আইআরজিসি-র প্রতিরোধ ক্ষমতা বোঝার জন্য ইতিহাসের দিকে তাকানো জরুরি। ১৯৭৯ সালের ইসলামি বিপ্লবের সময় ছাত্রদের ছোট একটি মিলিশিয়া হিসেবে গঠিত এই বাহিনী দ্রুত ইরানের সর্বোচ্চ নেতার রক্ষীবাহিনী হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে। তখন তাদের মূল লক্ষ্য ছিল নতুন বিপ্লবী সরকারকে রক্ষা করা এবং রাজতন্ত্রের অনুগত সেনাবাহিনী বা ‘আরতেশ’-এর সম্ভাব্য পাল্টা অভ্যুত্থান দমন করা। অভ্যন্তরীণ শত্রু, ধর্মনিরপেক্ষ বামপন্থী এবং প্রতিদ্বন্দ্বী ইসলামি মিলিশিয়ার সঙ্গে রক্তক্ষয়ী লড়াইয়ের মধ্য দিয়ে তারা একটি সুসংগঠিত ও আদর্শিক বাহিনী হিসেবে গড়ে ওঠে।
১৯৮০ সালে ইরাক ইরান আক্রমণ করলে আইআরজিসি সম্মুখ সমর শক্তিতে রূপান্তরিত হয়। নিয়মিত সেনাবাহিনীর সঙ্গে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে তারা ১৯৮২ সালের মধ্যে সাদ্দাম হোসেনের বাহিনী বিতাড়িত করতে সক্ষম হয়। এই যুদ্ধের অভিজ্ঞতা আজকের কমান্ডারদের মনে গভীরভাবে গেঁথে আছে। এছাড়া, তারা পশ্চিমাদের নীরবতায় ইরাকের রাসায়নিক অস্ত্র ব্যবহারের ভয়াবহতা প্রত্যক্ষ করেছে, যা তাদের ভবিষ্যতের লড়াইয়ে সতর্ক ও দৃঢ় করে তোলে।
কেবল বিদেশি আক্রমণ নয়, আইআরজিসি অভ্যন্তরীণ বিদ্রোহ দমনেও শক্তিশালী। আশির দশকে উত্তর-পশ্চিমের কুর্দি বিদ্রোহ থেকে শুরু করে ২০০০-এর দশকে দক্ষিণ-পূর্বের বেলুচ বিদ্রোহ—সবই তারা কঠোরভাবে দমন করেছে। বর্তমান পরিস্থিতিতে মার্কিন প্রশাসনের কুর্দি উসকানি চেষ্টা আইআরজিসি-কে আরও ক্ষুব্ধ করবে, কারণ তারা দীর্ঘ দশক ধরে এসব গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে লড়াই করছে।
আঞ্চলিক প্রক্সি বাহিনীর মাধ্যমে আইআরজিসি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের বিরুদ্ধে দীর্ঘমেয়াদী ছায়াযুদ্ধেও লিপ্ত। ১৯৮২ সালে লেবাননে হিজবুল্লাহ গঠন, ১৮ বছরের গেরিলা যুদ্ধ এবং ২০০৩ সালে ইরাকে মার্কিন অভিযানের পর কুদস ফোর্স সমর্থিত শিয়া মিলিশিয়ার কৌশল—সবই আইআরজিসি-কে গেরিলা ও ক্ষয়িষ্ণু যুদ্ধের অভিজ্ঞ করে তুলেছে। ইতিহাসে দেখা গেছে, সরাসরি স্থল যুদ্ধে তারা হয়তো মার্কিন বাহিনীকে তাৎক্ষণিকভাবে আটকাতে পারবে না, কিন্তু দীর্ঘমেয়াদি লড়াইয়ে তারা অন্তহীন গেরিলা যুদ্ধের মাধ্যমে দখলদার বাহিনীকে ক্লান্ত ও বিপর্যস্ত করবে।
ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের সম্পর্কও এই সংঘাতকে উসকে দিচ্ছে। ২০০১ সালে নাইন-ইলেভেনে সংক্ষিপ্ত সহযোগিতা থাকা সত্ত্বেও ২০০২ সালে জর্জ ডব্লিউ বুশ ইরানকে ‘অক্ষশক্তি’ ঘোষণা করেন। এর ফলে ইরানের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে কট্টরপন্থী নেতাদের প্রভাব বৃদ্ধি পায় এবং আইআরজিসি-র ক্ষমতা ও পরমাণু কর্মসূচি সম্প্রসারিত হয়।
আইআরজিসি কেবল একটি সামরিক বাহিনী নয়; এটি ইরানের অর্থনীতির অন্তত ২০ শতাংশ নিয়ন্ত্রণ করে এবং রাষ্ট্রের ভেতরে একটি ‘ডিপ স্টেট’ হিসেবে কাজ করে। শীর্ষ নেতৃত্বের মৃত্যুর পরও বাহিনীর কর্মকর্তারা গভীর ঐক্য বজায় রেখেছে এবং খামেনির সন্তানকে সমর্থন দিয়ে ক্ষমতার ভারসাম্য রক্ষা করছে। নতুন কোনো রাজনৈতিক ব্যবস্থায় বিচারের ভয় তাদের আত্মসমর্পণে বাধা দেয়।
সারসংক্ষেপে, ইতিহাস এবং বর্তমান পরিস্থিতি প্রমাণ করে—আইআরজিসি সহজে নতি স্বীকার করবে না। শেষ রক্তবিন্দু পর্যন্ত লড়াই চালিয়ে যাওয়াই তাদের স্বভাব। মার্কিন বাহিনী যদি দীর্ঘমেয়াদি লক্ষ্য নিয়ে এগোতে চায়, তবে তারা এই কঠোর ও অভিজ্ঞ বাহিনীর সঙ্গে দীর্ঘস্থায়ী গেরিলা যুদ্ধের মুখোমুখি হবে।