একসময় রাজধানীর অভিজাত বিপণিবিতানগুলোর তালিকায় পরিচিত নাম ছিল কর্ণফুলী গার্ডেন সিটি শপিং কমপ্লেক্স। এখন সেই মার্কেটের পার্কিংয়ের সামনে বসে আছেন পঞ্চাশোর্ধ্ব এক নিরাপত্তাপ্রহরী। তাঁর কপালে দুশ্চিন্তার ছাপ। কথা বলে জানা গেল, মার্কেটটি বন্ধ হয়ে যাওয়ায় নিজের চাকরির ভবিষ্যৎ নিয়ে অনিশ্চয়তায় ভুগছেন তিনি।
মো. শাহজাহান নামের এই নিরাপত্তাপ্রহরী প্রায় ২২ বছর ধরে মার্কেটটিতে কাজ করছেন। বিপণিবিতানটির জমজমাট সময় যেমন দেখেছেন, তেমনি প্রত্যক্ষ করেছেন এর ক্রমাবনতিও। বর্তমানে শাহজাহানসহ চারজন নিরাপত্তাকর্মী এবং একজন ব্যবস্থাপক মার্কেটের দায়িত্বে রয়েছেন। তাঁদের বাইরে আর কোনো কর্মচারী নেই বলে জানা গেছে।
দুই দশকেরও বেশি সময় ধরে রাজধানীর শান্তিনগরে কেনাকাটার অন্যতম কেন্দ্র হিসেবে পরিচিত ছিল কর্ণফুলী গার্ডেন সিটি। কিন্তু গত কয়েক বছরে ক্রেতা কমতে থাকায় ব্যবসায়িকভাবে পিছিয়ে পড়ে একসময়ের ব্যস্ত এই বিপণিবিতান। শেষ পর্যন্ত ক্রেতাসংকট, সার্ভিস চার্জের অর্থ না পাওয়া এবং ৫০ লাখ টাকার বেশি বিদ্যুৎ বিল বকেয়া থাকায় দোকানমালিকদের সম্মিলিত সিদ্ধান্তে গত ১ অক্টোবর থেকে মার্কেটটি বন্ধ ঘোষণা করা হয়।
সোমবার (২৬ অক্টোবর) দুপুরে সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, মার্কেটের প্রধান প্রবেশপথে শাটার নামানো। সেখানে ঝুলছে ১ অক্টোবর থেকে বন্ধ থাকার ঘোষণা-সংবলিত ব্যানার। আগে চালু থাকা দোকানগুলোর স্থানান্তরের বিজ্ঞপ্তিও দেখা গেছে। তবে নিরাপত্তাকর্মীদের বেতন দেওয়ার বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে মূল ফটকের সামনের কাচ্চি ভাই, হটকেক, রেমন্ড ও মেজবান ডাইনের মতো কয়েকটি রেস্তোরাঁ চালু রাখা হয়েছে। মার্কেট বন্ধের প্রভাব এসব রেস্তোরাঁর ব্যবসাতেও পড়ছে বলে জানিয়েছেন কর্মচারীরা। তবে ভবনের আবাসিক অংশকে বন্ধের সিদ্ধান্তের বাইরে রাখা হয়েছে।
মার্কেটটির পরিচিত দোকানগুলোর একটি ছিল মোহনা জুয়েলার্স। বন্ধ প্রধান ফটকের সামনের পিলার ও দেয়ালের বিভিন্ন জায়গায় দোকানটির ঠিকানা পরিবর্তনের বিজ্ঞপ্তি দেখা যায়। বর্তমানে দোকানটি নয়াপল্টনের চায়না টাউন শপিং কমপ্লেক্সে স্থানান্তর করা হয়েছে।
দোকানটির স্বত্বাধিকারী নির্মল কুমার গুপ্ত বলেন, ‘মার্কেটে অনেক দিন থেকেই তেমন কাস্টমার আসত না। শেষের বছরগুলোতে তেমন লাভও হচ্ছিল না। শেষ পর্যন্ত মার্কেট বন্ধ হওয়ায় আমরা স্থান পরিবর্তন করে চায়না টাউন শপিং কমপ্লেক্সে এসেছি। দোকানের কাজ এখনও চলছে। হয়তো সামনের সপ্তাহে শুরু করতে পারব বলে আশা করছি।’
২৮ বছরের উত্থান-পতন
১৯৯৮ সালে শান্তিনগর-কাকরাইল মোড়ে কর্ণফুলী গ্রুপের উদ্যোগে যাত্রা শুরু করে কর্ণফুলী গার্ডেন সিটি। ২০ তলা ভবনটির প্রথম থেকে তৃতীয় তলা পর্যন্ত ছিল শপিং মল। চতুর্থ তলায় ছিল ফুড কোর্ট ও বাগান। ওপরের তলাগুলোতে গড়ে তোলা হয়েছিল আবাসিক অ্যাপার্টমেন্ট।
শুরুর দিকে দেশি-বিদেশি পোশাক, জুতা, প্রসাধনীসহ বিভিন্ন ব্র্যান্ডের মোট ১৯৮টি দোকান ছিল এখানে। এর বেশির ভাগই ব্যক্তিমালিকানায় রেজিস্ট্রি করে বিক্রি করা হয়েছিল। কিন্তু ধারাবাহিক লোকসানে ব্যবসা সংকুচিত হতে হতে বন্ধের আগে চালু দোকানের সংখ্যা নেমে আসে মাত্র ১০ থেকে ১৫টিতে। মার্কেট বন্ধ হওয়ার পর সেসব দোকানও অন্যত্র সরিয়ে নেওয়া হয়েছে।
যেসব কারণে বন্ধ হলো মার্কেট
মার্কেট-সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি ও স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, ভবনটিতে একসময় বিভিন্ন আধুনিক সুযোগ-সুবিধা থাকলেও পরে সেগুলোর অনেকগুলোই অকার্যকর হয়ে পড়ে। সচল এস্কেলেটর, শীতাতপনিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা ও লিফটের অভাবে ক্রেতাদের ভোগান্তি বাড়ে। ভবনটি ঝুঁকিপূর্ণ কি না, তা নিয়েও এলাকায় গুঞ্জন রয়েছে।
এ ছাড়া কিছু অসাধু ব্যবসায়ীর বিরুদ্ধে নিম্নমানের পণ্য বেশি দামে বিক্রি এবং ভেজাল পণ্য বাজারজাতের অভিযোগ ছিল। স্থানীয়দের মতে, এসব কারণে ক্রেতাদের একটি অংশ মার্কেটটি থেকে মুখ ফিরিয়ে নেন।
এর পাশাপাশি শান্তিনগর ফ্লাইওভার নির্মাণের সময় দীর্ঘদিন ধরে চলা সংস্কারকাজ, করোনা মহামারিতে ব্যবসায়িক ক্ষতি এবং বসুন্ধরা সিটি ও যমুনা ফিউচার পার্কের মতো বড় শপিং মলের সঙ্গে প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে পড়াও মার্কেটটির ব্যবসা কমে যাওয়ার কারণ হিসেবে উঠে এসেছে। ক্রেতা কমতে থাকায় আয় কমে যায়, আর একপর্যায়ে খরচ সামলানো কঠিন হয়ে পড়ে। শেষ পর্যন্ত লোকসান সামলাতে না পেরে দোকানমালিকেরা সম্মিলিতভাবে মার্কেট বন্ধের সিদ্ধান্ত নেন।
কর্ণফুলী গার্ডেন সিটি মার্কেটের দোকানমালিক সমিতির সভাপতি এ কে এম ইকবাল বলেন, ‘আমরা মার্কেটের খরচ চালাতে পারছিলাম না। ক্রেতা আসে না। দোকানমালিকরা লোকসান করতে করতে একটা সময় গিয়ে আর সার্ভিস চার্জ, বিদ্যুৎ বিলসহ বেসিক জিনিসগুলোই দিতে পারছিলাম না। অনেক টাকা বকেয়া হয়ে গেছে। ফলে আমরা এজিএমে সব দোকানমালিক মিলে এ মাসের শুরু থেকে মার্কেট বন্ধ করে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছি।’
মার্কেটটির ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা সম্পর্কে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘আমরা বিক্রির সিদ্ধান্ত নিয়েছি। এরপর যারা কিনবে, সেখানে কী করবে? সেই সিদ্ধান্ত তারাই নেবেন।’ সূত্র: এশিয়া পোস্ট
সদ্য সংবাদ/ এআর