেখছেন তদন্তকারীরা। তার পরিচিতদের মধ্যে কেউ হত্যাকাণ্ডে জড়িত কি না, তা-ও যাচাই করা হচ্ছে।
এ ছাড়া হত্যার আগে তাজমিন ধর্ষণের শিকার হয়েছিল কি না, তা চিকিৎসাসংক্রান্ত প্রতিবেদনের মাধ্যমে যাচাই করা হচ্ছে। ময়নাতদন্ত শেষে শুক্রবার তার মরদেহ যশোরের গ্রামের বাড়িতে দাফন করা হয়েছে।
নিহত জান্নাতুল তাজমিনের বয়স ছিল ১৩ বছর। সে কুমিল্লা নগরীর ফরিদা বিদ্যায়তনের সপ্তম শ্রেণির শিক্ষার্থী ছিল। তার গ্রামের বাড়ি যশোর সদর উপজেলার চুড়ামনকাটি ইউনিয়নের ছাতিয়ানতলা এলাকায়। তার বাবা আবদুল আলীম একটি বেসরকারি ওষুধ কোম্পানিতে কুমিল্লা জেলায় কর্মরত। পরিবারের সঙ্গে নগরীর রেইসকোর্স এলাকায় বসবাস করত তাজমিন।
পুলিশ সুপার আনিসুজ্জামান জানান, উদ্ধার হওয়া আইফোনের তথ্য, কললিস্ট, সিসিটিভি ফুটেজ এবং সুমনকে জিজ্ঞাসাবাদে পাওয়া তথ্যের ভিত্তিতে হত্যাকাণ্ডের রহস্য উদ্ঘাটনের চেষ্টা চলছে। অন্যদের শনাক্ত ও গ্রেপ্তার করতে অভিযান অব্যাহত রয়েছে। এ বিষয়ে শনিবার সকাল ১০টায় সংবাদ সম্মেলনে বিস্তারিত জানানো হবে। সূত্র: টাইমস টুডে
সদ্য সংবাদ/ এআর