মালদ্বীপে কর্মরত বাংলাদেশি প্রবাসীদের আর্থিক নিরাপত্তা জোরদার এবং দেশে তাদের পরিবারের জন্য নিরাপদ রেমিট্যান্স প্রবাহ নিশ্চিত করতে নতুন উদ্যোগ নিয়েছে বাংলাদেশ হাইকমিশন। এ লক্ষ্যে কোকা-কোলা মালদ্বীপের প্রধান পরিচালন কর্মকর্তা ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মিলিন্দ দেরাসারি সম্প্রতি মালেতে অবস্থিত বাংলাদেশ হাইকমিশনের চ্যান্সারি ভবনে বাংলাদেশের হাইকমিশনার ড. মো. নাজমুল ইসলামের সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাৎ করেন।
বৈঠকে মালদ্বীপে কর্মরত বাংলাদেশি প্রবাসীদের কল্যাণ, অধিকার, পেশাগত উন্নয়ন এবং বাংলাদেশ-মালদ্বীপের মধ্যে বাণিজ্য, বিনিয়োগ ও অর্থনৈতিক সহযোগিতা সম্প্রসারণের বিভিন্ন বিষয় নিয়ে আলোচনা হয়। বৈঠকের শুরুতে হাইকমিশনার মালদ্বীপে বাংলাদেশি কর্মীদের জন্য দীর্ঘদিন ধরে কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি করায় কোকা-কোলা মালদ্বীপ কর্তৃপক্ষকে ধন্যবাদ জানান।
আলোচনায় উভয় পক্ষই স্বীকার করেন, বাংলাদেশি প্রবাসীরা মালদ্বীপের অর্থনৈতিক উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখার পাশাপাশি রেমিট্যান্স পাঠিয়ে বাংলাদেশের অর্থনীতিতেও বড় ভূমিকা রাখছেন।
বৈঠকে মিলিন্দ দেরাসারি জানান, বর্তমানে কোকা-কোলা মালদ্বীপে ২০০-এর বেশি বাংলাদেশি নাগরিক বিভিন্ন কারিগরি, প্রশাসনিক, উৎপাদন, ব্যবস্থাপনা ও পরিচালনাগত পদে কর্মরত রয়েছেন। তিনি বাংলাদেশি কর্মীদের সততা, নিষ্ঠা, পেশাদারিত্ব ও কঠোর পরিশ্রমের প্রশংসা করেন এবং বলেন, তাদের অবদান কোম্পানির ধারাবাহিক সাফল্য ও কার্যক্রম পরিচালনায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।
বাংলাদেশি কর্মীদের আর্থিক নিরাপত্তা ও কল্যাণ নিশ্চিত করার বিষয়টি বৈঠকে বিশেষ গুরুত্ব পায়। এ প্রসঙ্গে হাইকমিশনার সময়মতো ও স্বচ্ছ পদ্ধতিতে বেতন পরিশোধের গুরুত্ব তুলে ধরেন এবং বিশেষভাবে মার্কিন ডলারে বেতন প্রদান অব্যাহত রাখার ওপর গুরুত্বারোপ করেন। তিনি বলেন, ডলারে বেতন পেলে বাংলাদেশি কর্মীরা বৈধ ব্যাংকিং চ্যানেলের মাধ্যমে আরও নিরাপদ, দ্রুত ও কার্যকরভাবে দেশে অর্থ পাঠাতে পারেন, যা তাদের পরিবারের আর্থিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সহায়ক হবে।
হাইকমিশনার আরও বলেন, মার্কিন ডলারে বেতন প্রদানের ব্যবস্থা মালদ্বীপে কর্মরত বাংলাদেশি প্রবাসীদের আর্থিক সুরক্ষা জোরদার এবং বৈধ চ্যানেলে রেমিট্যান্স প্রবাহ বাড়ানোর বৃহত্তর উদ্যোগের অংশ। আন্তর্জাতিকভাবে গ্রহণযোগ্য মুদ্রায় বেতন প্রাপ্তি প্রবাসীদের আনুষ্ঠানিক ব্যাংকিং ব্যবস্থার মাধ্যমে দেশে অর্থ পাঠাতে উৎসাহিত করে, যা জাতীয় অর্থনীতির জন্যও ইতিবাচক।
জবাবে কোকা-কোলা মালদ্বীপের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা জানান, বর্তমানে কোম্পানিটি বাংলাদেশি কর্মীদের বেতন মার্কিন ডলারে প্রদান করছে এবং ভবিষ্যতেও যথাসম্ভব এ ব্যবস্থা অব্যাহত রাখার পরিকল্পনা রয়েছে। এ বিষয়ে সন্তোষ প্রকাশ করে হাইকমিশনার বলেন, এ ধরনের উদ্যোগ প্রবাসী বাংলাদেশিদের আর্থিক নিরাপত্তা ও কল্যাণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।
বৈঠকে বাংলাদেশি কর্মীদের অধিকার, মর্যাদা, কল্যাণ ও আইনগত সুরক্ষা নিশ্চিত করার প্রয়োজনীয়তার ওপরও জোর দেওয়া হয়। হাইকমিশনার বলেন, মালদ্বীপের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে বাংলাদেশি কর্মীরা নির্ভরযোগ্য অংশীদার; তাই তাদের সার্বিক কল্যাণ নিশ্চিত করা বাংলাদেশ হাইকমিশনের অন্যতম প্রধান অগ্রাধিকার।
আলোচনায় ইউনিভার্সাল গ্রুপের আওতাধীন কোকা-কোলা মালদ্বীপ ও সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানে আরও বেশি বাংলাদেশি কর্মী নিয়োগের সম্ভাবনাও উঠে আসে। মিলিন্দ দেরাসারি জানান, থুলুসধু দ্বীপে অবস্থিত কোম্পানির উৎপাদন কার্যক্রম ভবিষ্যতে সম্প্রসারণের পরিকল্পনা রয়েছে। সে ক্ষেত্রে আরও বাংলাদেশি কর্মী নিয়োগের বিষয়ে তারা আগ্রহী। তিনি বাংলাদেশি কর্মীদের দক্ষতা, উৎপাদনশীলতা ও পেশাদারিত্বের প্রশংসা করেন।
এ সময় হাইকমিশনার নিরাপদ, সুশৃঙ্খল ও নৈতিক অভিবাসন নিশ্চিত করতে বাংলাদেশ সরকারের মালিকানাধীন জনশক্তি কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরো (বোয়েসেল)-এর মাধ্যমে আরও বেশি কর্মী নিয়োগের আহ্বান জানান। তিনি বলেন, সরকারি ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে নিয়োগ হলে কর্মীদের অধিকার ও কল্যাণ আরও কার্যকরভাবে সুরক্ষিত করা সম্ভব হবে।
বৈঠকে কোকা-কোলা মালদ্বীপের কার্যক্রম সম্পর্কেও বিস্তারিত তুলে ধরা হয়। প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা জানান, থুলুসধু দ্বীপে অবস্থিত উৎপাদন কারখানা থেকে প্রতিষ্ঠানটি কোকা-কোলা, ফ্যান্টা, স্প্রাইটসহ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক ব্র্যান্ডের পানীয় উৎপাদন ও বাজারজাত করছে। তিনি আরও জানান, প্রতিষ্ঠানটি গত ৩৬ বছর ধরে মালদ্বীপে সফলভাবে কার্যক্রম পরিচালনা করছে এবং টানা চার বছর দক্ষিণ এশিয়ার সেরা পুরস্কার অর্জন করেছে।
শ্রম ও কর্মসংস্থান সংক্রান্ত বিষয় ছাড়াও বৈঠকে বাংলাদেশ ও মালদ্বীপের মধ্যে দ্বিপাক্ষিক ও ত্রিপাক্ষিক বাণিজ্য সহযোগিতা, বিনিয়োগ, সরবরাহব্যবস্থা, শিল্প সহযোগিতা এবং ব্যবসায়িক অংশীদারিত্ব সম্প্রসারণের সম্ভাবনা নিয়ে মতবিনিময় হয়। হাইকমিশনার বাংলাদেশের ক্রমবর্ধমান উৎপাদন সক্ষমতা, শিল্পায়ন, রপ্তানি সম্ভাবনা এবং বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশের কথা তুলে ধরে মালদ্বীপের ব্যবসায়ী মহলের সঙ্গে আরও ঘনিষ্ঠ অর্থনৈতিক সহযোগিতার আহ্বান জানান।
বাংলাদেশি কর্মীদের জন্য কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি এবং ইতিবাচক ও অন্তর্ভুক্তিমূলক কর্মপরিবেশ নিশ্চিত করায় কোকা-কোলা মালদ্বীপ কর্তৃপক্ষকে ধন্যবাদ জানান হাইকমিশনার। বৈঠকের শেষে উভয় পক্ষ বাংলাদেশি প্রবাসীদের কল্যাণ ও অধিকার সুরক্ষা, কর্মসংস্থান বৃদ্ধি, নৈতিক নিয়োগব্যবস্থা নিশ্চিতকরণ এবং বাংলাদেশ-মালদ্বীপের মধ্যে বাণিজ্য, বিনিয়োগ ও অর্থনৈতিক সহযোগিতা আরও সম্প্রসারণে একযোগে কাজ করার অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত করেন।
হাইকমিশনার বলেন, মালদ্বীপে কর্মরত বাংলাদেশি প্রবাসীদের আর্থিক অন্তর্ভুক্তি, উন্নত রেমিট্যান্স সেবা এবং অর্থনৈতিক স্বার্থ সংরক্ষণের লক্ষ্যে বাংলাদেশ হাইকমিশন নিয়োগকারী প্রতিষ্ঠান, আর্থিক প্রতিষ্ঠান ও সংশ্লিষ্ট অংশীজনদের সঙ্গে নিয়মিতভাবে কাজ করছে। ভবিষ্যতেও মালদ্বীপে বসবাসরত বাংলাদেশি প্রবাসীদের অধিকার, কল্যাণ, মর্যাদা ও স্বার্থ সংরক্ষণে বাংলাদেশ হাইকমিশন সর্বোচ্চ আন্তরিকতা ও দায়বদ্ধতার সঙ্গে কাজ করে যাবে।
আবদুল্লাহ কাদের/সদ্য সংবাদ