আজ ৭ জানুয়ারি। সীমান্তে কিশোরী ফেলানী হত্যার ১৫ বছর পূর্ণ হলো। ২০১১ সালের এই দিনে কুড়িগ্রামের ফুলবাড়ী উপজেলার অনন্তপুর সীমান্তে ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনী (বিএসএফ)-এর গুলিতে নির্মমভাবে নিহত হয় ফেলানী খাতুন। হত্যার পর দীর্ঘ সাড়ে চার ঘণ্টা তার নিথর দেহ সীমান্তের কাটাতারে ঝুলে ছিল। এ ঘটনায় দেশ-বিদেশে ব্যাপক নিন্দা ও প্রতিবাদের ঝড় ওঠে।
গণমাধ্যম ও আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংগঠনগুলোর তীব্র সমালোচনার মুখে পড়ে ভারত সরকার। তবে ঘটনার পর বিএসএফের বিশেষ কোর্টে দুই দফা বিচারিক প্রক্রিয়ায় অভিযুক্ত বিএসএফ সদস্য অমিয় ঘোষকে খালাস দেওয়া হয়। এ রায় প্রত্যাখ্যান করে ভারতীয় মানবাধিকার সংগঠন ‘মাসুম’-এর সহযোগিতায় ফেলানীর পরিবার ভারতের সুপ্রিম কোর্টে রিট আবেদন করে। কিন্তু হত্যার ১৫ বছর পেরিয়ে গেলেও আজও সুষ্ঠু বিচার পায়নি ফেলানীর পরিবার।
ফেলানীর বাবা-মায়ের অভিযোগ, বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে ভারতের সঙ্গে কূটনৈতিক চাপ প্রয়োগ না করায় ন্যায়বিচার পাওয়া সম্ভব হয়নি। তবে বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকারের কাছে আন্তর্জাতিক আদালতের মাধ্যমে ন্যায়বিচার পাওয়ার প্রত্যাশা ব্যক্ত করেছেন তারা।
ফেলানীর পারিবারিক সূত্রে জানা যায়, কুড়িগ্রামের নাগেশ্বরী উপজেলার রামখানা ইউনিয়নের কলোনিটারি গ্রামের দরিদ্র নূরুল ইসলাম জীবিকার তাগিদে পরিবারের সঙ্গে ভারতের আসাম রাজ্যের বঙ্গাইগাঁও এলাকায় বসবাস করতেন। বড় মেয়ে ফেলানীর বিয়ে ঠিক হলে তাকে বাংলাদেশে আনতে ২০১১ সালের ৭ জানুয়ারি ভোরে ফুলবাড়ীর অনন্তপুর সীমান্ত দিয়ে অবৈধভাবে দেশে ফেরার চেষ্টা করেন তারা।
ভোর আনুমানিক ৬টায় মই বেয়ে প্রথমে সীমান্তের কাটাতার অতিক্রম করেন ফেলানীর বাবা। পরে ফেলানী কাটাতার টপকানোর সময় বিএসএফ সদস্যদের গুলিতে গুরুতর আহত হয় সে। গুলিবিদ্ধ অবস্থায় প্রায় আধা ঘণ্টা ছটফট করতে করতে কাটাতারের ওপর ঝুলেই তার মৃত্যু হয়। সকাল পৌনে ৭টা থেকে প্রায় সাড়ে চার ঘণ্টা তার মৃতদেহ সীমান্তে ঝুলে ছিল।
ঘটনার পর ২০১৩ সালের ১৩ আগস্ট ভারতের কোচবিহারে জেনারেল সিকিউরিটি ফোর্সেস কোর্টে (জিএসএফসি) বিচার কার্যক্রম শুরু হয়। ফেলানীর বাবা নূরুল ইসলাম ও মামা হানিফ আদালতে সাক্ষ্য দেন। তবে ওই বছরের ৬ সেপ্টেম্বর অভিযুক্ত অমিয় ঘোষকে খালাস দেওয়া হয়। পরে পুনর্বিচারের দাবিতে আপিল করলে ২০১৪ সালের ২২ সেপ্টেম্বর পুনরায় বিচার শুরু হয় এবং ২০১৫ সালের ২ জুলাই আবারও অমিয় ঘোষকে খালাস দেওয়া হয়।
এরপর ২০১৫ সালের ১৪ জুলাই ভারতের মানবাধিকার সংগঠন ‘মাসুম’ ফেলানীর বাবার পক্ষে দেশটির সুপ্রিম কোর্টে রিট পিটিশন দায়ের করে। ২০১৬ থেকে ২০১৮ সাল পর্যন্ত একাধিকবার শুনানির তারিখ নির্ধারিত হলেও তা পিছিয়ে যায়। ২০২০ সালের ১৮ মার্চ পর্যন্ত মামলার কোনো কার্যকর অগ্রগতি হয়নি।
ফেলানীর বাবা নূরুল ইসলাম বলেন, “মেয়ে হত্যার ১৫ বছর হয়ে গেল, এখনো বিচার পাইনি। মরার আগে আমি আমার মেয়ের হত্যাকারীর বিচার দেখে যেতে চাই। যে সরকারই আসুক, ফেলানী হত্যার বিচার যেন করা হয়।”
একই দাবি জানিয়ে ফেলানীর মা জাহানারা বেগম বলেন, “বারবার বিচার চেয়েছি, কোনো ফল পাইনি। মেয়ের হত্যাকারীর শাস্তি না দেখে আমি শান্তি পাব না।”
স্থানীয়দের মতে, ফেলানী হত্যার দৃষ্টান্তমূলক বিচার হলে সীমান্তে হত্যাকাণ্ড উল্লেখযোগ্যভাবে কমে আসবে।
এ বিষয়ে কুড়িগ্রাম জজ কোর্টের আইনজীবী অ্যাডভোকেট ফখরুল ইসলাম বলেন, “ভারত সরকার যদি দ্রুত সুপ্রিম কোর্টে থাকা আপিল নিষ্পত্তি করে দায়ী বিএসএফ সদস্যকে শাস্তি দেয়, তাহলে ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার পাশাপাশি সীমান্তে সহিংসতা কমবে এবং দুই দেশের মানুষের আস্থা বাড়বে।”