ইরান যুদ্ধে লক্ষ্য আলাদা যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের

A
Admin
২৫ জুলাই, ২০২৬ ১৬:৩৭:৩০
ইরানকে কেন্দ্র করে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের প্রকৃত স্বার্থ কী এবং তারা আদৌ সমন্বিতভাবে এগোচ্ছে কি না—এ প্রশ্ন এখন ক্রমেই জোরালো হচ্ছে। পর্যবেক্ষণে দেখা যাচ্ছে, ইসরায়েল যেভাবে ইরানের অর্থনৈতিক ও বেসামরিক অবকাঠামোকে লক্ষ্যবস্তু করছে এবং অন্যদিকে ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রশাসনের পক্ষ থেকে সংযমের আহ্বান আসছে, তাতে দুই পক্ষের মধ্যে স্বার্থগত দূরত্বের ইঙ্গিত মিলছে।

কাতারের হামাদ বিন খলিফা ইউনিভার্সিটির অধ্যাপক সুলতান বারাকাত মনে করেন, ওয়াশিংটনের বক্তব্যে ইসরায়েলের ভূমিকা ঘিরে থাকা গভীর দ্বন্দ্ব আড়াল করা হচ্ছে। মার্কিন প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথের বক্তব্য বিশ্লেষণ করেই তিনি এ মন্তব্য করেছেন।

মার্কিন থিংক ট্যাংক আটলান্টিক কাউন্সিল জানিয়েছে, ইরানকে ঘিরে যুক্তরাষ্ট্রের ঘোষিত লক্ষ্যগুলোর মধ্যে রয়েছে দেশটির পারমাণবিক কর্মসূচি, ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র, নৌবাহিনী ও ড্রোন সক্ষমতা দুর্বল করা এবং তাদের প্রক্সি বাহিনীর ওপর নিয়ন্ত্রণ ভেঙে দেওয়া। তাদের দাবি, এসব ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি ইতোমধ্যে অর্জিত হয়েছে।

মার্কিন কৌশলবিদদের ধারণা, ইরানের অবশিষ্ট ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন উৎপাদন সক্ষমতার ওপর আঘাত হানতে আরও কয়েক সপ্তাহ সময় লাগতে পারে। এরপর ট্রাম্প প্রশাসন একতরফাভাবে বিজয় ঘোষণার পথে যেতে পারে।

এ ছাড়া যুক্তরাষ্ট্রের আরেকটি লক্ষ্য হিসেবে উল্লেখ করা হচ্ছে এমন একটি সরকার প্রতিষ্ঠা, যা আন্তর্জাতিকভাবে সহযোগিতামূলক হবে এবং মানবাধিকার রক্ষায় বেশি সচেতন থাকবে। তবে এই পরিবর্তন অনেকটাই ইরানের জনগণের ওপর নির্ভরশীল। যে-ই ক্ষমতায় আসুক, দীর্ঘ সময় ধরে ইরান দুর্বল অবস্থায় থাকবে এবং যুক্তরাষ্ট্রের জন্য সম্ভাব্য হুমকিও কমে আসবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

অন্যদিকে, আটলান্টিক কাউন্সিলের মতে, ইসরায়েল ইরানের বর্তমান শাসনব্যবস্থার পতনকে কৌশলগত লক্ষ্য হিসেবে দেখছে। ২০২৫ সালের জুনে বারো দিনের সংঘাতের ধারাবাহিকতায় এই লক্ষ্য আরও বিস্তৃত হয়েছে। ওই সংঘাতে ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের হামলায় ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি পিছিয়ে গেলেও ইরানের কিছু ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা ভেদ করতে সক্ষম হয়েছিল।

ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র মজুত এবং উৎপাদন বাড়ানোর পরিকল্পনা বিবেচনায় ইসরায়েল ভবিষ্যৎ হুমকি নিয়ে উদ্বিগ্ন। তাই ২০২৬ সালের পরবর্তী সময়ে সম্ভাব্য ঝুঁকি মোকাবিলায় প্রস্তুতি নেওয়া হচ্ছিল বলে ধারণা করা হচ্ছে।

দীর্ঘদিন ধরে শক্তিশালী প্রতিপক্ষ হিসেবে ইরানকে দেখার কারণে ইসরায়েলের কাছে শাসন পরিবর্তনের লক্ষ্য অস্বাভাবিক নয়। ইরান প্রকাশ্যেই ইসরায়েলের বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছে এবং প্রক্সি গোষ্ঠীগুলোর মাধ্যমে হামলা চালিয়েছে। গত দুই দশকে ইসরায়েলের ওপর হাজার হাজার রকেট ও ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপের ঘটনাও ঘটেছে। ফলে ইসরায়েলের সাধারণ মানুষের বড় অংশ এই সামরিক অভিযানের প্রয়োজনীয়তা অনুভব করছে।

তবে এই লক্ষ্য যুক্তরাষ্ট্রের কৌশলের সঙ্গে কতটা সামঞ্জস্যপূর্ণ, তা স্পষ্ট নয়। ট্রাম্প প্রশাসনের বক্তব্যে একাধিকবার অসামঞ্জস্য দেখা গেছে। ‘নিঃশর্ত আত্মসমর্পণ’ দাবি এবং এমন পরিস্থিতি তৈরির কথা বলা, যাতে ইরানের জনগণ নিজেরাই রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণ নিতে পারে—এসব কিছু আংশিকভাবে ইসরায়েলের লক্ষ্যকে সমর্থন করলেও পূর্ণ মিল পাওয়া যায় না।

এদিকে তেলের দাম বৃদ্ধি, পুঁজিবাজারে অস্থিরতা, সরবরাহ শৃঙ্খলে বিঘ্ন এবং আঞ্চলিক নিরাপত্তা ঝুঁকি বাড়তে থাকায় যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে আগেভাগে সংঘাত থেকে বেরিয়ে আসার চিন্তাও উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না। সে ক্ষেত্রে ইরানকে দুর্বল করার সাফল্য দেখিয়ে যুদ্ধের ইতি টানার চেষ্টা হতে পারে।

শাসন পরিবর্তনের পর সম্ভাব্য অস্থিতিশীলতা, গৃহযুদ্ধ বা শরণার্থী সংকটের আশঙ্কা যুক্তরাষ্ট্র ও তার আরব মিত্রদের জন্য বড় উদ্বেগের বিষয়। এই দিক থেকে ইসরায়েলের অবস্থান তুলনামূলকভাবে ভিন্ন।

বারাকাতের মতে, প্রকাশ্যে ঐক্যের বার্তা দেওয়া হলেও বাস্তবে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের লক্ষ্য এক নয়। তাঁর ভাষায়, মার্কিন কর্মকর্তারা একতার ছবি তুলে ধরার চেষ্টা করছেন, কিন্তু ভেতরে ভিন্নতা স্পষ্ট। তিনি আরও বলেন, শেষ পর্যন্ত আক্রমণের সিদ্ধান্ত এবং যুদ্ধের গতি-প্রকৃতি অনেকটাই ইসরায়েলের হাতে।

ট্রাম্পের রাজনৈতিক অবস্থানও এখানে প্রশ্নের মুখে পড়েছে। দীর্ঘদিন ‘অনন্ত যুদ্ধের’ বিরোধিতা করলেও হঠাৎ করেই ইরানে হামলার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। যদিও যুক্তরাষ্ট্রের হামলা মূলত সামরিক স্থাপনায় সীমাবদ্ধ ছিল, ইসরায়েল বেসামরিক অবকাঠামোতেও আঘাত হেনেছে, যার মধ্যে পানি শোধনাগার, গ্যাসক্ষেত্র, তেলের ডিপো এবং আবাসিক এলাকা রয়েছে।

এই পরিস্থিতিকে অনেকেই গাজার অভিজ্ঞতার সঙ্গে তুলনা করছেন। ইসরায়েলের নেতৃত্ব ইরানকে অস্তিত্বগত হুমকি হিসেবে দেখে এবং বৃহত্তর কৌশলগত লক্ষ্য সামনে রেখে অগ্রসর হচ্ছে বলে বিশ্লেষণে উঠে এসেছে।

যুদ্ধের অর্থনৈতিক দিক থেকেও যুক্তরাষ্ট্র চাপে রয়েছে। এখন পর্যন্ত ব্যয় ৬০ বিলিয়ন ডলার ছাড়িয়েছে এবং আরও ২০০ বিলিয়ন ডলারের তহবিল চাওয়া হয়েছে। এই প্রেক্ষাপটে ইরানি তেলের ওপর নিষেধাজ্ঞা শিথিল করে জ্বালানি বাজার স্থিতিশীল করার চিন্তাও আলোচনায় এসেছে।

সব মিলিয়ে এই সংঘাতে যুক্তরাষ্ট্র কতটা লাভবান হবে, তা অনিশ্চিত। তবে ইসরায়েলের লক্ষ্য ইরানকে দীর্ঘমেয়াদে দুর্বল করা—এ বিষয়ে সন্দেহ নেই। অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্ররা একটি ভঙ্গুর ও অস্থিতিশীল ইরান চায় কি না, তা নিয়ে সংশয় থেকেই যাচ্ছে।

এই প্রেক্ষাপটে সুলতান বারাকাত প্রশ্ন তুলেছেন, যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়ার যৌক্তিকতা কতটা রয়েছে। তাঁর মতে, চাইলে ট্রাম্প সহজেই লক্ষ্য অর্জনের ঘোষণা দিয়ে সংঘাতের ইতি টানতে পারতেন এবং বাড়তি ব্যয় ও ভোগান্তি এড়াতে পারতেন।
তথ্যসূত্র: আল জাজিরা

মন্তব্য (0)

মন্তব্য করুন

এখনো কোনো মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্য করুন!

বিজ্ঞাপনের জন্য খালি স্পেস

শিরোনাম:
সদ্য. ব্যাটারিচালিত রিকশার সর্বোচ্চ গতি ২৫ কিমি, নিবন্ধন বাধ্যতামূলক-ফি সর্বোচ্চ ১০ হাজার টাকা সদ্য. ঠাকুরগাঁও-১ আসনে বিএনপির মির্জা ফয়সল আমীন বিজয়ী সদ্য. সাইবার সুরক্ষা, গুম প্রতিরোধ ও এসআরবি আইন নিয়ে উদ্বেগ অ্যামনেস্টির,আইনমন্ত্রীকে চিঠি সদ্য. আওয়ামী লীগ সন্ত্রাসী সংগঠন: আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের পর্যবেক্ষণ সদ্য. বিদ্যুৎ উৎপাদনের আনুষ্ঠানিক অনুমোদন পেল রূপপুরের প্রথম ইউনিট সদ্য. প্রধানমন্ত্রীর ফিরতি যাত্রায় বিঘ্ন, ফ্লাইটে দেখা দিল যান্ত্রিক ত্রুটি সদ্য. দুর্নীতি ও দেশপ্রেমের অভাবের কারণে মানবিক বাংলাদেশ গড়া সম্ভব হয়নি: ডেপুটি স্পিকার সদ্য. পাবনায় শ্রমিক লীগ ও শ্রমিক দল নেতাকে গুলি করে হত্যা সদ্য. শনিবারের মধ্যে সরকারি বাসা থেকে ভাড়াটে অপসারণের নির্দেশ সদ্য. ৪ দিনের সফর শেষে দেশের পথে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান সদ্য. ব্যাটারিচালিত রিকশার সর্বোচ্চ গতি ২৫ কিমি, নিবন্ধন বাধ্যতামূলক-ফি সর্বোচ্চ ১০ হাজার টাকা সদ্য. ঠাকুরগাঁও-১ আসনে বিএনপির মির্জা ফয়সল আমীন বিজয়ী সদ্য. সাইবার সুরক্ষা, গুম প্রতিরোধ ও এসআরবি আইন নিয়ে উদ্বেগ অ্যামনেস্টির,আইনমন্ত্রীকে চিঠি সদ্য. আওয়ামী লীগ সন্ত্রাসী সংগঠন: আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের পর্যবেক্ষণ সদ্য. বিদ্যুৎ উৎপাদনের আনুষ্ঠানিক অনুমোদন পেল রূপপুরের প্রথম ইউনিট সদ্য. প্রধানমন্ত্রীর ফিরতি যাত্রায় বিঘ্ন, ফ্লাইটে দেখা দিল যান্ত্রিক ত্রুটি সদ্য. দুর্নীতি ও দেশপ্রেমের অভাবের কারণে মানবিক বাংলাদেশ গড়া সম্ভব হয়নি: ডেপুটি স্পিকার সদ্য. পাবনায় শ্রমিক লীগ ও শ্রমিক দল নেতাকে গুলি করে হত্যা সদ্য. শনিবারের মধ্যে সরকারি বাসা থেকে ভাড়াটে অপসারণের নির্দেশ সদ্য. ৪ দিনের সফর শেষে দেশের পথে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান