রোববার (৮ ফেব্রুয়ারি) সন্ধ্যায় বিটিভিতে জাতির উদ্দেশে দেওয়া নির্বাচনী ভাষণে এসব কথা বলেন নাহিদ ইসলাম।
নাহিদ ইসলাম বিগত ৫৫ বছরে গড়ে ওঠা বাংলাদেশের রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও সামাজিক ব্যবস্থাকে ‘বৈষম্যের কাঠামো’ হিসেবে আখ্যা দেন। এই কাঠামোর বিরুদ্ধে ২০২৪ সালের জুলাই অভ্যুত্থানকে তিনি ঐতিহাসিক গণবিদ্রোহ বলে উল্লেখ করেন। বৈষম্য দূর করতে এনসিপির নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় ঐক্যজোটকে ভোট দেওয়ার আহ্বান জানান তিনি।
ভাষণে তিনি অভিযোগ করে বলেন, 'আওয়ামী লীগ সরকার পুলিশ, র্যাব, গোয়েন্দা সংস্থা, প্রশাসন ও বিচার বিভাগকে ব্যবহার করে দমন-পীড়ন চালিয়েছে। জুলাই গণঅভ্যুত্থানের পর কিছু অপরাধী পালিয়ে গেছে, কেউ কেউ বিচারের মুখোমুখি হলেও এখনও অনেক খুনি, লুটেরা ও দুর্নীতিবাজ আত্মগোপনে রয়েছে। এনসিপি সরকার গঠন করলে গুম, খুন ও মানবাধিকার লঙ্ঘনের সঙ্গে জড়িত সবাইকে শনাক্ত করে তদন্ত ও বিচারের আওতায় আনা হবে।'
তিনি আরও বলেন, 'ফ্যাসিবাদী শাসনামলে প্রায় ২৩৪ বিলিয়ন ডলার বিদেশে পাচার হয়েছে। এনসিপি ক্ষমতায় গেলে আন্তর্জাতিক আইনি প্রক্রিয়ার মাধ্যমে পাচার হওয়া অর্থ ফেরত আনা হবে এবং লুটপাটকারীদের সম্পদ বাজেয়াপ্ত করে ‘পাবলিক ট্রাস্ট’-এর আওতায় নেওয়া হবে।'
পররাষ্ট্রনীতি প্রসঙ্গে নাহিদ ইসলাম বলেন, 'বিগত সরকার বাংলাদেশকে ভারতের ওপর নির্ভরশীল করে ফেলেছিল। সীমান্তে বিএসএফের গুলিতে বাংলাদেশি হত্যার ঘটনাগুলোর নিন্দা না করে তৎকালীন সরকার আত্মমর্যাদাহীন কূটনীতি অনুসরণ করেছে। এনসিপি ক্ষমতায় এলে আত্মমর্যাদাপূর্ণ, স্বাধীন ও ভারসাম্যপূর্ণ পররাষ্ট্রনীতি গ্রহণ করা হবে। সার্ক পুনর্জীবন, আসিয়ানে যোগদানের উদ্যোগ এবং মুসলিম বিশ্বের সঙ্গে সম্পর্ক জোরদার করা হবে।'
প্রতিরক্ষা খাত নিয়ে নাহিদ ইসলাম বলেন, 'সশস্ত্র বাহিনীকে দলীয় স্বার্থে ব্যবহারের কারণে প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা দুর্বল হয়েছে। প্রতিবেশী দেশগুলো আধুনিক যুদ্ধবিমানে এগিয়ে গেলেও বাংলাদেশ এখনও পিছিয়ে রয়েছে।'
দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতির জন্য সিন্ডিকেট, চাঁদাবাজ ও অসাধু ব্যবসায়ী চক্রকে দায়ী করে তিনি বলেন, 'এনসিপি সরকার গঠন করলে কৃত্রিম সংকট সৃষ্টিকারী সিন্ডিকেট ভেঙে দেওয়া হবে। কৃষক যেন মধ্যস্বত্বভোগী ছাড়াই পণ্য বিক্রি করতে পারে এবং ভোক্তা ন্যায্যমূল্যে পণ্য পায়—সে ব্যবস্থাও গড়ে তোলা হবে।'
বিচার বিভাগ সংস্কারের অঙ্গীকার করে নাহিদ ইসলাম বলেন, 'বিচারক সংখ্যা বাড়ানো, ডিজিটাল ব্যবস্থাপনা চালু এবং দুর্নীতিমুক্ত বিচার নিশ্চিত করা হবে। পাশাপাশি শাসন ব্যবস্থার অতিরিক্ত কেন্দ্রীয়করণ কমিয়ে উপজেলা ও ইউনিয়ন পর্যায়ে ক্ষমতা হস্তান্তর করা হবে।'
ভেজাল খাদ্যের বিরুদ্ধে শূন্য সহনশীলতার নীতি ঘোষণা করে জেলা ও উপজেলায় খাদ্য পরীক্ষার ল্যাব স্থাপনের প্রতিশ্রুতি দেন এনসিপির এই নেতা। ধর্মীয় ও জাতিগত সংখ্যালঘুদের অধিকার রক্ষা, পোশাকের স্বাধীনতা এবং সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি বজায় রাখার কথাও বলেন তিনি।
নারীর অধিকার প্রসঙ্গে নাহিদ ইসলাম বলেন, 'শিক্ষা, কর্মক্ষেত্র ও রাজনীতিতে নারীর সমান অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা হবে এবং নারী নির্যাতনের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে। স্বাস্থ্যখাতে ব্যবস্থাপনার সংস্কার করে সরকারি চিকিৎসকদের প্রাইভেট প্র্যাকটিস বন্ধ করা হবে।'
শিক্ষাখাতে অবকাঠামোর চেয়ে মানসম্মত শিক্ষায় গুরুত্ব দিয়ে জিডিপির ৫ শতাংশ বরাদ্দের প্রতিশ্রুতি দেন নাহিদ ইসলাম। কৃষকদের ন্যায্যমূল্য, সহজ কৃষিঋণ, বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ সৃষ্টি এবং প্রবাসে যাওয়ার খরচ কমাতে সিন্ডিকেট ভাঙার অঙ্গীকারের মধ্য দিয়ে তিনি তার ভাষণ শেষ করেন।