জার্মানি ইসরায়েলের পরমাণু অস্ত্র প্রকল্পে গোপনে সহায়তা দিয়েছিল: হারেৎজের প্রতিবেদন

A
Admin
২৫ জুলাই, ২০২৬ ১৬:৩৭:৩০
ইসরায়েলের নেগেভ মরুভূমিতে অবস্থিত ডিমোনা পারমাণবিক চুল্লির অস্তিত্ব প্রথমবার প্রকাশ্যে আসে ১৯৬০ সালের ডিসেম্বরে। এরপর থেকে দেশটির পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে বহু গবেষণা, বই ও অনুসন্ধানী প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছে। সাম্প্রতিক এক প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে, এই প্রকল্পে জার্মানি গোপনে অর্থায়ন করেছিল।

ইসরায়েলি দৈনিক হারেৎজের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, অ্যাভনার কোহেনের ‘ইসরায়েল অ্যান্ড দ্য বোম্ব’সহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ গ্রন্থ এবং সিমুর হার্শ, জাকি শালোম ও আদম রাজের গবেষণায় এই কর্মসূচির উৎস, বিকাশ ও গোপনীয়তা নিয়ে বিস্তৃত বিশ্লেষণ রয়েছে। ২০২৪ সালে সাংবাদিক শ্যানি হাজিজার প্রামাণ্যচিত্র সিরিজ ‘দ্য অ্যাটম অ্যান্ড মি’ বিষয়টিতে ব্যক্তিগত ও সামাজিক মাত্রাও যুক্ত করেছে।

তবে দীর্ঘদিনের গবেষণার পরও দুটি প্রশ্নের স্পষ্ট উত্তর পাওয়া যায়নি—প্রকল্পটির মোট ব্যয় কত ছিল এবং সেই অর্থ কোথা থেকে এসেছিল। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ১৯৬১ থেকে ১৯৭৩ সালের মধ্যে তৎকালীন পশ্চিম জার্মানির রাজধানী বন থেকে গোপন ঋণ ব্যবস্থার মাধ্যমে প্রতি বছর ১৪০ থেকে ১৬০ মিলিয়ন জার্মান মার্ক ইসরায়েলে পাঠানো হয়। এতে মোট অর্থের পরিমাণ দাঁড়ায় প্রায় ২ বিলিয়ন মার্ক, যা বর্তমান মূল্যে প্রায় ৫ বিলিয়ন ইউরো বা ৫ দশমিক ৭ বিলিয়ন ডলারেরও বেশি। ১৯৮৯ সালে স্বাক্ষরিত এক পরবর্তী চুক্তির মাধ্যমে এই ঋণ কার্যত অনুদানে পরিণত হয় বলে জানা যায়।

এই দাবি সত্য হলে বোঝা যায়, ইসরায়েলের পারমাণবিক প্রকল্পের একটি বড় অংশ ইসরায়েলি করদাতা বা ব্যক্তিগত দাতাদের অর্থে নয়, বরং জার্মান সরকারের অর্থে নির্মিত হয়েছিল।

ঘটনার সূত্রপাত ১৯৫৭ সালে। ১৯৫৬ সালের সিনাই যুদ্ধের পর ইসরায়েল ও ফ্রান্সের সম্পর্ক তখন অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ ছিল। প্রতিবেদনে বলা হয়, ফ্রান্স কূটনৈতিকভাবে ইসরায়েলকে সমর্থন দেয় এবং দুই দেশের পারমাণবিক সংস্থার মধ্যে চুক্তির মাধ্যমে গোপনে একটি পারমাণবিক চুল্লি নির্মাণে সহায়তা করতে সম্মত হয়। কিন্তু তৎকালীন ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী ডেভিড বেন-গুরিয়ন শুধু ফরাসি সহায়তার ওপর নির্ভর করতে চাননি। তাঁর আশঙ্কা ছিল, মিসরের প্রেসিডেন্ট গামাল আব্দেল নাসেরের নেতৃত্বে প্যান-আরব জাতীয়তাবাদের উত্থান ইসরায়েলের দীর্ঘমেয়াদি নিরাপত্তার জন্য হুমকি হয়ে উঠতে পারে।

এই প্রেক্ষাপটে বেন-গুরিয়ন এমন একটি শক্তির খোঁজ শুরু করেন, যাকে তিনি ‘বৃষ্টির দিনের ছাতা’ বা বিপদের সময়ের সহযোগী হিসেবে দেখতেন। তাঁর দৃষ্টিতে পশ্চিম জার্মানিই ছিল সবচেয়ে উপযুক্ত অংশীদার। দেশটি তখন দ্রুত উত্থানশীল ইউরোপীয় শক্তি, নাসেরবিরোধী অবস্থানে ছিল এবং নেতৃত্বে ছিলেন কনরাড অ্যাডেনওয়ারের মতো নেতা, যিনি হলোকাস্টের পর ইসরায়েলের প্রতি জার্মানির নৈতিক দায় স্বীকার করতেন।

১৯৫৭ সালের ৩ জুলাই বন শহরে এক গোপন বৈঠকে ইসরায়েলের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের মহাপরিচালক শিমন পেরেস এবং পশ্চিম জার্মানির প্রতিরক্ষামন্ত্রী ফ্রাঞ্জ জোসেফ স্ট্রাউস মুখোমুখি হন। এই বৈঠককে সম্পর্কের একটি গুরুত্বপূর্ণ সূচনা হিসেবে ধরা হয়। বেন-গুরিয়নের আশঙ্কা ছিল, জার্মানির সঙ্গে প্রকাশ্য সম্পর্ক ইসরায়েলের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে সংকট সৃষ্টি করতে পারে। অন্যদিকে বন সরকারও উদ্বিগ্ন ছিল, ইসরায়েলের সঙ্গে দৃশ্যমান সহযোগিতা আরব বিশ্বে তাদের অবস্থান দুর্বল করতে পারে এবং পূর্ব জার্মানিকে কূটনৈতিক সুবিধা এনে দিতে পারে।

পশ্চিম জার্মানি ইসরায়েলকে সহায়তা দেওয়াকে নৈতিক দায়িত্ব ও কৌশলগত বিনিয়োগ হিসেবে দেখছিল। আর ইসরায়েল চাইছিল সামরিক ও রাজনৈতিক সমর্থন। আলোচনায় পেরেস জানান, ১৯৫২ সালের ক্ষতিপূরণ চুক্তির বাইরে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক আরও বিস্তৃত হওয়া উচিত। স্ট্রাউস এতে ইতিবাচক সাড়া দেন এবং সাবমেরিন সরবরাহের অনুরোধও বিবেচনা করেন। যদিও ইসরায়েলি সেনাবাহিনী এগুলোকে অত্যাবশ্যক মনে করেনি, তবু এই অনুরোধ প্রতিরক্ষা সহযোগিতার পথ আরও প্রসারিত করে।

পরবর্তীতে সাবমেরিনগুলো ব্রিটেন থেকে জার্মান অর্থায়নে কেনা হয়। একই সময়ে পশ্চিম জার্মানি ইসরায়েলের কাছ থেকে প্রায় ৩০ মিলিয়ন ডলারের সামরিক সরঞ্জামও ক্রয় করে, যা ইসরায়েলের প্রতিরক্ষা শিল্প গড়ে তুলতে সহায়তা করে।

এরপর ১৯৬০ সালের ১৪ মার্চ নিউইয়র্কের ওয়াল্ডর্ফ অ্যাস্টোরিয়াতে বেন-গুরিয়ন ও অ্যাডেনওয়ারের বৈঠককে সম্পর্কের মোড় ঘোরানো মুহূর্ত হিসেবে দেখা হয়। বৈঠকটি প্রকাশ্যে হলেও আলোচনার অনেক বিষয় দীর্ঘদিন গোপন ছিল। কোনো আনুষ্ঠানিক প্রতিলিপি না থাকলেও এটিকে ইসরায়েল-জার্মানি নিরাপত্তা সম্পর্কের ইতিহাসে একটি গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা হিসেবে বিবেচনা করা হয়।

প্রতিবেদন অনুযায়ী, ওই আলোচনায় বেন-গুরিয়ন ইসরায়েলের নিরাপত্তা প্রশ্নকে সরাসরি হলোকাস্টের ইতিহাসের সঙ্গে যুক্ত করেন। তাঁর মতে, ইউরোপীয় ইহুদিদের ধ্বংস জায়নবাদী প্রকল্পকেও গুরুতরভাবে দুর্বল করেছিল। সেই প্রেক্ষাপটে জার্মান সহায়তাকে তিনি কেবল অতীত অপরাধের ক্ষতিপূরণ নয়, ভবিষ্যতে ইসরায়েলের অস্তিত্ব রক্ষার জন্যও প্রয়োজনীয় অবদান হিসেবে তুলে ধরেন।

জার্মান সামরিক সহায়তার বিষয়টি আলোচনায় এলেও প্রকৃত গুরুত্বপূর্ণ অংশ ছিল গোপন আর্থিক ব্যবস্থা। আনুষ্ঠানিকভাবে এটিকে ‘নেগেভ উন্নয়ন’ সহায়তা হিসেবে দেখানো হয়। অ্যাডেনওয়ারের দপ্তর এই পরিকল্পনার কোডনাম দেয় ‘অ্যাকশিওন গুশাফসফ্রন্ড’ বা ‘অপারেশন বিজনেস ফ্রেন্ড’। এই পরিকল্পনা অনুযায়ী ইসরায়েলকে ১০ বছর ধরে প্রতি বছর ৫০ মিলিয়ন ডলার দেওয়ার কথা ছিল, যার সুদের হার নির্ধারণ করা হয় ৩ দশমিক ৬ শতাংশ।

প্রথমে বন সরকার চেয়েছিল ১৯৬৫ সালে ক্ষতিপূরণ প্রদান শেষ হওয়ার পর এই সহায়তা শুরু হোক। কিন্তু ইসরায়েলের অনুরোধে তা আগেই কার্যকর হয় এবং প্রথম অর্থ স্থানান্তর করা হয় ১৯৬১ সালের ডিসেম্বরে। গোপনীয়তা বজায় রাখতে কোনো আনুষ্ঠানিক চুক্তি করা হয়নি। পরিবর্তে ইসরায়েলের প্রতিনিধি ফেলিক্স শিনার এবং অ্যাডেনওয়ারের উপদেষ্টা হারমান অ্যাবস এমন একটি পদ্ধতি তৈরি করেন, যার মাধ্যমে জার্মানির ফ্রাঙ্কফুর্টের একটি রাষ্ট্রায়ত্ত উন্নয়ন ব্যাংক বাণিজ্যিক ঋণের আকারে অর্থ পাঠাত।

অর্থের প্রকৃত উদ্দেশ্য আড়াল করতে সরকারি নথিতে এগুলোকে অজ্ঞাত কোনো উন্নয়নশীল দেশের সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় আর্থিক ব্যবস্থার অংশ হিসেবে উল্লেখ করা হতো। জার্মানির অর্থ ও অর্থনীতি মন্ত্রণালয় এই ব্যবস্থায় অনুমোদন দিলেও পররাষ্ট্রমন্ত্রীকে বিষয়টি জানানো হয়নি বলে প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে।

এই সময়েই ১৯৬০ সালের মে মাসে বেন-গুরিয়ন নাৎসি কর্মকর্তা এডলফ আইখম্যানকে গ্রেপ্তার এবং জেরুজালেমে বিচার করার পরিকল্পনা ঘোষণা করেন, যা পরিস্থিতিকে আরও সংবেদনশীল করে তোলে। পশ্চিম জার্মান কর্মকর্তারা আশঙ্কা করেছিলেন, এই বিচার অ্যাডেনওয়ার সরকারের এমন কিছু উচ্চপদস্থ ব্যক্তির দিকে দৃষ্টি আকর্ষণ করতে পারে, যারা নাৎসি আমলে দায়িত্ব পালন করেছিলেন। তাদের মধ্যে ছিলেন তাঁর চিফ অব স্টাফ হ্যান্স গ্লবকে, যিনি নুরেমবার্গ আইন প্রণয়নে ভূমিকা রেখেছিলেন এবং ইসরায়েলের সঙ্গে গড়ে ওঠা সম্পর্ক সম্পর্কেও অবগত ছিলেন।

গোপন অর্থায়ন ব্যবস্থার কেন্দ্রীয় ব্যক্তিদের একজন হারমান অ্যাবসও নাৎসি আমলে শীর্ষস্থানীয় ব্যাংকার ছিলেন।

সব মিলিয়ে প্রতিবেদনের বিশ্লেষণ থেকে ধারণা করা হয়, ডিমোনা প্রকল্প কেবল ফ্রান্সের প্রযুক্তিগত সহায়তায় নয়, বরং পশ্চিম জার্মানির গোপন আর্থিক সহায়তার ওপরও নির্ভর করেছিল। এই তথ্য পুরোপুরি নিশ্চিত হলে তা ইসরায়েলের পারমাণবিক ইতিহাসের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অথচ কম আলোচিত অধ্যায় হিসেবে বিবেচিত হবে। হলোকাস্টের স্মৃতি, আঞ্চলিক নিরাপত্তা উদ্বেগ এবং গোপন কূটনীতির জটিল সমন্বয়ে এই ইতিহাস গড়ে উঠেছে।

মন্তব্য (0)

মন্তব্য করুন

এখনো কোনো মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্য করুন!

বিজ্ঞাপনের জন্য খালি স্পেস

শিরোনাম:
সদ্য. গুম, বিচারবহির্ভূত হত্যা ও হেফাজতে মৃত্যু ঠেকাতে ব্যবস্থা নেওয়া হবে: স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সদ্য. প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে জাপানের অর্থনীতি, বাণিজ্য ও শিল্পমন্ত্রীর সৌজন্য সাক্ষাৎ সদ্য. প্রধানমন্ত্রী-মন্ত্রীদের বাসভবনের দায়িত্বে আ.লীগ ও যুবলীগপন্থী কর্মকর্তারা সদ্য. সাইবার হামলার আশঙ্কা, সাময়িক বন্ধ এনআইডি সার্ভারের কার্যক্রম সদ্য. স্পেনে দুই দ্রুতগতির ট্রেনের মুখোমুখি সংঘর্ষ, নিহত ৪৬ সদ্য. বিএনপি নেতা মশিয়ার হত্যা মামলায় কারাগারে সাবেক ওসি ও এসআই সদ্য. হঠাৎ হাসপাতাল পরিদর্শনে স্বাস্থ্যমন্ত্রী, অনুপস্থিত ৫ চিকিৎসকের বিরুদ্ধে বিভাগীয় ব্যবস্থার নির্দেশ সদ্য. ঢাকা ওয়াসা বোর্ড বিলুপ্ত, এমডির হাতে একক ক্ষমতা সদ্য. শাহজালাল বিমানবন্দরে প্যান্ট-অন্তর্বাস থেকে ২৪ কোটি টাকার সোনা উদ্ধার সদ্য. শেখ হাসিনার স্বদেশ প্রত্যাবর্তন উপলক্ষে কুবিতে নিষিদ্ধ ছাত্রলীগের পোস্টারিং সদ্য. গুম, বিচারবহির্ভূত হত্যা ও হেফাজতে মৃত্যু ঠেকাতে ব্যবস্থা নেওয়া হবে: স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সদ্য. প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে জাপানের অর্থনীতি, বাণিজ্য ও শিল্পমন্ত্রীর সৌজন্য সাক্ষাৎ সদ্য. প্রধানমন্ত্রী-মন্ত্রীদের বাসভবনের দায়িত্বে আ.লীগ ও যুবলীগপন্থী কর্মকর্তারা সদ্য. সাইবার হামলার আশঙ্কা, সাময়িক বন্ধ এনআইডি সার্ভারের কার্যক্রম সদ্য. স্পেনে দুই দ্রুতগতির ট্রেনের মুখোমুখি সংঘর্ষ, নিহত ৪৬ সদ্য. বিএনপি নেতা মশিয়ার হত্যা মামলায় কারাগারে সাবেক ওসি ও এসআই সদ্য. হঠাৎ হাসপাতাল পরিদর্শনে স্বাস্থ্যমন্ত্রী, অনুপস্থিত ৫ চিকিৎসকের বিরুদ্ধে বিভাগীয় ব্যবস্থার নির্দেশ সদ্য. ঢাকা ওয়াসা বোর্ড বিলুপ্ত, এমডির হাতে একক ক্ষমতা সদ্য. শাহজালাল বিমানবন্দরে প্যান্ট-অন্তর্বাস থেকে ২৪ কোটি টাকার সোনা উদ্ধার সদ্য. শেখ হাসিনার স্বদেশ প্রত্যাবর্তন উপলক্ষে কুবিতে নিষিদ্ধ ছাত্রলীগের পোস্টারিং