বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনের সক্রিয় কর্মী ও ‘জুলাই যোদ্ধা’ তাহরিমা জান্নাত সুরভী পুলিশের কাছ থেকে সুবিচার পাননি বলে অভিযোগ উঠেছে। যে মামলায় তাঁকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে, সেই মামলার বাদীর বিরুদ্ধে সুরভীর মা আগেই কালিয়াকৈর থানায় নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনের ১০ ধারায় মামলা করেছিলেন। তবে ওই মামলায় পুলিশ কোনো কার্যকর ব্যবস্থা নেয়নি। বরং উল্টো সুরভীকেই গ্রেপ্তার করে কারাগারে পাঠানো হয় এবং আদালতে পাঁচ দিনের রিমান্ড আবেদন করা হয়। শুনানি শেষে আদালত দুই দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেন।
সোমবার রাতে কারাগার থেকে জামিনে মুক্তি পাওয়ার পর সুরভী সংশ্লিষ্ট মামলাগুলো নিয়ে একাধিক তথ্য সামনে আসে। জানা যায়, গত ২৬ নভেম্বর কালিয়াকৈর থানায় একই দিনে সুরভীর পক্ষে ও বিপক্ষে দুটি মামলা রেকর্ড হয়। একটি মামলা করেন নাইমুর রহমান দুর্জয়, যার নম্বর ৩৮। এ মামলায় সুরভীসহ চারজনকে আসামি করা হয়। অপরদিকে সুরভীর মা মোসা. ছামিতুন আক্তার দায়ের করেন মামলা নম্বর ৪০, যেখানে একমাত্র আসামি করা হয় নাইমুর রহমান দুর্জয়কে।
সুরভীর আইনজীবী ও গাজীপুর আইনজীবী সমিতির সাধারণ সম্পাদক মোস্তাফিজুর রহমান কামাল বলেন, নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনে দায়ের করা মামলায় সুরভীর বয়স ১৭ বছর উল্লেখ করা হয়। অথচ একই দিনে দুর্জয়ের করা মামলায় সুরভীর বয়স ২১ বছর দেখানো হয়েছে। দুটি মামলার তদন্ত কর্মকর্তা ছিলেন একই ব্যক্তি, কালিয়াকৈর থানার উপপরিদর্শক ওমর ফারুক। ফলে তদন্ত কর্মকর্তা শুরু থেকেই সুরভীর প্রকৃত বয়স সম্পর্কে অবগত ছিলেন বলে দাবি করেন তিনি।
আইনজীবীর অভিযোগ, একই দিনে দুটি মামলা হলেও প্রায় এক মাস পর অপ্রাপ্তবয়স্ক হওয়া সত্ত্বেও সুরভীকে দুর্জয়ের করা মামলায় গ্রেপ্তার করা হয়। অন্যদিকে সুরভীর মায়ের করা মামলায় কোনো দৃশ্যমান পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি। গভীর রাতে বাড়ি থেকে অভিযান চালিয়ে তাঁকে গ্রেপ্তার করা হয় এবং আদালতে হাজির করার সময় তাঁর বয়স সংক্রান্ত সঠিক তথ্য উপস্থাপন করা হয়নি। এমনকি রিমান্ড আবেদনে সুরভীর বয়স ২১ বছর উল্লেখ করা হয়, যা উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বলে দাবি করেন তিনি।
মোস্তাফিজুর রহমান কামাল বলেন, এসব অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে আদালত মামলার তদন্ত কর্মকর্তাকে শোকজ করেছেন। তিনি আশা প্রকাশ করেন, আদালতের মাধ্যমে ন্যায়বিচার নিশ্চিত হবে।
সুরভীর মায়ের মামলার এজাহার সূত্রে জানা যায়, ভাওয়াল বদরে আলম সরকারি কলেজের একাদশ শ্রেণির ওই ছাত্রী গত জুলাই-আগস্টের ছাত্র আন্দোলনে সক্রিয়ভাবে অংশ নেন। সেই সূত্রে সাংবাদিক নাইমুর রহমান দুর্জয়ের সঙ্গে তাঁর পরিচয় হয়। অভিযোগে বলা হয়, পরিচয়ের পর থেকেই দুর্জয় হোয়াটসঅ্যাপে কুপ্রস্তাব ও কক্সবাজার ভ্রমণের প্রস্তাব দিতে থাকেন। একপর্যায়ে ১৮ নভেম্বর ইন্টারভিউয়ের কথা বলে ছাত্রীটিকে ঢাকার বিমানবন্দর এলাকায় ডেকে নিয়ে মোটরসাইকেলে করে গাজীপুরের সফিপুর এলাকায় নিয়ে গিয়ে শ্লীলতাহানি ও যৌন নিপীড়ন করেন।
এজাহারে আরও বলা হয়, কৌশলে সেখান থেকে বেরিয়ে এসে ছাত্রীটি সহায়তা চান এবং পরে দুর্জয় ক্ষমা চেয়ে অডিও ক্লিপ মুছে ফেলার জন্য চাপ ও হুমকি দেন। পরদিন সফিপুরের একটি রেস্টুরেন্টে বসে মানসিক চাপ ও ভয় দেখিয়ে কিছু অডিও ক্লিপ জোরপূর্বক ডিলিট করিয়ে নেওয়া হয়।
এদিকে ২৪ ডিসেম্বর দিবাগত রাত সাড়ে ১২টার দিকে টঙ্গীর নিজ বাসা থেকে যৌথ বাহিনী সুরভীকে গ্রেপ্তার করে। গ্রেপ্তারের ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লে ব্যাপক সমালোচনা শুরু হয়। পরে আদালত তাঁকে কারাগারে পাঠান। সোমবার দুপুরে পুলিশ তাঁকে হাজির করে পাঁচ দিনের রিমান্ড আবেদন করলে বিচারক দুই দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেন। দিনভর আন্দোলন ও সন্ধ্যায় রিভিশন আবেদনের শুনানি শেষে জেলা ও দায়রা জজ আদালত রিমান্ড বাতিল করে জামিন মঞ্জুর করলে সন্ধ্যা সাতটার দিকে গাজীপুর জেলা কারাগার থেকে মুক্তি পান সুরভী।
কালিয়াকৈর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা নাসির উদ্দিন বলেন, একই তারিখে পক্ষে-বিপক্ষে দুটি মামলা হওয়ার বিষয়টি তিনি এদিন জানতে পেরেছেন। তদন্ত কর্মকর্তার বিরুদ্ধে আদালত শোকজ করায় তিনি বলেন, তদন্ত কর্মকর্তা আদালতে জবাব দেওয়ার পর পরবর্তী সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।