বাংলাদেশের রাজনীতিতে সাধারণত একজন শীর্ষ নেতাকে সামনে রেখে দল বা জোট নির্বাচনী প্রচারণা চালালেও জামায়াতে ইসলামীর নেতৃত্বে গঠিত ১০ দলীয় জোটে এবার সে ধরনের কোনো একক নেতৃত্ব সামনে রাখা হয়নি। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আনুষ্ঠানিক প্রচারণা ২২ জানুয়ারি থেকে শুরু হয়েছে। এতে প্রায় দুই হাজার প্রার্থী অংশ নিচ্ছেন, তবে মূল লড়াই হচ্ছে দুটি বড় রাজনৈতিক জোটের মধ্যে।
একদিকে বিএনপি ও তাদের সঙ্গে আসন সমঝোতায় থাকা দলগুলো, অন্যদিকে জামায়াত ও তাদের সঙ্গে সমঝোতায় আসা দলগুলো। বিএনপি নেতৃত্বাধীন জোটে নেতৃত্ব দিচ্ছেন বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান। বিপরীতে জামায়াতের নেতৃত্বে গঠিত ১০ দলীয় জোটে কোনো একক নেতা নেই, বরং জোটটি পরিচালিত হচ্ছে যৌথ নেতৃত্বে।
এই জোটে থাকা ১০ দলের মধ্যে জামায়াত, বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস, খেলাফত মজলিস, নেজামে ইসলাম পার্টি ও বাংলাদেশ খেলাফত আন্দোলন—এই পাঁচটি দল ইসলামপন্থি। অন্য পাঁচটি দল হলো জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি), লিবারেল ডেমোক্রেটিক পার্টি (এলডিপি), আমার বাংলাদেশ (এবি) পার্টি, জাতীয় গণতান্ত্রিক পার্টি (জাগপা) এবং বাংলাদেশ ডেভেলপমেন্ট পার্টি।
বিভিন্ন আদর্শের দল একত্র হলেও এই ঐক্যের সুস্পষ্ট আদর্শিক ভিত্তি বা লক্ষ্য সম্পর্কে কোনো স্পষ্ট রূপরেখা নেই। নির্বাচনে জয়ী হলে প্রধানমন্ত্রী কে হবেন বা বিরোধী দলে গেলে বিরোধীদলীয় নেতা কে হবেন, সে বিষয়েও কোনো সিদ্ধান্ত হয়নি। ফলে অস্পষ্ট নেতৃত্ব ও রূপরেখা নিয়ে এই জোট বিএনপির কতটা শক্ত প্রতিদ্বন্দ্বী হতে পারবে, তা নিয়ে সংশয় রয়েছে।
বাংলাদেশের রাজনীতিতে আওয়ামী লীগ শেখ মুজিবুর রহমান ও পরে শেখ হাসিনাকে সামনে রেখে নির্বাচনে নেমেছে। বিএনপিও জিয়াউর রহমান থেকে খালেদা জিয়া পর্যন্ত একই ধারায় চলেছে। জাতীয় পার্টিও হুসেইন মোহাম্মদ এরশাদকে সামনে রেখেই নির্বাচন করেছে। এবারের নির্বাচনে বিএনপি জোট সামনে রেখেছে তারেক রহমানকে। কিন্তু ১০ দলীয় ঐক্যে এমন কোনো একক মুখ নেই।
এই প্রশ্ন আগে থেকেই উঠেছিল। বিশেষ করে ইসলামী আন্দোলন জোট গঠনের আগেই নেতৃত্বের বিষয়টি নির্ধারণের কথা তুলেছিল। পরে আদর্শিক ও রাজনৈতিক কারণ দেখিয়ে তারা ঐক্যপ্রক্রিয়া থেকে সরে যায়। ইসলামী আন্দোলন বেরিয়ে যাওয়ার পর জোটে জামায়াতের প্রভাব আরও স্পষ্ট হয়। জামায়াত এককভাবে ২১৫টি আসনে প্রার্থী দেওয়ায় জোটের মূল শক্তি হিসেবে তাদের অবস্থান পরিষ্কার হয়ে ওঠে।
যদিও আনুষ্ঠানিকভাবে ঘোষণা নেই, তবু কার্যত জামায়াতই এই জোটের অঘোষিত নেতৃত্বে রয়েছে। জাতীয় নাগরিক পার্টির জ্যেষ্ঠ যুগ্ম আহ্বায়ক আরিফুল ইসলাম আদীব বলেন, প্রধানমন্ত্রী বা বিরোধীদলীয় নেতা কে হবেন—এ নিয়ে দলগুলোর মধ্যে কোনো আলোচনা হয়নি। সাধারণভাবে যে দল বেশি আসন পায়, তাদেরই অগ্রাধিকার দেওয়ার ধারণা রয়েছে বলে তিনি উল্লেখ করেন।
৩০০ আসনের মধ্যে জামায়াত যেখানে ২১৫টি আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছে, সেখানে এনসিপির প্রার্থী মাত্র ৩০টি আসনে। শেষ সময়ে জোটে যুক্ত হওয়ায় এনসিপি নেতৃত্ব বা ভবিষ্যৎ পদবণ্টন নিয়ে দরকষাকষির সুযোগ পায়নি। অন্য দলগুলোর বক্তব্যেও বাস্তবতা মেনে জামায়াতের প্রাধান্য স্বীকার করার ইঙ্গিত পাওয়া যায়।
বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের আমির মামুনুল হক বলেন, জোটে যে দল সবচেয়ে বেশি আসনে নির্বাচন করছে, স্বাভাবিকভাবেই তাদেরই মুখ্য ভূমিকা থাকবে। তবে জামায়াত নেতৃত্বের প্রশ্নে এখনই সিদ্ধান্ত নিতে চায় না। দলটির কেন্দ্রীয় সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ার বলেন, নির্বাচনের ফলাফলের পর আসনসংখ্যা দেখে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে, যদিও দল হিসেবে তারা নিজেদের শীর্ষ নেতাকেই সামনে রাখবে।
আদর্শিক ভিত্তি প্রসঙ্গে জোটের নেতারা ‘জুলাই স্পিরিট’, সংস্কার, বিচার এবং আধিপত্যবাদবিরোধী অবস্থানের কথা বলছেন। এনসিপি ও খেলাফত মজলিস উভয়ই দাবি করেছে, এই বিষয়গুলোতেই জোটের সব দল একমত।
শরিয়া আইনভিত্তিক রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা নিয়ে প্রশ্ন উঠলেও এনসিপির দাবি, জামায়াত বা অন্য কোনো দল তাৎক্ষণিকভাবে শরিয়া রাষ্ট্র কায়েমের কথা বলছে না। বরং সবাই গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার মধ্যেই রাজনীতি করতে চায়। ইসলামী দলগুলো বলছে, তাদের নিজ নিজ আদর্শ অটুট থাকলেও বাস্তবায়ন হবে ধাপে ধাপে এবং জনগণকে প্রস্তুত করে।
জামায়াতের বক্তব্যেও একই সুর শোনা যায়। মিয়া গোলাম পরওয়ার বলেন, বিদ্যমান আইনি কাঠামোর মধ্য দিয়েই পরিবর্তন আসতে হবে এবং সংসদের প্রক্রিয়া অনুসরণ করেই সিদ্ধান্ত নিতে হবে। মানুষের জন্য কল্যাণকর নয়—এমন কোনো বিধান গ্রহণ করা হবে না বলেও জানান তিনি।