বন্যা ও নদীভাঙনে তিস্তাপারের বিপন্ন মানুষের জীবন-জীবিকা রক্ষায় প্রায় দুই কোটি টাকা ব্যয়ে কেনা হয়েছিল দুটি আধুনিক ‘মাল্টিপারপাস রেসকিউ বোট’। কিন্তু দুর্গত মানুষের ভরসা হওয়ার বদলে চার বছর ধরে অব্যবহৃত অবস্থায় পড়ে আছে বোট দুটি। যথাযথ তদারকি ও রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে সরকারি অর্থে কেনা এই সম্পদ এখন নষ্ট হওয়ার পথে।
হস্তান্তরের পর দীর্ঘ চার বছরেও কোনো উদ্ধার অভিযানে ব্যবহার করা হয়নি বোট দুটি। বর্তমানে সেগুলোর অধিকাংশ অংশ কাদাপানিতে ডুবে আছে। ফলে ইঞ্জিনসহ বিভিন্ন যন্ত্রাংশ ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
জানা গেছে, ২০২২ সালে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয় থেকে লালমনিরহাটের চরাঞ্চলের মানুষের জানমাল রক্ষায় ‘লালমনিরহাট বুড়িমারী-১’ ও ‘লালমনিরহাট বুড়িমারী-২’ নামের বিশেষায়িত বোট দুটি বরাদ্দ দেওয়া হয়। পরে সদর উপজেলার ৭ নম্বর রাজপুর ইউনিয়নের জগৎবেড় এলাকার ৫ নম্বর স্পার বাঁধের পাশে সেগুলো নোঙর করে রাখা হয়। তবে চার বছরেও কোনো উদ্ধার অভিযানে নামানো হয়নি বোট দুটি।
সরেজমিনে দেখা যায়, স্পার বাঁধের পাশে অযত্নে পড়ে থাকা বোট দুটির ভেতরে পানি ও পলি জমেছে। অধিকাংশ অংশ কাদাপানিতে ডুবে আছে। দড়ি দিয়ে কোনোমতে বেঁধে রাখা হয়েছে সেগুলো। দীর্ঘদিন পানিতে পড়ে থাকায় ইঞ্জিনসহ বিভিন্ন যন্ত্রাংশ ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। বন্যাকবলিত মানুষকে উদ্ধারে ব্যবহারের কথা থাকলেও বোট দুটি এখন নিজের অস্তিত্ব রক্ষায় যেন লড়ছে।
স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, নদীবেষ্টিত এ জনপদে প্রতিবছর বন্যা ও নদীভাঙনে মানুষ চরম দুর্ভোগে পড়লেও বোট দুটি কোনো কাজে আসেনি। মাঝেমধ্যে ইঞ্জিন সচল আছে কি না, তা পরীক্ষার জন্য অল্প সময়ের জন্য চালু করা হতো। এরপর আবার আগের জায়গায় ফেলে রাখা হতো।
এলাকার বাসিন্দা আ. রহিম ও রফিকুল ইসলাম ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, বোট দুটি এনে ফেলে রাখা হয়েছে। সরকার এগুলো নিয়ে যাচ্ছে না। এবারের বন্যায় পানিতে তলিয়ে গেছে। কাদামাটি জমে ইঞ্জিনও নষ্ট হয়ে গেছে। কোনোমতে দড়ি দিয়ে বেঁধে রাখা হয়েছে। বাঁধন ছিঁড়ে গেলে নদীতে হারিয়ে যাবে। দ্রুত বোট দুটি উদ্ধারের দাবি জানান তাঁরা।
আরেক বাসিন্দা আব্দুর রহমান বলেন, বাড়িঘর ভেঙে গেলে মানুষকে উদ্ধার করা যাবে এবং বন্যার সময় কাজে আসবে—এমন আশায় বোট দুটি আনা হয়েছিল। অথচ এতগুলো বন্যা গেল, মানুষ পানিতে ভাসল, কিন্তু বোট নামানো হলো না। মাঝেমধ্যে এসে ইঞ্জিন চালিয়ে পরীক্ষা করা হতো। এরপর আর কোনো খোঁজ থাকত না। এখন ইঞ্জিনসহ পুরো বোটই ডুবে যাচ্ছে। সরকারের সম্পদ কাজে না লাগলে যেখানে প্রয়োজন, সেখানে নিয়ে দেওয়া উচিত।
বোট দুটির একজন চালক আলমগীর মিয়া বলেন, বোট দুটি আনার পর প্রায় এক বছর বেতন ও জ্বালানি পাওয়া গেছে। এরপর আর কোনো দায়িত্ব নেওয়া হয়নি। বোট দুটি সচল রাখার ব্যবস্থা না থাকায় দীর্ঘদিন ধরে পড়ে থেকে নষ্ট হচ্ছে।
অভিযোগ রয়েছে, বোট পরিচালনা ও রক্ষণাবেক্ষণে সুনির্দিষ্ট নীতিমালা এবং কার্যকর উদ্যোগের অভাবে সরকারি এ সম্পদের যথাযথ ব্যবহার নিশ্চিত করা যায়নি।
বোট দুটির বর্তমান অবস্থা সম্পর্কে জানতে চাইলে লালমনিরহাট জেলা ত্রাণ ও পুনর্বাসন কর্মকর্তা মো. আব্দুল মতিন বলেন, ‘এবারের বন্যায় বোট দুটি আংশিক তলিয়ে যায়। এগুলো পাহারা ও দেখভালের দায়িত্বে থাকা দুজন কর্মচারীর বেতন-ভাতার মেয়াদ শেষ হয়েছে। ফলে নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণে ঘাটতি তৈরি হয়েছে। বিষয়টি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে আনুষ্ঠানিকভাবে জানানো হয়েছে। শিগগিরই কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’
লালমনিরহাটের জেলা প্রশাসক মুহা. রাশেদুল হক প্রধান বলেন, ‘রেসকিউ বোট দুটি আনার পর প্রায় এক বছর ভালোভাবে চলেছে। পরে কারিগরি সমস্যার কারণে এগুলো নষ্ট হয়ে যায়। যেহেতু বর্তমানে বোট দুটি ব্যবহার হচ্ছে না, তাই বিধি মোতাবেক সংরক্ষণের জন্য সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে চিঠি দেওয়া হয়েছে।’
সদ্য সংবাদ/ এরআর