আমি আজ গভীর শোকাহত। আমার শৈশব কৈশোরের সবচেয়ে স্মরণীয় সুন্দর মুহূর্তগুলোর জন্যে আমি গভীর কৃতজ্ঞতা জানাচ্ছি মরহুমা সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়া কে। ১৯৯১-১৯৯৬ (প্রাথমিক শিক্ষা) এবং ২০০১-২০০৬ (কলেজ)। মধ্যবিত্ত পরিবারের সকল সদস্যদের পক্ষ থেকে জানাই অকৃত্রিম শ্রদ্ধা ও ভালোবাসা। আমি কোন দলের নেতা নই। আমি একজন সাধারণ নাগরিক। রাজনৈতিক সুযোগ পাবার আশায় ও আমার এই পোস্ট না।
আমার মত কোটি মেয়েদের শিক্ষার ভার নিজের অভিভাবকের মত দায়িত্ব পালন করেছেন বেগম খালেদা জিয়া। বাংলাদেশের বাধ্যতামূলক প্রাথমিক শিক্ষা, স্কুল থেকে উচ্চ শিক্ষার জন্য উপবৃত্তি প্রদান এবং শেষে বিনামূল্যে পাঠ্যপুস্তক বিতরণ—সব কিছুর জন্যই আমি, আমার প্রজন্মের কোটি মেয়েরা তার কাছে আজীবন ঋণী। বেগম জিয়া, যেহেতু তিনি নিজে একজন নারী তাই জীবনে খুব ভালো করেই বুঝতে পেরেছিলেন মেয়েদের শিক্ষা এবং নারীর ক্ষমতায়ন কতটা গুরুত্বপূর্ণ।
উপবৃত্তির ব্যবস্থা না থাকলে আমার মত সাধারণ শিক্ষার্থীর উচ্চ শিক্ষার আশা হয়ত মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের বারান্দায় ই শেষ হয়ে যেত। আমার পরিচিত অনেক পরিবারকেই দেখেছি শুধু মাত্র মেয়েদের উপবৃত্তির টাকার আশায় হলেও স্কুলে পাঠাতেন। এই অবস্থায় ছেলেদের কোনো সাহায্য দেওয়া হতো না বলে তাদের লেখাপড়ার খরচ বহন অনেক পরিবার ই করতে পারতেন না।
এমন পরিস্থিতিতে আমি আমাদের চাইল্ড পার্লামেন্টের পক্ষে তৎকালীন অর্থমন্ত্রী সাইফুর রহমানকে অনুরোধ করি বিনামূল্যে বই বিতরণ করার। তিনি তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়া কে বিষয়টি অবহিত করেন এবং পরবর্তীতে সবার জন্য বিনামূল্যে বই বিতরণ করেন প্রথম থেকে নবম শ্রেণী পর্যন্ত। উচ্চ মাধ্যমিক শিক্ষা পর্যন্ত উপবৃত্তির ব্যবস্থা করেন। আমি আজীবন কৃতজ্ঞ এই যুগান্তকারী সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন করার জন্য। আমি আমার মাধ্যমিক শিক্ষা জীবনে এই সুযোগটি পেলে হয়ত নতুন পাঠ্যপুস্তক হাতে পাওয়ার আনন্দ উপভোগ করতে পারতাম। বড় ভাই বোনের পুরনো বই পড়েই মাধ্যমিক স্কুল শেষ হয়েছে আমার। আজ যখন জানুয়ারি মাসে কোমলমতি শিশু কিশোরদের হাতে নতুন বই তুলে দিতে দেখি, তখন আমার হৃদয় টা আনন্দ আর কৃতজ্ঞতায় ভরে যায়।
শিশুদের অধিকার রক্ষায় বেগম খালেদা জিয়ার অবদান অনস্বীকার্য। ২০০২ এ জাতিসংঘের সাধারণ অধিবেশনে বাংলাদেশের শিশু প্রতিনিধি সহ অংশগ্রহণ ছিল বাংলাদেশীদের অধিকার রক্ষার যুগান্তকারী পদক্ষেপ। জাতিসংঘের ঐ শিশুদের জন্য বিশেষ অধিবেশনে এ বাংলাদেশী শিশু প্রতিনিধি হিসেবে আমার অংশগ্রহণ করার কথা ছিলো কিন্তু দক্ষিণ এশীয় সকল প্রস্তুতির পর আমার নামের পাশে সিদ্দিকী থাকার কারণে আমাকে কোনো কারণ না জানিয়ে ই আমাদের অন্য দুই বন্ধু কে আমেরিকায় নিয়ে যাওয়া হয়। শুনেছি তারা অনেক বড় অঙ্কের টাকা ও পেয়েছিল। এই বিষয়ে অনেক দুঃখ ও পেয়েছিলাম। পরবর্তীতে শিশু অধিকার রক্ষায় জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে অংশগ্রহণ করার সুযোগ হয়েছে।
শৈশব থেকেই আমি বিভিন্ন সংগঠনে সক্রিয় ছিলাম। স্কুল কলেজে প্রথম শ্রেণির ছাত্রী হিসেবে, সংগঠক হিসেবে শিক্ষকসহ সমাজের বিভিন্ন স্তরের মানুষের ভালোবাসা পেয়েছি। আমার অনুপ্রেরণা ছিলেন আমার মা এবং বেগম রোকেয়া সাখাওয়াত এবং একজন কিংবদন্তী নারী যাকে আমি আজ শ্রদ্ধার সাথে চির বিদায় জানাচ্ছি—প্রয়াত সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়া।
তিনি আমার কাছে একজন অভিভাবক, মা, দেশপ্রেমিক। কৈশোরে তিনি ছিলেন আমার দেখা সবচেয়ে সুন্দরী রুচিশীল নারী। একজন নারী এত সুন্দরী ও সাহসী হয়—তাকে না দেখলে জানা সম্ভব হত না। তার রুচিবোধ অনেক উন্নত। তার শাড়ি একবার ধরে দেখার ইচ্ছা ছিলো। সবাই যখন তার আই ভ্রুর কথা বলেন, আমি তখন ভাবতাম তার শাড়ির কালেকশন করেন কোথা থেকে। বাংলাদেশে তার মত উন্নত রুচিশীল ড্রেস আমি কাউকে ই পরতে দেখিনি।
বেগম খালেদা জিয়া শুধু একজন প্রধানমন্ত্রী ই নন, আমার কাছে একজন আদর্শ নারী। সাংস্কৃতিক অঙ্গনে ‘নতুন কুড়ি’—আমাদের প্রজন্মের এক নতুন ইতিহাস রচনা, যা বহু দিন ধরে বন্ধ থাকার পর আবার নতুন করে শুরু হয়েছে। বেগম খালেদা জিয়া একজন শিক্ষা ও সংস্কৃতিমনা আধুনিক মানুষ। বাংলাদেশের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী।
স্বামীর রেখে যাওয়া সংগঠন আর দুই সন্তান দের আজীবন আগলে রেখেছেন। জীবনের অনেক গুলো বছর কেটেছে অন্ধকার কারাগারে। অসুস্থ সময়েও পাননি প্রিয় সন্তানদের ভালোবাসার পরশ। অসম্ভব সুন্দরী এই নারী চরম দুঃখ কষ্ট সহ্য করেছেন শুধু মাত্র সন্তান আর দলের জন্য।
সবশেষে শুধু এইটুকু বলব—দুঃখী হলেও আপনি একজন সফল মানুষ। আল্লাহ আপনাকে সন্মানিত করেছেন। সারাজীবন মানুষ যে সন্মানিত বিদায় চায়, আপনি তা পাচ্ছেন। আল্লাহ আপনাকে সন্মান দিয়েছেন। দেশনেত্রী হিসেবে এটা ই আপনার প্রাপ্য। আল্লাহ আপনাকে জান্নাতের উচ্চ মাকাম দান করুক। আমীন।