বাবার জানাজায় অংশ নেওয়ার শেষ আকুতিও পূরণ হলো না কারাবন্দি মিলন মিয়ার। প্যারোলে মুক্তির আবেদন নামঞ্জুর হওয়ায় শেষ পর্যন্ত বাবার মরদেহই আনা হয় কিশোরগঞ্জ জেলা কারাগারের ভেতরে। এমন হৃদয়বিদারক দৃশ্য দেখে আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন স্বজনদের পাশাপাশি কারা কর্তৃপক্ষের সদস্যরাও।
বুধবার (৪ ফেব্রুয়ারি) সকাল ১০টার দিকে মরদেহবাহী অ্যাম্বুলেন্স কিশোরগঞ্জ জেলা কারাগারে পৌঁছায়। কারাগারের গেটেই বাবার মরদেহের সঙ্গে শেষবারের মতো দেখা করার সুযোগ পান মিলন মিয়া। স্বজনদের ভাষ্য, এ সময় তিনি বারবার জ্ঞান হারিয়ে ফেলেন।
মিলন মিয়া কিশোরগঞ্জের ভৈরব উপজেলার পানাউল্লারচর এলাকার বাসিন্দা। তিনি বর্তমানে একটি রাজনৈতিক মামলায় কারাবন্দি। বাবার মৃত্যুতে জানাজায় অংশ নিতে জেলা প্রশাসকের কাছে প্যারোলে মুক্তির আবেদন করা হলেও তা নামঞ্জুর করা হয়। পরে প্রশাসনের নির্দেশে মরদেহ কারাগারে আনার ব্যবস্থা করা হয়।
মিলনের বাবা ফুল মিয়া (৭০) দীর্ঘদিন ধরে ক্যান্সারে ভুগছিলেন। মঙ্গলবার (৩ ফেব্রুয়ারি) দুপুরে ভৈরবের একটি বেসরকারি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তাঁর মৃত্যু হয়।
পরিবার ও আইনজীবী সূত্রে জানা গেছে, বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনে হামলার ঘটনায় দায়ের করা একটি বিস্ফোরক মামলায় ২০২৪ সালে মিলন মিয়াকে গ্রেপ্তার করে ভৈরব থানা পুলিশ। চলতি বছরের ১৯ জানুয়ারি একটি মামলায় তাঁর জামিন মঞ্জুর হলেও ২৬ জানুয়ারি বিশেষ ক্ষমতা আইনে তাকে ‘শ্যোন অ্যারেস্ট’ দেখিয়ে কারাগারেই আটক রাখা হয়।
বাবার জানাজায় অংশ নেওয়ার অনুমতি চেয়ে জেলা ম্যাজিস্ট্রেটের দায়িত্বপ্রাপ্ত জেলা প্রশাসকের কাছে আবেদন করা হলেও তা গ্রহণ করা হয়নি। বরং মরদেহ কারাগারে আনার নির্দেশ দেওয়া হয়।
এ বিষয়ে জেলা ম্যাজিস্ট্রেট মোহাম্মদ আসলাম মোল্লার সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট মো. এরশাদুল আহমেদের সঙ্গে কথা বলার পরামর্শ দেন। তবে অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট এরশাদুল আহমেদ এ বিষয়ে কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি।
মিলন মিয়ার চাচা মতিউর রহমান বলেন, কারাগারের ভেতরে বাবার মরদেহ দেখে মিলন বারবার অজ্ঞান হয়ে যাচ্ছিল। প্যারোলে মুক্তির জন্য সর্বোচ্চ চেষ্টা করা হলেও কোনো উপায় না পেয়ে শেষ পর্যন্ত মরদেহ কারাগারে আনতে হয়েছে। জীবনে এমন দৃশ্য আর দেখেননি বলেও তিনি জানান।
চাচাতো ভাই সালাম মিয়া বলেন, প্রায় ৬০ কিলোমিটার দূর থেকে মরদেহ কারাগারে আনতে হয়েছে। এই সময় দাফন-কাফনের প্রস্তুতিতে থাকার কথা ছিল, অথচ আদালত ও কারাগারের পেছনেই ছুটতে হয়েছে।
আসামিপক্ষের আইনজীবী অ্যাডভোকেট আবদুল মোমেন ভূইয়া তুহিন বলেন, মিলন মিয়া কোনো মামলার এজাহারভুক্ত আসামি নন এবং তাঁর বিরুদ্ধে সুনির্দিষ্ট অভিযোগও নেই। একটি মামলায় জামিন পাওয়ার পর নতুন আরেকটি মামলায় তাকে গ্রেপ্তার দেখানো হয়েছে।
কিশোরগঞ্জ জেলা কারাগারের জেল সুপার রিতেশ চাকমা বলেন, জেলা ম্যাজিস্ট্রেটের কার্যালয় থেকে পাওয়া নির্দেশনা অনুযায়ী কারাগারের গেটেই মরদেহ দেখার সুযোগ করে দেওয়া হয়েছে।
এই ঘটনায় স্থানীয়ভাবে গভীর শোক ও ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে। স্বজন ও এলাকাবাসী মানবিক দৃষ্টিকোণ থেকে বিষয়টি বিবেচনার দাবি জানিয়েছেন।