গোপন তথ্যে ফেসবুক ও ইনস্টাগ্রামে শিশু যৌন পাচারের গোমর ফাঁস দ্য গার্ডিয়ানের অনুসন্ধান

A
Admin
২৫ জুলাই, ২০২৬ ১৬:৩৭:৩০
একটি গোপন সূত্র থেকে পাওয়া তথ্য থেকেই শুরু হয়েছিল অনুসন্ধান। সেই অনুসন্ধানই শেষ পর্যন্ত বিশ্বের অন্যতম প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান মেটার বিরুদ্ধে বহু মিলিয়ন ডলারের আইনি পরাজয়ের ভিত্তি তৈরি করেছে। সোমবার (৬ এপ্রিল) যুক্তরাজ্যের প্রভাবশালী সংবাদমাধ্যম দ্য গার্ডিয়ান এ বিষয়ে একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে।

২০২১ সালে কোভিড-১৯ মহামারির সময় অনলাইনে মানুষের উপস্থিতি উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়ে। ওই সময় সাংবাদিকদের কাছে একটি উদ্বেগজনক তথ্য আসে—যুক্তরাষ্ট্রে শিশুদের যৌন পাচার বাড়ছে এবং অপরাধীরা ফেসবুক ও ইনস্টাগ্রামের মতো জনপ্রিয় সামাজিক মাধ্যম ব্যবহার করছে। এই তথ্যের ভিত্তিতে মানবাধিকার সাংবাদিক মে-লিং ম্যাকনামারার সঙ্গে যৌথভাবে গভীর অনুসন্ধান শুরু হয়।

অনুসন্ধানের শুরুতেই পাচারবিরোধী সংস্থা ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা জানান, অপরাধীরা সামাজিক মাধ্যমের ব্যক্তিগত অংশ, যেমন মেসেঞ্জার বা ব্যক্তিগত অ্যাকাউন্ট ব্যবহার করে কিশোর-কিশোরীদের লক্ষ্যবস্তু বানাচ্ছে। প্রথমে সম্পর্ক গড়ে তুলে পরে তাদের যৌন শোষণের উদ্দেশ্যে বিক্রি করা হচ্ছে।

আন্তর্জাতিক আইনে শিশুদের ক্ষেত্রে যৌন কর্মকাণ্ডে সম্মতির কোনো সুযোগ নেই। ফলে কোনো শিশুকে যৌন বাণিজ্যে ব্যবহার করা বা সেখান থেকে লাভবান হওয়া মানবপাচারের শামিল।

এই অপরাধের প্রমাণ সংগ্রহ ছিল অত্যন্ত কঠিন। যুক্তরাষ্ট্রের ফেডারেল আদালতের নথি সংরক্ষণকারী ডেটাবেইস পেসারে সরাসরি অনুসন্ধান সুবিধা না থাকায় সাংবাদিকদের বিচার বিভাগের প্রেস রিলিজ ঘেঁটে সম্ভাব্য মামলাগুলো খুঁজতে হয়। এরপর অভিযোগপত্র, সাক্ষ্য ও প্রমাণাদি দীর্ঘ সময় ধরে বিশ্লেষণ করা হয়।

অনুসন্ধানে উঠে আসে ভয়াবহ চিত্র। ফেসবুক মেসেঞ্জারে কিশোরীদের বিক্রি নিয়ে দর কষাকষির ট্রান্সক্রিপ্ট পাওয়া যায়। ইনস্টাগ্রামের স্টোরিজে পাচারের শিকার শিশুদের ছবি দিয়ে বিজ্ঞাপন দেওয়া হচ্ছিল। অর্থ লেনদেন ও অন্যান্য বিষয়ে আলোচনা হলেও এসব অপরাধ মেটার পক্ষ থেকে শনাক্ত বা প্রতিরোধ করা হয়নি।

সামাজিক মাধ্যমের সাবেক কনটেন্ট মডারেটরদের সঙ্গেও কথা বলা হয়। তাঁরা জানান, প্রতিদিন ভয়াবহ কনটেন্ট দেখে মানসিকভাবে বিপর্যস্ত হয়ে পড়তেন। শিশু পাচারের মতো গুরুতর বিষয় রিপোর্ট করা হলেও কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হতো না। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে অবহিত করার ক্ষেত্রে মেটার মানদণ্ড সীমিত ছিল বলেও জানান তাঁরা।

২০২২ সালে ওয়াশিংটন ডিসিতে অবস্থিত ‘কান্ট্রিজ হাউস’ নামের একটি নিরাপদ আশ্রয়কেন্দ্রে যান সাংবাদিকেরা। প্রতিষ্ঠানটি পরিচালনা করেন পাচার থেকে বেঁচে ফেরা টিনা ফ্রান্ডট। সেখানে আলোচনা হয় কীভাবে সামাজিক মাধ্যম ব্যবহার করে কিশোরীদের টার্গেট করা হয় এবং পাচার করা হয়।

এই আলোচনায় উঠে আসে ১৫ বছর বয়সী এক কিশোরীর গল্প, যার ছদ্মনাম ‘মায়া’। ইনস্টাগ্রামে পরিচয়ের পর এক ব্যক্তি তাকে মাদক মিশ্রিত পদার্থ দেয়। সেদিন রাতেই সে ঘুমিয়ে পড়ে এবং আর জেগে ওঠেনি।

অন্য এক অনুসন্ধানে ম্যাসাচুসেটস অঙ্গরাজ্যের এক প্রসিকিউটরের দপ্তর থেকে জানা যায়, সামাজিক মাধ্যমে শিশু পাচারের ঘটনা প্রতি বছর প্রায় ৩০ শতাংশ হারে বাড়ছে। মহামারির সময় শিশুরা বাড়িতে বেশি সময় অনলাইনে থাকায় পরিস্থিতি আরও খারাপ হয়েছে। অপরাধীরা সহজেই ঝুঁকিপূর্ণ শিশুদের চিহ্নিত করতে পারছে।

একজন প্রসিকিউটর বলেন, এটি অত্যন্ত লাভজনক ব্যবসায় পরিণত হয়েছে এবং যোগাযোগ থেকে লেনদেন—সবকিছুই অনলাইনে সম্পন্ন হচ্ছে। এমনকি এক কারাবন্দি পাচারকারীও জানান, অপরাধের জন্য তার পছন্দের প্ল্যাটফর্ম ছিল ইনস্টাগ্রাম।

এই অনুসন্ধানের ফল প্রকাশিত হয় ২০২৩ সালের এপ্রিলে। শুরুতে প্রভাব স্পষ্ট না হলেও পরে এটি যুক্তরাষ্ট্রের আদালতে গুরুত্বপূর্ণ প্রমাণ হিসেবে ব্যবহৃত হয়। নিউ মেক্সিকো অঙ্গরাজ্যের অ্যাটর্নি জেনারেল মেটার বিরুদ্ধে মামলা করেন এবং অভিযোগ করেন, তাদের প্ল্যাটফর্ম শিশু শিকারিদের জন্য বাজারে পরিণত হয়েছে।

চলতি বছরের মার্চে মামলার রায়ে মেটাকে ৩৭৫ মিলিয়ন ডলার জরিমানা করা হয়। প্রতিষ্ঠানটি রায়ের বিরুদ্ধে আপিলের ঘোষণা দিয়েছে এবং কিশোরদের সুরক্ষায় প্রতিশ্রুতিবদ্ধ বলে দাবি করেছে।

অনুসন্ধানে আরও জানা যায়, মেসেঞ্জার ও মেটা পে ব্যবহার করে শিশু নির্যাতনের উপকরণ কেনাবেচা হচ্ছিল। টেক্সাসের কিশোরী ক্রিস্টেন গ্যালভানের ঘটনাও উঠে আসে, যিনি ইনস্টাগ্রামের মাধ্যমে পাচারের শিকার হয়ে পরে নিহত হন।

২০২৩ সালের ডিসেম্বরে মেসেঞ্জারে এনক্রিপশন চালুর সিদ্ধান্ত নিয়েও সমালোচনা হয়। বিশেষজ্ঞরা বলেন, এতে অপরাধ শনাক্ত করা কঠিন হবে। যদিও মেটা জানায়, ব্যবহারকারীরা অভিযোগ জানাতে পারবেন। তবে আদালতে ইনস্টাগ্রামের প্রধান অ্যাডাম মোসেরি বলেন, ব্যবহারকারীর অভিযোগের তুলনায় কোম্পানির প্রযুক্তি বেশি কার্যকর।

এই অনুসন্ধান দেখিয়েছে, প্রযুক্তির অপব্যবহার ঠেকাতে ব্যর্থ হলে তা ভয়াবহ সামাজিক সংকট তৈরি করতে পারে। শিশুদের সুরক্ষায় কঠোর নজরদারি, জবাবদিহি ও কার্যকর নীতিমালার দাবি এখন বিশ্বজুড়ে জোরালো হচ্ছে।

মন্তব্য (0)

মন্তব্য করুন

এখনো কোনো মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্য করুন!

বিজ্ঞাপনের জন্য খালি স্পেস

শিরোনাম:
সদ্য. বিদ্যুৎ উৎপাদনের আনুষ্ঠানিক অনুমোদন পেল রূপপুরের প্রথম ইউনিট সদ্য. প্রধানমন্ত্রীর ফিরতি যাত্রায় বিঘ্ন, ফ্লাইটে দেখা দিল যান্ত্রিক ত্রুটি সদ্য. ৪ দিনের সফর শেষে দেশের পথে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান সদ্য. পে-স্কেল নিয়ে অর্থ মন্ত্রণালয়ের নতুন প্রজ্ঞাপন, জানানো হলো ৮ সিদ্ধান্ত সদ্য. মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় মাহবুব উল আলম হানিফের মৃত্যুদণ্ড সদ্য. চট্টগ্রাম বন্দরে পাকিস্তান থেকে আসা তামাকভর্তি ১০ কনটেইনার জব্দ সদ্য. বিমানবাহিনীর সাবেক কর্মকর্তা তাহসিফ সৌরির মরদেহ উদ্ধার সদ্য. তাহসিফের পুরনো বক্তব্য ভাইরাল: সেই ভিডিও ছড়ানোর অভিযোগেই হয়তো আজ আমি এয়ার ফোর্সে নেই সদ্য. সুদানে ড্রোন হামলায় প্রাণ গেল ১০০ জনের, আহত ১১৩ সদ্য. ন্যূনতম বেতন ৩০ হাজার টাকা করার দাবিতে মিরপুরে পোশাক শ্রমিকদের সড়ক অবরোধ সদ্য. বিদ্যুৎ উৎপাদনের আনুষ্ঠানিক অনুমোদন পেল রূপপুরের প্রথম ইউনিট সদ্য. প্রধানমন্ত্রীর ফিরতি যাত্রায় বিঘ্ন, ফ্লাইটে দেখা দিল যান্ত্রিক ত্রুটি সদ্য. ৪ দিনের সফর শেষে দেশের পথে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান সদ্য. পে-স্কেল নিয়ে অর্থ মন্ত্রণালয়ের নতুন প্রজ্ঞাপন, জানানো হলো ৮ সিদ্ধান্ত সদ্য. মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় মাহবুব উল আলম হানিফের মৃত্যুদণ্ড সদ্য. চট্টগ্রাম বন্দরে পাকিস্তান থেকে আসা তামাকভর্তি ১০ কনটেইনার জব্দ সদ্য. বিমানবাহিনীর সাবেক কর্মকর্তা তাহসিফ সৌরির মরদেহ উদ্ধার সদ্য. তাহসিফের পুরনো বক্তব্য ভাইরাল: সেই ভিডিও ছড়ানোর অভিযোগেই হয়তো আজ আমি এয়ার ফোর্সে নেই সদ্য. সুদানে ড্রোন হামলায় প্রাণ গেল ১০০ জনের, আহত ১১৩ সদ্য. ন্যূনতম বেতন ৩০ হাজার টাকা করার দাবিতে মিরপুরে পোশাক শ্রমিকদের সড়ক অবরোধ